১৯৪২ সালের ৫ জুন মধ্যরাত। পাশাপাশি বিছানায় শুয়ে দুই কিশোরী। মেরি এভলিন ব্রিগস এবং এডনা মেরি হাইডেল। হঠাৎ হুড়মুড় করে কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ। চমকে বিছানায় উঠে বসতেই নজরে পড়ল, শোয়ার ঘরের জানলা দিয়ে কেউ যেন লাফিয়ে পালিয়ে গেল।
আলো জ্বালিয়ে ঘরের চারদিকে খোঁজা হল, কিছু চুরি গিয়েছে কি না। সব কিছুই যথাস্থানে রয়েছে। নেই শুধু তাঁদের মাথার খানিকটা চুল। ঘরে ঢোকা অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি দুই তরুণীরই মাথা থেকে কয়েক গোছা চুল কেটে নিয়ে গা-ঢাকা দিয়েছে। ‘আওয়ার লেডি অফ ভিক্টরি’র কনভেন্টে থাকা দুই কিশোরীর বুক কেঁপে উঠেছিল অজানা আশঙ্কায়।
এই দুই কিশোরীই শুধু নন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্বের একটি অঙ্গরাজ্য মিসিসিপির পাস্কাগৌলা শহরে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল এক ‘অশরীরী’র উপস্থিতি। রাত গভীর হলেই খোলা জানলা দিয়ে শোয়ার ঘরে হানা দিত ‘অশরীরী নাপিত’ বা ‘ফ্যান্টম বারবার’। মূল্যবান কোনও বস্তু বাড়ি থেকে খোয়া যেত না। অশরীরীর লক্ষ্য ছিল কিশোরী, তরুণীদের একগোছা চুল।
‘ফ্যান্টম বারবার’-এর প্রথম শিকার ছিল ১১ বছর বয়সি মেরি ও ১২ বছর বয়সি এডনা। একমাত্র মেরিই এই অশরীরীর বর্ণনা দিতে পেরেছিল সেই সময়। বাদবাকি কেউই তার উপস্থিতি টের পাননি। সন্তর্পণে চুল কেটে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর সকালে উঠে পাস্কাগৌলার কিশোরী ও তরুণীরা টের পেতেন রাতে ঘরে হানা দিয়েছিল অশরীরী নরসুন্দর।
মেরি ও এডনার ঘটনার কয়েক দিন পর, ছয় বছর বয়সি নাবালিকা ক্যারল পিটি ঘুম থেকে উঠে দেখতে পায় তার বেশির ভাগ চুলই নেই। জানলার পর্দাও কাটা ছিল। যমজ ভাইয়ের পাশ থেকে ঘুম থেকে ওঠার পর দেখতে পাওয়া যায় যে কেউ তার সোনালি কোঁকড়ানো চুল নির্দয় ভাবে কেটে ফেলেছে। ক্যারলের বাবা-মা শোয়ার ঘরে একটি খালি বিছানায় বালিভর্তি পায়ের ছাপ দেখতে পেয়েছিলেন। সেটি সম্ভবত ছিল ‘ফ্যান্টম বারবার’-এর।
এর কিছু দিন পর মিসেস টেলর নামে এক তরুণীও এই অস্বাভাবিক অপরাধের শিকার হয়েছিলেন। তাঁর বর্ণনা থেকে পুলিশের সন্দেহ জাগে যে অপরাধী নির্বিঘ্নে কাজ সারার জন্য ক্লোরোফর্ম ব্যবহার করেছিল। টেলর তাঁর স্বামী এবং দুই মেয়ের সঙ্গে ঘুমোচ্ছিলেন। তিনি পরে পুলিশকে জানিয়েছিলেন, ঘুম থেকে উঠে তিনি অসুস্থ বোধ করেন এবং দেখতে পান যে তাঁর কয়েক গোছা চুল কেটে ফেলা হয়েছে।
গভীর রাতের আতঙ্কে কাঁটা হয়েছিলেন পাস্কাগৌলা শহরের মহিলারা। যদিও চুল কেটে ফেলার সব ক’টি ঘটনায় মহিলাদের কোনও ক্ষতি করেনি রাতের অনুপ্রবেশকারী। তার অপরাধের মধ্যে ছিল খোলা জানালার পর্দা কেটে ঘরে ঢোকা, চুল কেটে ফেলা এবং পালিয়ে যাওয়া। সে মাঝেমাঝে পায়ের ছাপ রেখে যেত, কিন্তু সেগুলো তার পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল না।
তিন জন মেয়েই পুলিশকে জানিয়েছিল যে, ‘ফ্যান্টম বারবার’ তাদের কোনও ক্ষতি করেনি। মেরি জবানবন্দিতে জানিয়েছিল, ঘুম থেকে উঠে সে দেখে যে তার শোয়ার ঘরের জানালা দিয়ে এক জন লোক ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তাকে ‘বেঁটে এবং মোটা’ বলে বর্ণনা করেছিল নাবালিকা মেরি।
‘আওয়ার লেডি অফ ভিক্টরি’র কনভেন্টে অশরীরী হানার প্রথম ঘটনায় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন কর্তৃপক্ষ। মেয়ে দু’টি অনুপ্রবেশকারীর একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়। ব্লাডহাউন্ড কুকুর এনে অপরাধীর তল্লাশি চালানোর চেষ্টা করা হয়। গন্ধ অনুসরণ করে কাছের জঙ্গলে পৌঁছোয় কুকুর। সেখানে সাইকেলের চাকার ট্র্যাক থেকে জানা যায় যে লোকটি সম্ভবত বাহনে চেপেই পালিয়েছে।
