বর্ষায় ফুঁসে ওঠা ‘পাগলা’ নদীর জারিজুরি খতম। বিশ্বের বৃহত্তম বাঁধ তৈরি করে বিপুল জলরাশির উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে চিন। যদিও ড্রাগনভূমির এ-হেন প্রযুক্তিগত উন্নতিতে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। তাঁদের দাবি, জল আটকাতে গিয়ে ভয়ঙ্কর এক মারণফাঁদ বানিয়েছে বেজিং। সামান্য অসাবধানতায় ৪০ লাখ জনতা-সহ পৃথিবীর বুক থেকে মুছে যেতে পারে গোটা তিনেক শহর! তবে বিষয়টিকে পশ্চিমি দুনিয়ার মিথ্যা প্রচার বলে খারিজ করেছে মান্দারিনভাষী শি জিনপিঙের সরকার।
এশিয়ার দীর্ঘতম ইয়াংৎজি নদীর উপর তৈরি ওই চিনা বাঁধের পোশাকি নাম ‘থ্রি গর্জেস’। এটি তৈরি করতে ৩,৭০০ কোটি ডলার খরচ করেছে বেজিং। টানা ১৭ বছর ধরে চলেছে এর নির্মাণকাজ। ২০০৩ সালে বাঁধটির উদ্বোধন করে ড্রাগনভূমির সরকার। এই প্রকল্পের মাধ্যমে জলবিদ্যুৎও উৎপাদন করছে মান্দারিনভাষী প্রশাসন। ফলে বাঁধ সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় আলো-পাখা চালানোর ব্যবস্থা করতে পেরেছেন তারা।
২০২০ সালে কৃত্রিম উপগ্রহের তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে প্রথম বার এই বাঁধের ব্যাপারে উদ্বেগপ্রকাশ করেন মার্কিন ইঞ্জিনিয়ারদের একাংশ। তাঁদের দাবি, বিপুল জলরাশির চাপে ধীরে ধীরে বেঁকে যাচ্ছে ‘থ্রি গর্জেস’-এর মূল কাঠামোর একাংশ। এই পরিস্থিতি বজায় থাকলে আগামী দিনে বাঁধটির ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকছে ষোলো আনা। সে ক্ষেত্রে গর্বের পরিকাঠামোটির জন্য ভয়ঙ্কর এক ধ্বংসলীলা যে বেজিংকে প্রত্যক্ষ করতে হবে, তা বলাই বাহুল্য।
সত্যিই ‘থ্রি গর্জেস’ বাঁধ ভেঙে পড়লে কতটা লোকসানের মুখে পড়বে চিন? গত দু’তিন বছরে এ ব্যাপারে পশ্চিমি গণমাধ্যমগুলিতে প্রকাশিত হয়েছে একাধিক প্রবন্ধ। বিশ্লেষকদের দাবি, সে ক্ষেত্রে বিপুল গতিতে ছুটে এসে একের পর এক এলাকাকে ‘গিলে নেবে’ ২০ তলা অট্টালিকার সমান ইয়াংৎজি নদীর জল। ওই সময় ধ্বংসাত্মক স্রোতস্বিনীর বিপুল জলরাশির গতিবেগ দাঁড়াবে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বা তারও বেশি।
বিশেষজ্ঞদের অনুমান, ‘থ্রি গর্জেস’ ভাঙার প্রথম অভিঘাতে ছিন্নভিন্ন হবে চিনের ইলিং জেলা। কারণ, সেখানকার সান্ডৌপিঙে সংশ্লিষ্ট বাঁধটি তৈরি করেছে বেজিং। ফলে মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে ওই শহর ও তার আশপাশের সমস্ত এলাকা। এর জেরে কম-বেশি ৪০ লক্ষ বাসিন্দার মৃত্যু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
ইলিং গিলে নেওয়ার পর ইয়াংৎজির রোষে পড়বে ইউহান। চিনের শিনজ়িয়ান প্রদেশের এই এলাকাতেই সর্বাধিক উইঘুর মুসলিম বসবাস করেন। এ-হেন ইউহানের জনসংখ্যা ১.১ কোটি বলে জানা গিয়েছে। বাঁধ ভাঙলে মাত্র ছ’ঘণ্টার মধ্যে সেখানে ঢুকে পড়বে নদীর জল। তার পর সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে সেটা ছুটবে বেজিঙের অন্যতম বাণিজ্যিক শহর সাংহাইয়ের দিকে।
ইঞ্জিনিয়ারদের অনুমান, বাঁধ ভাঙলে সাংহাই পর্যন্ত পৌঁছোতে ওই বিপুল জলরাশির সময় লাগবে মেরেকেটে ২৪ ঘণ্টা। চিনের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহরটির জনসংখ্যা প্রায় ২.৬ কোটি। শুধু তা-ই নয়, গোটা এলাকাটা আবার ইয়াংৎজি নদীর নিম্ন অববাহিকায় গড়ে উঠেছে। ফলে সলিলসমাধি হওয়া থেকে একে কোনও ভাবেই বাঁচানো যাবে না বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
