মাটির নীচে সোনার ভান্ডার ফুরিয়ে গেলে কী হবে, তা নিয়ে চিন্তায় সমস্ত দেশ। সোনার প্রাকৃতিক ভাঁড়ার শেষ হওয়ার আগেই সোনার নিরবচ্ছিন্ন জোগান বজায় রাখার উপায় বার করতে বহু দেশের গবেষক প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এই দৌড়ে অন্যান্যদের তুলনায় কিছুটা এগিয়ে গিয়েছে ভারতের পূবের প্রতিবেশী।
গোপনে দীর্ঘ দিন ধরে কৃত্রিম ভাবে সোনা ফলানোর চেষ্টা করে আসছেন চিনা গবেষকেরা। গবেষণাগারে সোনা তৈরি দীর্ঘ দিন ধরেই চিনের আগ্রহের বিষয়। চিনের ধাতু বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পদ্ধতিতে এই মূল্যবান ধাতু তৈরির সুলুকসন্ধান করে চলেছেন। সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ও সমাজমাধ্যমে দাবি উঠেছে যে, কৃত্রিম উপায়ে সোনা তৈরি করে ফেলেছে শি জিনপিঙের দেশ। তবে কি সোনার দর আকাশ ছুঁলেও কুছ পরোয়া নেই!
সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদন এবং অনলাইনে ফাঁস হওয়া তথ্যে দাবি উঠেছে যে, চিন কৃত্রিম সোনা তৈরি করেছে যা দেখতে আসল সোনার মতো। কিছু সূত্রের মতে, উন্নত পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তা তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। যদিও বেজিঙের পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে কৃত্রিম ভাবে সোনা ফলানোর সত্যতা নিশ্চিত করা হয়নি। তবুও গবেষণাগারে সোনা তৈরির এই দাবি বিশ্বব্যাপী রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছে।
চার দেওয়ালের মধ্যে কৃত্রিম পরিবেশে সোনা তৈরির পদ্ধতির কার্যকারিতা কতখানি? এর কি কোনও বাস্তব প্রয়োগ রয়েছে? না কি এটি কেবল একটি অসম্ভব স্বপ্ন? এ সব বিষয়ে নানা মুনির নানা মত।
সূত্র অনুসারে, চিনা গবেষকেরা পারমাণবিক স্তরে অত্যাধুনিক কারিকুরি করে যে ধাতুটি তৈরি করেছেন তার পারমাণবিক গঠন, ভৌত রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং আচরণ প্রাকৃতিক সোনার মতোই। এর আগে চিনের গবেষকেরা এমন একটি পদ্ধতি বার করেছিলেন যার মাধ্যমে কঠিন ধাতুর মধ্যে সমান ভাবে ছোট ছোট ছিদ্র তৈরি করে হালকা ও শক্তিশালী খাঁটি সোনা তৈরি করা সম্ভব।
চিনা বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন যে, তাঁদের পদ্ধতি সোনা নিষ্কাশনের প্রাচীন পদ্ধতির মোড় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দিতে পারে। গবেষণাগারে তৈরি এই প্রক্রিয়াটিকে পরিষ্কার, নিরাপদ এবং নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত সহজ বলে দাবি করেছেন তাঁরা। এর ফলে যে শক্তি খরচ হবে পরিবেশে তার প্রভাব পড়বে নগণ্যই।
চিনের বিজ্ঞানীরা সোনার ভিতরে ১০০ ন্যানোমিটারের চেয়ে ছোট সুষম ছিদ্র (ন্যানোপোর) তৈরি করে সেগুলিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী এবং হালকা করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন বলে দাবি। এই নতুন প্রযুক্তিতে ডি-অ্যালয়িং ক্ষয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সোনার কাঠামোর মধ্যে ছিদ্র তৈরি করা হয়। এই পদ্ধতিতে সোনায় অতিরিক্ত উপাদান যোগ না করেই শক্তিশালী করে তোলা হয়।
মধ্য যুগ থেকেই ধাতু থেকে সোনা তৈরি করা সম্ভব কি না তা নিয়ে অ্যালকেমিস্টদের গবেষণার অন্ত ছিল না। অ্যালকেমি বা রসায়নের প্রাথমিক এই ধারায় দাবি করা হয়, বিভিন্ন ধাতুকে সোনায় বদলে ফেলা সম্ভব। একটি বিশেষ উপাদানে সিসা বা তামার মতো সাধারণ ধাতুও সোনায় পরিণত হয় বলে দাবি করা হয়েছিল।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে রসায়ন পরিণত হয় বিক্রিয়ার বিজ্ঞানে। নানা পদার্থের পরমাণু থেকে অণু, সেই সব অণুর মধ্যে বিক্রিয়া, অণু-পরমাণু জুড়ে জুড়ে নতুন পদার্থ তৈরি... অণু-পরমাণুর মধ্যে হেরফের করিয়ে সোনা তৈরির চেষ্টায় পিছিয়ে ছিলেন না বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা। তাঁরাও কৃত্রিম ভাবে সোনা ‘ফলানোর’ চেষ্টা করে গিয়েছেন।