মহিলাদের সঙ্গে অশালীন আচরণ না করলেও অশরীরী নাপিতের আচরণ বিসদৃশ ঠেকেছিল তৎকালীন পুলিশপ্রধান এ ডব্লিউ এজেলের। তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন যে, লোকটি যখন-তখন গুরুতর কোনও অপরাধ করতে পারে। ইতিমধ্যেই পাস্কাগৌলার ‘ফ্যান্টম বারবার’ নিয়ে প্রবল আতঙ্কে ভুগতে শুরু করেন সাধারণ মানুষ। সারা দেশের সংবাদমাধ্যমগুলির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল এই রহস্যময় অপরাধী।
টেলরের ঘটনার পরের সপ্তাহে, ডজনখানেক মানুষ অভিযোগ করেন যে তাঁদের বাড়ির মহিলারা অশরীরী নাপিতের শিকার হয়েছেন। বিশ্বযুদ্ধের আবহেও অপরাধীকে ধরার আশায় পাস্কাগৌলার বাসিন্দাদের রাতে ঘরে আলো জ্বালানোর অনুমতি দিয়েছিল শহরের প্রশাসন। পুলিশকর্তা এজেল রাতের টহল বৃদ্ধির নির্দেশ দেন। এমনকি প্রদেশের পুলিশের সহায়তার জন্যও আবেদন জানিয়েছিলেন তিনি।
১৯৪০ সালে পাস্কাগৌলার জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৪,৯০০ জন। কিন্তু ১৯৪২ সালের মধ্যে যুদ্ধের কারণে তা বেড়ে ১৪ হাজারে পৌঁছে যায়। পুলিশের অনুমান ছিল, রহস্যময় নাপিত দীর্ঘ দিন ধরেই এই শহরের বাসিন্দা ছিল। শহরের গলিঘুঁজিগুলির সঙ্গে ভাল ভাবে পরিচয় ছিল তার। শহরকে তালুর মতো না চিনলে রাতের অন্ধকারে শহরের মধ্যে দিয়ে ঘুরে বেড়াতে সক্ষম হত না সে।
এর পরে শহরে একটি ঘটনা আলোড়ন ফেলে দেয়। ১৩ জুন পাস্কাগৌলার বাসিন্দা টেরেল হাইডেলবার্গ এবং তাঁর স্ত্রী ঘুমন্ত অবস্থায় শোয়ার ঘরে এক অনুপ্রবেশকারীর হাতে আক্রান্ত হন। হাইডেলবার্গকে সীসার পাইপ দিয়ে নির্মম ভাবে আক্রমণ করা হয়। এমনকি অনুপ্রবেশকারী পালিয়ে যাওয়ার আগে নৃশংস আক্রমণে হাইডেলবার্গের কয়েকটি দাঁতও ভেঙে দিয়ে যায়। কেউ কেউ এটিকে ‘ফ্যান্টম বারবার’-এর কাজ বলে মনে করলেও অনেকে এই আক্রমণকে ব্যক্তিগত প্রতিশোধের বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে দাবি তুলেছিলেন।
সন্দেহের উদ্রেক হয় জার্মান বংশোদ্ভূত রসায়নবিদ উইলিয়াম ডোলানের উপর। সেই সময় পাস্কাগৌলায় বসবাস করতেন তিনি। মিসিসিপি উপকূলে যুদ্ধকালীন উত্তেজনার পরিবেশে অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তিনি এক জন জার্মান গুপ্তচর। প্রতিবেশীরা দাবি করতে শুরু করেন যে ডোলানই সন্দেহজনক সেই ফ্যান্টম বারবার।
ঘটনার তদন্ত করার সময়, পুলিশ ডোলানের জানালার বাইরে বেশ কয়েকটি চুলের গোছা খুঁজে পায়। ফলে হাইডেলবার্গ এবং তাঁর স্ত্রীর উপর হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ৫৭ বছর বয়সি জার্মান রসায়নবিদকে গ্রেফতার করে পুলিশপ্রধান ইজেল। এই ঘটনার কয়েক মাস আগে অনুপ্রবেশের অভিযোগে ডোলানকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। হাইডেলবার্গের বাবা তথা স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে তাঁর বিবাদ তৈরি হয়েছিল।
ডোলানই আদতে পাস্কাগৌলার ‘ফ্যান্টম বারবার’ ছিলেন কি না তা নিয়ে বিতর্ক এখনও অব্যাহত। কেউ কেউ অনুমান করেন যে সম্ভবত হাইডেলবার্গই তাঁকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দিয়েছিলেন। অন্যেরা মনে করেন যে প্রকৃত ‘ফ্যান্টম বারবার’ হয়তো কোনও দিনই ধরা পড়েনি, কারণ ডোলান একটি পৃথক ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছিলেন।
ডোলানকে কখনও চুরি বা গভীর রাতে চুল কাটার জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। তবে তাঁকে হত্যার চেষ্টার জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। ১০ বছরের কারাদণ্ডের সাজা শোনানো হয় ডোলানকে। ১৯৫১ সালে, মিসিসিপির গভর্নর ফিল্ডিং রাইট মামলাটি পর্যালোচনা করেন এবং কারাগার থেকে মুক্তি হয় ডোলানের।
আজও মিসিসিপির উপকূলীয় বাসিন্দাদের মধ্যে অদ্ভুত অপরাধের ঘটনা নিয়ে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। অনেকে এখনও ডোলানকেই সমস্ত ঘটনার জন্য দোষারোপ করছেন। মামলায় দোষী সাব্যস্ত না হয়েও তাঁর নামের সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে অশরীরী নাপিতের তকমা। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে পাস্কাগৌলার ‘বারবার ফ্যান্টম’ অধরাই থেকে গিয়েছিল।
সব ছবি:সংগৃহীত।