উল্লেখ্য, ১৯৯৪ সালে ‘থ্রি গর্জেস’ বাঁধের নির্মাণকাজ শুরু করে চিন। ১.৪ মাইল (প্রায় ২.৩ কিলোমিটার) লম্বা এবং ১৮৫ মিটার উঁচু সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামোটি তৈরি করা বেজিঙের কাছে ছিল অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। বাঁধটির জন্য পৃথিবীর আহ্নিক গতিতে পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। যদিও তাঁদের কথাকে সে ভাবে পাত্তা দেয়নি ড্রাগন প্রশাসন।
২০০৫ সালে ‘থ্রি গর্জেস’ বাঁধ নিয়ে বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করে মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সংস্থা নাসা (ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন)। তাঁরা জানান, এই বাঁধের বিপুল জলরাশির চাপে আগের চেয়ে কিছুটা ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে পৃথিবী। এর মাঝের অংশ সামান্য স্ফীত এবং দুই মেরু অঞ্চল চেপে গিয়েছে।
তা ছাড়া ‘থ্রি গর্জেস’-এর জন্য আগের চেয়ে কমেছে পৃথিবীর আহ্নিক গতি। ফলে ০.০৬ মাইক্রোসেকেন্ড বৃদ্ধি পেয়েছে দিনের দৈর্ঘ্য। সময়ের পরিমাণটা অত্যন্ত কম হওয়ায় আমজনতার নজরে পড়ছে না সেটি। এই বাঁধ নির্মাণে ৪০ হাজারের বেশি কর্মীকে কাজে লাগায় চিন। এর কাঠামো তৈরিতে ব্যবহার হয়েছে প্রায় তিন কোটি ঘনমিটারের কংক্রিট।
‘থ্রি গর্জেস’ নির্মাণের পর প্রথম বার বাঁধের জলাধার পরিপূর্ণ করার সময়েই বিপাকে পড়েন চিনা ইঞ্জিনিয়ারদের দল। হঠাৎ করে সেখান থেকে জল বেরিয়ে ভাসিয়ে দেয় বেশ কিছু এলাকা। ফলে বেজিঙের প্রকল্পটি নিয়ে দানা বাঁধে বিক্ষোভ। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক মহলেও কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়ে মান্দারিনভাষীরা। যদিও তাতে দমে না গিয়ে খুব দ্রুত ত্রুটি খুঁজে বার করে এটি তৈরির দিকে মন দেয় তারা।
বাঁধ ভাঙার ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়া। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে জোড়া নদীবাঁধ ভেঙে ভয়ঙ্কর এক প্লাবনের মুখে পড়ে সেখানকার পূর্বাঞ্চলীয় শহর দেরনা। বন্যার প্রকোপে রাতারাতি মানচিত্র থেকে মুছে যায় ওই এলাকা। এই ঘটনার পর সামনে আসে একটাই প্রশ্ন— প্লাবন ঠেকাতে তৈরি করা দু’-দু’টি নদীবাঁধ একসঙ্গে ভাঙল কী ভাবে? তীব্র হতে শুরু করে অন্তর্ঘাতের তত্ত্ব।
ভূমধ্যসাগরের কোলের শহর দেরনার বুক চিরে বয়ে গিয়েছে ওয়াদি দেরনা নদী। ফি বছর বৃষ্টি হলেই বন্যা পরিস্থিতির শিকার হতেন সেখানকার বাসিন্দারা। ফলে প্লাবন ঠেকাতে বাঁধের দাবি জোরালো হতে শুরু করে। উন্নয়নমূলক এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল লিবিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতা, গত চার দশকের বেশি সময় ধরে যা উত্তর আফ্রিকার দেশটিকে রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
১৯৬০-এর দশকে প্রথম বার দেরনাকে রক্ষা করার জন্য নদীর উপর দু’টি বাঁধ তৈরির পরিকল্পনা করে লিবিয়ার সরকার। সেচ দফতরের একাধিক সমীক্ষার পর ঠিক হয় যে, নদীর উপরের দিকের অববাহিকায় প্রথম বাঁধটি নির্মাণ করা হবে। দ্বিতীয় বাঁধটি থাকবে শহরের ঠিক মুখে। এতে প্লাবন ঠেকানোর পাশাপাশি নদীর জল আশপাশের কৃষিক্ষেত্রেও ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। ফলে বাড়বে ফসল উৎপাদন।
১৯৭০ সালে সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনায় সবুজ সঙ্কেত দেয় লিবিয়ার সরকার। এই দুই বাঁধ নির্মাণের বরাত দেওয়া হয় সাবেক যুগোস্লাভিয়ার একটি সংস্থাকে। পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ করতে তাঁদের সাত বছর সময় লেগে গিয়েছিল। ১৯৭৭ সালে উদ্বোধনের সময়ে নদীর উচ্চ অববাহিকার বাঁধটির নাম রাখা হয় আল-বিলাদ। এর জলধারণ ক্ষমতা ছিল ১৫ লক্ষ ঘনমিটার।
