কোথাও যুদ্ধ। কোথাও আবার ঘরোয়া কোন্দলে জ্বলছে দেশ। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অশান্তির জেরে জটিল হচ্ছে ভূ-রাজনীতি। এর জেরে স্বর্ণভান্ডারের মজুত বৃদ্ধির দিকে নজর দিয়েছে ভারত-সহ দুনিয়ার তাবড় উন্নত রাষ্ট্র। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে হু-হু করে বাড়ছে ‘হলুদ ধাতু’র দাম। এই পরিস্থিতিতেও বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই কানাডার। উল্টে সোনার প্রতি অটোয়ার একরকম ‘অরুচি’ ধরে গিয়েছে বলা যেতে পারে, যা দেখে বিস্মিত আর্থিক বিশ্লেষক মহল।
বর্তমানে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম স্বর্ণ উত্তোলনকারী দেশ হল কানাডা। প্রতি বছর প্রায় তিন হাজার কোটি ডলারের ‘হলুদ ধাতু’ বিশ্ববাজারে বিক্রি করে অটোয়া। উত্তর আমেরিকার দেশটির জি-৭ গোষ্ঠীর সদস্যপদ রয়েছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, সংশ্লিষ্ট সংগঠনের মধ্যে একমাত্র কানাডার হাতে নেই কোনও স্বর্ণভান্ডার। শুধু তা-ই নয়, আপাতত এর কোনও প্রয়োজন নেই বলে জানিয়ে দিয়েছে অটোয়ার অর্থ মন্ত্রক।
উত্তর আমেরিকার জি-৭ দেশ কানাডা কখনওই কোনও স্বর্ণভান্ডার রাখেনি, তা কিন্তু নয়। বরং আর্থিক দিক থেকে দেশটির উন্নত হওয়ার নেপথ্যে বরাবরই বড় হাত থেকেছে ‘হলুদ ধাতু’র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ১৪ শতকে সেখানে স্বর্ণখনির হদিস মেলে, যার জেরে ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের মধ্যে অটোয়া যাত্রার হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। ১৫ শতাব্দী আসতে আসতে ‘হলুদ ধাতু’ উত্তোলন এবং তা বিশ্ববাজারে বিক্রি করে বিপুল মুনাফা করতে থাকে আমেরিকার উত্তরের প্রতিবেশী।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-’৪৫) চলাকালীন ইউরোপীয় দেশগুলির মতোই একটা বড়সড় স্বর্ণভান্ডার গড়ে তুলেছিল কানাডার সরকার। কিন্তু লড়াই থামার পর দেখা যায় প্রায় ভেঙে পড়েছে ইউরোপের অর্থনীতি। এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলির পুনর্গঠন এবং আর্থিক উন্নয়নকে উৎসাহিত করতে ১৯৪৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্বাক্ষরিত হয় ব্রেটন-উডস চুক্তি, যাতে রাতারাতি অটোয়ার ভাগ্য খুলে যায় বললে অত্যুক্তি হবে না।
ব্রেটন-উডস চুক্তিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা হিসাবে স্বীকৃতি পায় আমেরিকার ডলার। পাশাপাশি, যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলির পুনর্গঠনে তৈরি করা হয় আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার বা আইএমএফ (ইন্টারন্যাশনাল মরিটারি ফান্ড)। ঠিক হয়, ডলারের দাম সোনার সঙ্গে জুড়ে থাকবে। অর্থাৎ, ‘হলুদ ধাতু’ দিয়ে যে কোনও রাষ্ট্র ডলার কিনতে পারবেন বা প্রয়োজনে উল্টোটাও করা যাবে। যুক্তরাষ্ট্র যাতে নিজেদের স্বার্থে টাকার দাম বাড়াতে বা কমাতে না পারে তার জন্য এটা করা হয়েছিল।
এই ব্যবস্থা চালু হওয়ার সময় প্রতি আউন্স সোনার দাম ছিল ৩৫ ডলার। ওই সময় আন্তর্জাতিক লেনদেনে ডলারের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বের প্রায় প্রতিটা দেশই মার্কিন মুদ্রার মজুত বাড়াতে শুরু করে। ফলে হঠাৎ করেই বেড়ে যায় সোনার বিনিময়ে ডলার কেনার প্রবণতা। তখনই স্বর্ণভান্ডারের মজুত কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে কানাডা। সরকারি কোষাগার থেকে ‘হলুদ ধাতু’ বার করে বিক্রি করতে থাকে অটোয়া।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে উত্তর আমেরিকার দেশটির কেন্দ্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘ব্যাঙ্ক অফ কানাডা’র কাছে ছিল হাজার টন সোনা। ২০০০ সালের মধ্যে যেটা কমে ৪৬ টনে নেমে আসে। পরবর্তী দেড় দশকে ‘হলুদ ধাতু’র ভান্ডার পুরোপুরি খালি করে ফেলে অটোয়া। ডলারের পাশাপাশি এই সময়সীমার মধ্যে মার্কিন বন্ডের পরিমাণ অবশ্য অনেকটাই বাড়িয়ে নেয় তারা।