অনেকে সাফল্য পেয়েছেন আংশিক ভাবে। যেমন ইউরোপের নিউক্লিয়ার রিসার্চ অর্গানাইজ়েশন বা ‘সার্ন’-এর বিজ্ঞানীরা। সিসা থেকে সোনা তৈরি হয়েছে সুইৎজ়ারল্যান্ডের রাজধানী জেনিভার অদূরে ‘সার্ন’-এর ভূগর্ভস্থ লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে। লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের গবেষকেরা সিসাকে সোনায় পরিণত করে অ্যালকেমিস্টদের একসময়ের অসম্ভব স্বপ্নকে পূর্ণ করেছেন। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য হলেও সিসা থেকে সোনা তৈরির এই বিরল মুহূর্তটি স্থায়ী হয়েছিল।
সোনা একটি উচ্চ পরিবাহী এবং ক্ষয় প্রতিরোধী ধাতু বলে পরিচিত। স্মার্টফোন থেকে শুরু করে মহাকাশের যন্ত্রপাতির মতো উচ্চমানের বৈদ্যুতিন শিল্পে সোনার জুড়ি মেলা ভার। সস্তা, সহজলভ্য কৃত্রিম সোনার ব্যবহার শুরু হলে তা উন্নত প্রযুক্তিকে আরও সাশ্রয়ী এবং নির্ভরযোগ্য করে তুলতে পারে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞ মহলের।
গবেষণাগারে উৎপন্ন হওয়া সোনা বদলে দিতে পারে খনিশিল্পের রূপও। একই সঙ্গে কমবে পরিবেশ দূষণ। কারণ ছোট পরিসরের খনিতে সোনা বার করে আনতে সবচেয়ে বেশি যে ধাতু ব্যবহৃত হয় তা হল পারদ। পারদের সঙ্গে সোনার বিক্রিয়ায় তৈরি হয় একটি ভারী মিশ্রণ। সেটি উত্তপ্ত করে হলুদ ধাতুকে আলাদা করা হয়। কিন্তু এই রাসায়নিক প্রক্রিয়া শ্রমিক ও পরিবেশ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। বিশ্বে পারদ দূষণের সবচেয়ে বড় উৎসই হল ছোট ছোট খনি।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। সেই দিকটির কথা ভেবে আশঙ্কিত হচ্ছেন অনেকেই। এই গবেষণা সত্যি প্রমাণ হলে আগামী দিনে বহু দেশের সোনার সঞ্চয়ের উপর আস্থা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। অনিশ্চিত সময়ে সোনাকে সবসময়ই সবচেয়ে নিরাপদ সম্পদ হিসাবে দেখা হয়েছে।
কিন্তু যদি সোনা কৃত্রিম ভাবেই উৎপাদন করার পন্থা হাতের মুঠোয় এসে যায়, তবে সোনার চড়া মূল্যের বুদবুদ নিমেষে ফেটে যেতে পারে। কমদামি সহজলভ্য ধাতুর মতোই ফ্যাকাশে হয়ে পড়তে পারে হলুদ ধাতু।
যদি চিনের এই প্রযুক্তি অদূর ভবিষ্যতে ব্যবসায়িক রূপ নেয় এবং বাজারে প্রবেশ করে, তা হলে তা বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থার ভিত নড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের। জোগান সহজ হয়ে যাওয়ায় সোনার দামে ধস নামতে পারে। অন্য দিকে চিনের হাতে সোনা তৈরির সূত্র পরিপূর্ণ ভাবে চলে এলে সোনার বাজারে একছত্র আধিপত্য কায়েম করতে উঠেপড়ে লাগবে তারা। ফলে পৃথিবীর সোনা সঞ্চয়কারী দেশগুলির সোনার রিজ়ার্ভ মূল্যহীন হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।
সোনা কেবল বিরল বলেই মূল্যবান নয়। বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এটি সৌন্দর্য, শক্তি এবং স্থায়িত্বের প্রতীক। বিয়ের গয়না থেকে শুরু করে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসাবেও সোনা প্রায় সমস্ত মানুষের কাছে ভরসার জায়গা। তবে কি ভবিষ্যতে ইচ্ছামতো গবেষণাগারে সোনা তৈরি করা সম্ভব হবে? গয়নার দোকান, ব্যাঙ্ক, অর্থনীতি থেকে সোনা তার কৌলীন্য হারাতে শুরু করবে?
সব ছবি: সংগৃহীত ও এআই সহায়তায় প্রণীত।