লিবিয়া প্রশাসন দেরনা শহরে ঢোকার মুখের বাঁধটির নামকরণ করে আবু মনসুর। ২ কোটি ২৫ লক্ষ ঘনমিটার পর্যন্ত ছিল এর জলধারণ ক্ষমতা। জোড়া বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ হলে স্বস্তি পায় ওই এলাকার মানুষ। প্রতি বছর বর্ষাকালে আর প্লাবনের মুখে পড়তে হত না তাদের। এর জেরে পরবর্তী দশকগুলিতে ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে দেরনার জনসংখ্যা।
২০২৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর কৃষ্ণসাগরের বুকে ঘনীভূত হয় ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় ‘ড্যানিয়েল’। প্রথমে গ্রিস এবং তার পর তুরস্কের উপকূলে তাণ্ডব করে ধীরে ধীরে তা গিয়ে পড়ে ভূমধ্যসাগরে। ১০ সেপ্টেম্বর লিবিয়ার উপকূলে আঘাত হানার সময় ঘূর্ণিঝড়ের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার। ফলে উত্তর আফ্রিকার দেশটির বেশ কিছু জায়গায় বড় আকারের ভূমিধস দেখতে পাওয়া গিয়েছিল।
ঘূর্ণিঝড় ‘ড্যানিয়েল’-এর প্রভাবে লিবিয়ার বিস্তীর্ণ উপকূল জুড়ে শুরু হয় প্রবল বৃষ্টি। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় ফুঁসে ওঠে নদী। আবহাওয়া দফতরের দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উত্তর আফ্রিকার দেশটির উপকূলে ৪০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছিল। ফলে তিন কোটি ঘনমিটার অতিরিক্ত জল গিয়ে জমা হয় নদীতে।
পরিবেশবিদদের দাবি, বৃষ্টির জমা জল এতটাই বেশি ছিল যে তা দিয়ে অলিম্পিক্সের ১২ হাজার সুইমিং পুল ভর্তি করে ফেলা সম্ভব হত। ফলে ফুঁসে ওঠা নদীর ধাক্কায় প্রথমেই ভেঙে যায় উচ্চ অববাহিকার আল-বিলাদ বাঁধ। এর পর আরও গতি বাড়িয়ে হুড়মুড়িয়ে বিপুল জলরাশি ছুটে যায় নীচের আবু মনসুর বাঁধের দিকে। সেই জলশক্তিকে ঠেকানোর ক্ষমতা ছিল না দেরনা শহরের মুখের শেষ ‘অতন্দ্র প্রহরী’র।
বিশ্লেষকদের দাবি, আবু মনসুর বাঁধের জলধারণ ক্ষমতা বেশি থাকার কারণে বিপর্যয় সামলানোর ক্ষমতা ছিল তার। কিন্তু, নদীর জল যে দুরন্ত গতিতে ছুটে আসবে, তা আঁচ করতে পারেনি স্থানীয় প্রশাসন। ফলে এক ধাক্কাতেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে গুঁড়িয়ে যায় আবু মনসুর। এর পর গোটা শহরকে ভাসিয়ে ভূমধ্যসাগরে নিয়ে ফেলে ওয়াদি দেরনা নদী।
২০২৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর রাত প্রায় ৩টে নাগাদ ঘটে এই বিপর্যয়। ওই সময় ঘুমিয়েছিল সম্পূর্ণ দেরনা শহর। ঠিক তখনই ১৫ ফুট উঁচু নদীর ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে সেখানে। পরের দিনে সকাল না হওয়া পর্যন্ত চলে তাণ্ডব। দিনের আলো ফুটলে দেখা যায় হাজারের বেশি বাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। জলের তোড়ে ভেঙে গিয়েছে অন্তত ১১টি সেতু-উড়ালপুল। নিখোঁজ কয়েক হাজার বাসিন্দা।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, ‘থ্রি গর্জেস’ ভাঙলে এর চেয়েও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে চিন। এতে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বেজিঙের অর্থনীতি ভেঙে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। ড্রাগনভূমির এই এলাকায় বৃষ্টি খুব বেশি হয়। ফলে ইয়াংৎজি নদীর জলস্তর বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকছেই। তা ছাড়া বাঁধ সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের অন্যত্র সরানোর কোনও ‘প্ল্যান বি’ এখনও নেই মান্দারিনভাষীদের হাতে।
সব ছবি: সংগৃহীত।