মার্ক জ়ুকেরবার্গের সংস্থা মেটার মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম হোয়াট্সঅ্যাপে আসছে ‘ইউজ়ারনেম’ ব্যবহারের সুবিধা। এখনই নিজের নাম সংরক্ষণ করার পরামর্শ দিলেন সংস্থার নয়া সিইও কুণাল শাহ।
হোয়াট্সঅ্যাপ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠার পর থেকে কারও সঙ্গে হোয়াট্সঅ্যাপে কথোপকথন শুরু করার অর্থই ছিল নিজের ফোন নম্বর তাঁর সঙ্গে শেয়ার করা এবং তাঁর নম্বর সেভ করে রাখা।
বছরের পর বছর ধরে এই পদ্ধতি চলে আসার ফলে নতুন কারও সঙ্গে চ্যাট করতে গেলেই ব্যক্তিগত তথ্য অর্থাৎ, ফোন নম্বর প্রকাশ করতে হত। তবে এখন সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে চলেছে বলেই জানিয়েছে হোয়াট্সঅ্যাপ।
গোপনীয়তার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আনা অন্যতম প্রধান একটি আপডেটের মাধ্যমে হোয়াট্সঅ্যাপের নতুন সিইও কুণাল ‘ইউজ়ারনেম’ বা ব্যবহারকারীর নাম ব্যবহারের সুবিধা চালু করেছেন।
মেটা-মালিকানাধীন এই মেসেজিং প্ল্যাটফর্মটি আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘ইউজ়ারনেম’ ফিচার ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা মোবাইল নম্বরের পরিবর্তে একটি অনন্য নাম ব্যবহার করে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন।
কোনও গ্রাহকের মনে যদি কোনও নির্দিষ্ট ‘ইউজ়ারনেম’ আগে থেকেই ঠিক করা থাকে, তবে হোয়াট্সঅ্যাপ বলছে এখনই সেটি সংরক্ষণ করে রাখার উপযুক্ত সময়। কারণ, পরে অন্য কোনও গ্রাহক তা আগে ব্যবহার করে নিলে ‘ইউজ়ারনেম’টি হাতছাড়া হতে পারে।
চলতি বছরের শেষের দিকে ফিচারটি পুরোপুরি চালু করার আগে ২৯ জুন থেকে বিশ্ব জুড়ে গ্রাহকদের ধাপে ধাপে ‘ইউজ়ারনেম’ সংরক্ষণের সুযোগ দিচ্ছে হোয়াট্সঅ্যাপ। বিভিন্ন এলাকায় এই সুবিধাটি চালু হলে ব্যবহারকারীরা অ্যাপের ভিতরেই একটি নোটিফিকেশন বা বিজ্ঞপ্তি পাবেন।
সমাজমাধ্যমে এক্স-এ দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক পোস্টে হোয়াট্সঅ্যাপের সিইও কুণাল জানিয়েছেন, সবার জন্য চালু করার আগেই তিনি নিজের ‘ইউজ়ারনেম’ সংরক্ষণ করে ফেলেছেন। কুণাল লিখেছেন, ‘‘সঠিক সময়টাই আসল। বিশ্ব জুড়ে ফিচারটি চালু করার আগেই আমি আমার ইউজ়ারনেমটি হোয়াট্সঅ্যাপে যুক্ত করেছি। এ বার আপনাদেরও পছন্দের নামটি বেছে নেওয়ার পালা।’’ পছন্দের নামটি হাতছাড়া হওয়ার আগেই তা সংরক্ষণ করে রাখার জন্য তিনি ব্যবহারকারীদের উৎসাহিত করেছেন।
কিন্তু হঠাৎ কেন হোয়াট্সঅ্যাপে ‘ইউজ়ারনেম’ ফিচার যুক্ত করার প্রয়োজন হল? সংস্থার মতে, এর প্রধান কারণ হল গোপনীয়তা। হোয়াট্সঅ্যাপের মতে, এমন অনেক পরিস্থিতি থাকে যেখানে মানুষ তাঁদের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর প্রকাশ না করেই অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে চান।
কোনও নেটওয়ার্কিং ইভেন্টে পরিচিত হওয়া ব্যক্তি, নতুন কোনও সহকর্মী, প্রতিবেশী কিংবা সন্তানের ফুটবল দলের কোনও অভিভাবক— যাঁদের সঙ্গেই পরিচিতি হোক না কেন, ফোন নম্বর শেয়ার করাটা অনেক সময় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার মতো মনে হতে পারে অনেক গ্রাহকের কাছে। আর সে কারণেই এই ব্যবস্থা।
