নব্বইয়ের দশকের অন্যতম ব্যস্ত অভিনেতা ছিলেন। একই সঙ্গে নাকি একাধিক ছবির শুটিং সামলাতেন। কিন্তু বয়স ষাটের গণ্ডি পেরিয়ে যাওয়ার পরেও পরকীয়া সম্পর্কের জন্য বারংবার শিরোনামে উঠে আসেন বলিউডের ‘চিচি’ গোবিন্দ। তাঁর স্ত্রী সুনীতা অহুজা অভিনেতার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের সুর গুনগুন করলেও সম্পর্কে ইতি টানেন না। কিন্তু কাদা ছোড়াছুড়ি চলে অনবরত।
১৯৮৭ সালের মার্চ মাসে সুনীতাকে বিয়ে করেন গোবিন্দ। নায়কের দীর্ঘ দিনের বান্ধবী ছিলেন তিনি। শোনা যায়, বলিপাড়ার সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও গোবিন্দের কেরিয়ার গড়তে সাহায্য করেছিলেন সুনীতা।
বলিপাড়ার অধিকাংশের দাবি, নায়িকার সঙ্গে অন্তরঙ্গ দৃশ্যে অভিনয়ের সময় আড়ষ্ট হয়ে পড়তেন গোবিন্দ। অভিনেতার এই আড়ষ্ট ভাব দেখে বকাবকিও করতেন পরিচালকেরা। পর্দার বাইরে কোনও রোম্যান্টিক সম্পর্কে জড়ালে যে গোবিন্দের আড়ষ্টতা কেটে যেতে পারে, সেই পরামর্শও অভিনেতাকে দিয়েছিলেন অনেকে।
বান্ধবীর সঙ্গে সময় কাটালে নায়িকাদের সঙ্গেও সহজ হতে পারবেন ভেবে সুনীতার সঙ্গে মেলামেশা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন গোবিন্দ। গোড়ার দিকে দু’জনের মধ্যে নিছক বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। নায়কের বাড়িতে আসা-যাওয়া লেগে থাকত সুনীতার। পুত্রের বান্ধবীকে দেখে পছন্দ হয়ে গিয়েছিল গোবিন্দের মায়ের।
পুত্রবধূ হিসাবে সুনীতাকেই চান, তা গোবিন্দকে স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন অভিনেতার মা। কিন্তু তাতে আপত্তি ছিল খোদ গোবিন্দের। বলিপাড়ার একাংশের দাবি, কেরিয়ারের জন্য বিয়েতে আপত্তি জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সুনীতাকে বিয়ে না করার কারণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বলিপাড়ার গুঞ্জন, একসঙ্গে হাতেগোনা কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করলেও সহ-অভিনেত্রী নীলম কোঠারিকে মন দিয়ে ফেলেছিলেন গোবিন্দ। বলি প্রযোজকের দফতরে নায়িকাকে প্রথম দেখেছিলেন তিনি। প্রথম দেখাতেই নীলমের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন অভিনেতা।
নীলমের সঙ্গে অভিনীত প্রতিটি ছবিই বক্সঅফিসে ভাল ব্যবসা করায় গোবিন্দের ধারণা হয়েছিল, নীলমই তাঁর কেরিয়ারের ক্ষেত্রে সৌভাগ্য বয়ে এনেছেন। প্রথম আলাপের পর গোবিন্দ নাকি নীলমের সঙ্গে কথা বলতেও ভয় পেতেন।
ইংরেজি ভাষায় ভাল কথা বলতে পারতেন না গোবিন্দ। অন্য দিকে, নীলম ছিলেন ধনী পরিবারের মেয়ে। মানসিকতা এবং সামাজিক অবস্থানের বহু পার্থক্য ছিল দু’জনের মধ্যে। নীলমের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলতে শুরু করলেও ধীরে ধীরে তাঁদের মাঝে বরফ গলতে থাকে। নীলমকে তাঁর এতটাই পছন্দ ছিল যে, সুনীতাকেও মাঝেমধ্যে বলতেন নীলমের মতো সাজগোজ করতে।
এক দিকে নীলম, অন্য দিকে সুনীতা। সম্পর্কের দোটানায় পড়ে জীবনের সমীকরণ কঠিন হয়ে পড়েছিল গোবিন্দের। বলিপাড়ার জনশ্রুতি, নীলমকে বিয়েও করতে চেয়েছিলেন গোবিন্দ। এমনকি, নীলম নাকি তাঁর মায়ের সঙ্গে গোবিন্দের বাড়িতে বিয়ের কথা বলতেও গিয়েছিলেন। নীলমকে বিয়ে করার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলেন শুনে গোবিন্দকে বারণ করেছিলেন তাঁর মা।
গোবিন্দ এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, সুনীতার সঙ্গে বাগ্দান পর্যন্ত ভেঙে ফেলতে চেয়েছিলেন তিনি। অনুষ্ঠানের পাঁচ দিন আগে সুনীতা ফোন করে গোবিন্দের সঙ্গে কথা বলে তাঁর মন স্থির করেন। নীলমকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে যান গোবিন্দ।
সুনীতাকে বিয়ে করলেও সে কথা গোপন রেখেছিলেন গোবিন্দ। বলিপাড়ার একাংশের অনুমান, কেরিয়ারের জন্যই বিয়ের কথা লুকিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বলিজগতের অধিকাংশের দাবি, বিয়ের কথা নীলমকে জানাতে চাননি গোবিন্দ। তাই নিজেকে অবিবাহিত বলেই পরিচয় দিতেন অভিনেতা।
