অনেককে পদ থেকে সরানো হয়েছে। অনেককে আবার কোনও রকম পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। চিনের বেশ কয়েক জন ‘নগ্ন কর্মকর্তা’ (নেকেড অফিসিয়াল)দের নিয়ে গত বছর তেমনটাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেজিংয়ের শি জিনপিং সরকার! আমেরিকাভিত্তিক এবং সিআইএ-প্রভাবিত সংস্থা ‘দ্য জেমস্টাউন ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তেমনই তথ্য।
ওই প্রতিবেদন বলছে, গত বছর চিনের বেশ কয়েক জন ‘নগ্ন’ সরকারি কর্মকর্তাকে পদ্ধতিগত ছাড়পত্রের মাধ্যমে তাঁদের পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছিল। চিনের এই ‘নগ্ন’ সরকারি কর্তা কারা?
চিনে ‘নেকেড অফিসিয়াল’ বলতে সেই উচ্চপদস্থ সরকারি আধিকারিক বা কর্মকর্তাদের বোঝায়, যাঁদের স্ত্রী বা সন্তান বিদেশে বসবাস করেন।
২০২৫ সালের নভেম্বরে চিনের কমিউনিস্ট পার্টি ঘোষণা করে, ২০ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘দলীয় শৃঙ্খলার গুরুতর লঙ্ঘন’ এবং ‘দুর্নীতি’র অভিযোগ থাকায়, তাঁরা আর দলকে নেতৃত্ব দেবেন না বা দলে কোনও ভূমিকা পালন করবেন না। যদিও দলের তরফে তাদের বরখাস্ত করা হয়নি। তাঁরা এখনও দলীয় সদস্য হিসাবে রয়েছেন।
এর পর গত সপ্তাহে ‘দ্য জেমস্টাউন ফাউন্ডেশন’-এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা, বিদেশি চাপ বা দেশের গোপন তথ্য যাতে সুরক্ষিত থাকে সেই কারণেই ওই পদক্ষেপ করা হয়েছে। বিদেশে পরিবার রয়েছে এমন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি ‘শূন্য সহনশীলতা’ দেখানো হবে বলেও নাকি জিনপিং সরকারের তরফে জানানো হয়েছে।
প্রাক্তন সিআইএ বিশ্লেষক পিটার ম্যাটিস পরিচালিত ‘দ্য জেমস্টাউন ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিনের যে কর্তাদের পদ থেকে সরানো হয়েছে তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ‘পিপল্স ব্যাঙ্ক অফ চায়না’র প্রাক্তন গভর্নর ই গ্যাং এবং হংকঙে দীর্ঘ সময় ধরে কর্মরত তথা বিদেশি বিষয় দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা ওয়াং রং।
তাঁদের অপসারণের জন্য কমিউনিস্ট পার্টির অধীনে একটি শীর্ষ উপদেষ্টা সংস্থা ‘চাইনিজ় পিপল্স পলিটিক্যাল কনসালটেটিভ কনফারেন্স (সিপিপিসিসি)’-কেই দায়ী করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সরকারের তরফে বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মাথায় থাকা একাধিক উচ্চপদস্থ কর্তা এবং আইনসভার সদস্যদেরও একই রকম ভাবে পদ থেকে সরানো হয়েছে। এমনকি, পরিবার বিদেশে রয়েছে এমন ভাইস মেয়র, বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি এবং ঊর্ধ্বতন নীতি উপদেষ্টাদেরও অপসারণ করা হয়েছে।
তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাংহাইয়ের ভাইস মেয়র লিউ ডুও, বেজিং মিউনিসিপ্যাল পিপল্স কংগ্রেস স্ট্যান্ডিং কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ইয়ান আওশুয়াং, চিনের রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় নীতি গবেষণা অফিসের প্রাক্তন উপ-পরিচালক লিন শাংলি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রাক্তন উপমন্ত্রী এবং পরবর্তী কালে হুয়াজং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্টি সম্পাদক ঝাং গুয়াংজুন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের ওই পরিবর্তনের লক্ষ্য এটা প্রমাণ করা যে চিনের কমিউনিস্ট পার্টি তার সাংগঠনিক লাইন পুনর্নির্মাণ করছে এবং এটা প্রচার করার চেষ্টা করছে যে জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য সরকারি আমলাদেরও সক্রিয় ভাবে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়।