‘ইউজ়ারনেম’ ব্যবহারের ফলে হোয়াট্সঅ্যাপ ব্যবহারকারীরা ফোন নম্বরের পরিবর্তে কেবল একটি অনন্য নাম (ইউনিক নেম) শেয়ার করতে পারবেন। সংস্থাটি জানিয়েছে, এটি অন্য কোনও সমাজমাধ্যম হ্যান্ডলের মতো নয়, বরং যোগাযোগের ক্ষেত্রে গোপনীয়তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি পদ্ধতি।
ইনস্টাগ্রাম বা এক্স-এর মতো এখানে কোনও ‘পাবলিক ডিরেক্টরি’ থাকবে না যেখানে মানুষ ‘ইউজ়ারনেম’ খুঁজে দেখতে পারবে। এমনকি হোয়াট্সঅ্যাপ নিজেও অন্যদের কাছে কোনও ‘ইউজ়ারনেম’ সুপারিশ করবে না। কেউ কোনও গ্রাহককে প্রথম বারের মতো মেসেজ করতে চাইলে তাঁকে অবশ্যই সঠিক ‘ইউজ়ারনেম’ জানতে হবে।
হোয়াট্সঅ্যাপ ‘ইউজ়ারনেম’ ফিচারের মধ্যে রয়েছে ‘ইউজ়ারনেম কি’। ‘ইউজ়ারনেম কি’ নামক ওই ব্যবস্থার মাধ্যমে সুরক্ষার আর একটি স্তর যুক্ত করছে হোয়াট্সঅ্যাপ। এটি একটি ঐচ্ছিক নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য, যার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা একটি অতিরিক্ত ‘কি’ বা ‘কোড’ তৈরি করতে পারেন।
নতুন কোনও ব্যক্তি যখন ‘ইউজ়ারনেম’ ব্যবহার করে মেসেজ পাঠাতে চাইবেন, তখন তাঁকে প্রথমে এই কোডটি দিতে হবে। সংস্থাটি জানিয়েছে যে, এই কোডটি যে কোনও সময় পরিবর্তন করা সম্ভব, ফলে কে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে— তার ওপর ব্যবহারকারীর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ থাকবে।
কিন্তু কী ভাবে হোয়াট্সঅ্যাপে ‘ইউজ়ারনেম’ সংরক্ষণ (রিজ়ার্ভ) করবেন গ্রাহকেরা? তার জন্য গ্রাহকদের বিশেষ কয়েকটি ধাপ মেনে চলতে হবে। এর জন্য প্রথমেই যা করতে হবে, তা হল হোয়াট্সঅ্যাপের সর্বশেষ সংস্করণে আপডেট।
এর পর ‘সেটিংস’ খুলে ‘অ্যাকাউন্ট’ অপশনে যেতে হবে। সেখানেই রয়েছে ‘ইউজ়ারনেম’ ব্যবহারের সুবিধা। এর পর একটি উপলব্ধ ‘ইউজ়ারনেম’ বেছে তা নিশ্চিত করলেই হবে। পাশাপাশি, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর (বিষয়স্রষ্টা), ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সংস্থা তাদের বিদ্যমান ইস্টাগ্রাম বা ফেসবুক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ‘ইউজ়ারনেম’ও দাবি করতে পারবে।
হোয়াট্সঅ্যাপ জানিয়েছে, ‘ইউজ়ারনেম’গুলি সর্বোচ্চ ৩৫ অক্ষরের হতে পারবে এবং নির্দিষ্ট কিছু নামকরণের নিয়ম মেনে চলতে হবে। ব্যবহারকারীরা যে কোনও সময় তাঁদের ‘ইউজ়ারনেম’ আপডেট করতে, মুছে ফেলতে বা পরিবর্তন করতে পারবেন।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে যে, ছদ্মবেশ ধারণ বা পরিচয় জালিয়াতি রোধ করতে বিখ্যাত ব্যক্তি এবং তারকাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘ইউজ়ারনেম’গুলিও সংরক্ষিত রাখা হবে। তবে এই নয়া ফিচারের কারণে আগে যাঁদের ফোন নম্বর সেভ করা রয়েছে তাঁদের সঙ্গে কথোপকথনে কোনও পরিবর্তন আসবে না বলেও মেটার মেসেজিং সংস্থাটি জানিয়েছে। কোনও গ্রাহকের পরিচিতেরা আগের মতোই মেসেজ পাঠাতে পারবেন। ব্লক করা, রিপোর্ট করা এবং এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশনের মতো ফিচারগুলিও আগের মতোই কাজ করবে।
হোয়াট্সঅ্যাপের তরফে জানানো হয়েছে, আগামী কয়েক মাস ধরে পর্যায়ক্রমে এই ফিচারটি চালু করা হবে, তাই সবাই হয়তো তাৎক্ষণিক ভাবে এটি দেখতে পাবেন না। কোনও অঞ্চলে ইউজ়ারনেম সংরক্ষণের সুবিধা চালু হলে ব্যবহারকারীরা অ্যাপের ভেতরেই একটি নোটিফিকেশন পাবেন এবং এই ফিচারের পূর্ণাঙ্গ সংস্করণটি চলতি বছরের শেষের দিকে চালু করা হবে।
সব ছবি: ফাইল থেকে।