বিয়ের পরেও নাকি নীলমের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন গোবিন্দ। তবে গোবিন্দ এবং সুনীতার বিয়ের এক বছর পূর্ণ হওয়ার পর সে কথা জানতে পেরে গিয়েছিলেন নীলম। কানাঘুষো শোনা যায় যে, বিয়ের কথা জানার পর নীলম নিজেই গোবিন্দের কাছ থেকে দূরে সরে যান।
যদিও গোবিন্দের সঙ্গে সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেন নীলম। এক পডকাস্টে তিনি বলেন, ‘‘গোবিন্দ খুব ভাল মানুষ। কিন্তু ওর সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক ছিল না। আসলে, তখন যে কেউ এ সব নিয়ে লিখে ফেলতেন। এগুলোর তো কোনও প্রমাণ নেই। তাই কিছু করাও যায় না।’’
নীলমের পর এক বাঙালি নায়িকার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন গোবিন্দ। ২০০০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘হদ কর দি আপনে’ ছবিতে গোবিন্দের বিপরীতে অভিনয়ের প্রথম সুযোগ পান রানি মুখোপাধ্যায়। শুটিংয়ের জন্য বিদেশেও পাড়ি দিতে হয়েছিল তাঁদের। কানাঘুষো শোনা যায়, সেই সময় থেকেই নায়িকার সঙ্গে বন্ধুত্ব জমে উঠেছিল গোবিন্দের।
শুটিংয়ের পরেও নাকি রানির সঙ্গে একান্তে সময় কাটাতেন গোবিন্দ। মুম্বই ফিরে যাওয়ার পরেও তাঁদের বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হতে শুরু করে। কানাঘুষো শোনা যেতে থাকে, মাঝেমধ্যেই নাকি রানির সঙ্গে দেখা করতে যেতেন গোবিন্দ। নায়িকাকে দামি উপহারও দিতেন তিনি।
সম্পর্কের গোপনীয়তা বেশি দিন রক্ষা করতে পারেননি গোবিন্দ এবং রানি। শোনা যায়, হোটেলের একটি ঘর থেকে গোবিন্দকে রাতপোশাক পরে বেরিয়ে যেতে দেখেছিলেন এক সাংবাদিক। সেই ঘরে নাকি রানি ছিলেন। এই কথা ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগেনি। রানির সঙ্গে গোবিন্দ বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে রয়েছেন বলে নায়িকাকে ‘তৃতীয় ব্যক্তি’র তকমাও দেওয়া হয়।
গোবিন্দের সঙ্গে পরকীয়া প্রসঙ্গে রানি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘অনেকেই অনুমান করে ফেলেন যে, গোবিন্দের সঙ্গে কোনও নায়িকা তিন-চারটি ছবিতে অভিনয় করছেন মানেই নায়কের সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়েছেন। আমি তো প্রথম নই। এর আগেও গোবিন্দের সঙ্গে অনেক নায়িকার নাম জড়িয়েছে। তবে আমি এতটুকুই বলতে পারি যে, গোবিন্দের মতো ভাল বন্ধু সহজে পাওয়া যায় না।’’
তারকা-স্বামীর সঙ্গে রানির বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের কথা জানতে পেরে মন ভেঙে গিয়েছিল গোবিন্দের স্ত্রী সুনীতার। জনশ্রুতি, সব ছেড়ে তিনি বাপের বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু গোবিন্দ তাঁর ভুল বুঝতে পেরে পরকীয়া সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুনীতার সঙ্গেও গোবিন্দের সম্পর্ক ঠিক হয়ে যায়।
বয়সে ৩১ বছরের ছোট তরুণীর সঙ্গেও নাম জড়িয়ে পড়েছিল গোবিন্দের। শোনা যেতে থাকে, সেই তরুণী পেশায় মরাঠি অভিনেত্রী। তাঁর কারণেই নাকি ৩৭ বছরের দাম্পত্যে পাকাপাকি ভাবে ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সুনীতা। গোবিন্দের এই আচরণ নিয়ে প্রকাশ্যে কটাক্ষ করার সুযোগ ছাড়তেন না তিনি।
মহিলারা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য যে গোবিন্দের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, সে দাবিও করেছিলেন সুনীতা। বার বার গোবিন্দের পরকীয়া নিয়ে আলোচনা করছিলেন বলে সুনীতার প্রতি বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন অভিনেতা।
সুনীতার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে গোবিন্দ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘‘আমি তো একটাই বিয়ে করেছি। দু’-তিনটে বিয়ে তো করিনি। আসলে চলচ্চিত্রজগতে এ সব নিয়ে কেউ খোলাখুলি আলোচনা করেন না। এই জগতে হাতেগোনা কয়েক জনকেই দেখেছি, যাঁদের চরিত্রে দাগ নেই।’’
সুনীতা এবং গোটা পরিবারের কাছে গোবিন্দ অনুরোধও করেন, তাঁরা যেন সংবাদমাধ্যমের কাছে আর কোনও রকম বিতর্কিত বিবৃতি প্রকাশ না করেন। ২০১৯ সালে ‘রঙ্গীলা রাজা’ ছবির পর আর কোনও হিন্দি ছবিতে অভিনয় করতে দেখা যায়নি গোবিন্দকে। বারংবার বর্ণময় জীবন নিয়ে চর্চায় এসেছেন তিনি।
সব ছবি: সংগৃহীত।