অনেক দিন ধরেই বিদেশি যোগ চিনের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ছিল। বছরের পর বছর ধরে পশ্চিমি আদবকায়দা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে শিক্ষা নেওয়া চিনের বহু অর্থনীতিবিদ, বিজ্ঞানী এবং প্রশাসক দেশে ফিরে বেজিঙের জায়গা বিশ্বদরবারে পোক্ত করেছেন। আর সে কারণেই সরকারের ওই সব কাছের মানুষদের বিদেশে পরিবার থাকার বিষয়টি মেনে নিচ্ছিল সরকার।
এমনকি, বিষয়টি বহির্বিশ্বের সঙ্গে চিনের হয়ে সেতুবন্ধনেরও কাজ করত। তবে ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই নীতি বদলে ফেলেছে চিন। সহনশীলতাও শেষ হয়ে গিয়েছে।
তবে বিদেশে পরিবার রয়েছে চিনের এমন ঊর্ধ্বতন কর্তাদের সরকারের তরফে অনেক আগেই সাবধান করা হয়েছিল। জানানো হয়েছিল, যাঁদের পরিবার চিনে ফিরবে না, তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক তদন্তের পরিবর্তে প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে বা পদোন্নতি দেওয়া হবে না। পুনর্নিযুক্ত করা হলেও কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হবে না তাঁদের।
শি জিনপিং প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর চিনের ‘নগ্ন’ কর্মকর্তাদের জাতীয় নিরাপত্তা, কূটনীতি এবং সামরিক বাহিনী সম্পর্কিত সংবেদনশীল পদে থাকার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল। নির্দেশ ছিল স্পষ্ট, হয় পরিবারকে চিনে ফেরাও, নয়তো পদত্যাগ করো।
কর্তাব্যক্তিদের অপসারণের সময় তিনি কোন গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন এবং তিনি সরকারের ঘনিষ্ঠ কি না, তা-ও বিচার করে দেখা হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে চিনা অর্থনীতিবিদ ই গ্যাংয়ের অপসারণ।
আমেরিকা থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া চিনা এই অর্থনীতিবিদের পরিবার থাকে আমেরিকায়। কিন্তু তিনি কাজ করতেন চিনেই। তাঁর যোগ্যতা একসময় তাঁকে কঠোর তদন্তের হাত থেকে রক্ষা করেছিল। তবে এখন সেই সুরক্ষা আর প্রযোজ্য হয়নি। সরকারি পদ থেকে সরানো হয়েছে তাঁকে।
কিছু দিন পর্যন্তও চিনের রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ছিলেন লিন শাংলি। তাঁকে কমিউনিস্ট পার্টির ‘দ্বিতীয় পার্টি স্কুল’ হিসাবেও বর্ণনা করা হত। পলিটব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য ওয়াং হুনিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার জন্যও পরিচিত ছিলেন শাংলি। তবে তাঁর পরিবার বিদেশেই থাকত।
কিন্তু নগ্ন কর্তাদের প্রতি সরকার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পর শাংলিকেও তাঁর পদ থেকে আকস্মিক ভাবে অপসারণ করা হয়েছে। পলিটব্যুরো সদস্যের সঙ্গে সুসম্পর্কও তাঁর আকস্মিক অপসারণ থামাতে পারেনি।
ওয়াকিবহাল মহল সূত্রে খবর, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্তাদের অনেকেই বিদেশে পরিবার থাকার বিষয়ে জিনপিং সরকারে ‘জ়িরো টলারেন্স’ নীতি নিয়ে তটস্থ হয়ে রয়েছেন। অনেকে আবার স্ত্রী এবং সন্তানদের চিনে ফিরিয়ে এনেছেন।
সব ছবি: সংগৃহীত।