২০০৮ সাল থেকে অবশ্য ঘুরতে থাকে পরিস্থিতি। বিশ্বব্যাপী মন্দা ও অন্যান্য আর্থিক সঙ্কটের জেরে ২০১১ সাল আসতে আসতে বেশ বেকায়দায় পড়ে যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো উন্নত অর্থনীতির দেশগুলি। ফলে নতুন করে ফের সোনা মজুতের দিকে নজর দেয় তারা। কানাডার মতো পৃথিবীর কোনও দেশই পুরোপুরি ডলারের উপর ভরসা করে কখনওই অর্থনীতি চালায়নি। ফলে সব সময়েই স্বর্ণভান্ডারে কিছুটা ‘হলুদ ধাতু’ ছিল তাদের।
দুনিয়ার এই আর্থিক সঙ্কটকে কিন্তু কানাডা একেবারেই গুরুত্ব দেয়নি। ফলে সরকারি নীতিতে কোনও কৌশলগত বদলের তাগিদ অনুভব করেনি অটোয়া, যার জেরে ২০১১ সালের পরও কোষাগার থেকে ‘হলুদ ধাতু’ বিক্রি চালু রাখে তারা। শুধু তা-ই নয়, ২০১৫ সাল আসতে আসতে মজুত থাকা স্বর্ণমুদ্রাও বিক্রি করে দেয় যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরের প্রতিবেশী।
কানাডার অর্থ মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের শেষে দেশটির হাতে ২.৭ টন সোনা মজুত ছিল। অর্থাৎ, মাত্র ৯৫ হাজার ৮৯৪ আউন্স। পরবর্তী সময়ে দু’খেপে সেখান থেকে যথাক্রমে ৪১ হাজার ১০৬ আউন্স এবং ৩২ হাজার ৮৬০ আউন্স ‘হলুদ ধাতু’ বিক্রি করে অটোয়া। ফলে ২০১৬ সাল আসতে আসতে স্বর্ণভান্ডারের পরিমাণ ২১ হাজার ৯২৯ আউন্স বা ০.৬২ টনে এসে পৌঁছোয়।
এ ভাবে স্বর্ণভান্ডার খালি করে ফেলার নেপথ্যে কানাডা সরকারের অবশ্য একটা যুক্তি রয়েছে। তাদের দাবি, ‘হলুদ ধাতু’ মজুত করার খরচ নেহাত কম নয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে হেতু সোনার খনি রয়েছে, তাই আলাদা করে ওই ধাতুটি জমিয়ে রাখার কোনও প্রয়োজন নেই। যদিও অটোয়ার এই সিদ্ধান্তকে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ বলেই মনে করেন আর্থিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ২০১৩ সাল থেকে স্বর্ণ উৎপাদনের পরিমাণ ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে কানাডা। ২০২৪ সালে সেটা বছরে প্রায় ২০০ টনে গিয়ে পৌঁছোয়। আন্তর্জাতিক বাজারে ১০টি শীর্ষ সোনা কোম্পানির মধ্যে চারটি অটোয়ার। দেশটির সবচেয়ে বড় স্বর্ণখনিটি হল কানাডিয়ান ম্যালার্টিক, যাতে আনুমানিক মজুত আছে এক কোটি আউন্স। এই খনিটি খোলা মুখ হওয়ায় উত্তোলনের যথেষ্ট সুবিধা রয়েছে।
কানাডার অন্টারিও, কুইবেক এবং নুনাভুট প্রদেশগুলি সোনা উত্তোলনের জন্য বিখ্যাত। এই তিন এলাকা থেকে বছরে যথাক্রমে ৮৮.৯ টন, ৫০.৮ টন এবং ২৫.৫ টন ‘হলুদ ধাতু’ মাটির গভীর থেকে তুলে থাকে অটোয়া। এর প্রায় পুরোটাই বিশ্ববাজারে বিক্রি করছে উত্তর আমেরিকার এই দেশ। কানাডার সোনার অন্যতম ক্রেতা হল ভারত।
কানাডার এই সিদ্ধান্তকে দু’টি কারণে বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করেছেন আর্থিক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের দাবি, সোনাকে সব সময়েই ভরসাযোগ্য লগ্নি হিসাবে মেনে এসেছে বিশ্ব। ২০১৬ সালের পর অন্তত চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে ‘হলুদ ধাতু’র দাম। এই পরিস্থিতিতে বিদেশি মুদ্রাভান্ডারের একটা একমুখিতা রেখেছে অটোয়া। ফলে ডলারের দামের পতন হলে বিপদে পড়তে হতে পারে তাদের।
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন মুদ্রার উপর দুনিয়ার ভরসা আগের চেয়ে কমেছে। সেই জায়গায় শক্তিশালী মুদ্রা হিসাবে বাজারে এসেছে ইউরো, জাপানি ইয়েন, ব্রিটিশ পাউন্ড এবং চিনের ইউয়ান। ফলে ভারত-সহ প্রায় সমস্ত দেশই এক দিকে যেমন বিদেশি মুদ্রাভান্ডারের বৈচিত্রে জোর দিয়েছে, অন্য দিকে তেমন বাড়াচ্ছে ‘হলুদ ধাতু’র মজুত। কানাডার পক্ষে রাতারাতি সে দিকে মোড় নেওয়া কঠিন।
আগামী দিনে ডলারকে এড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালাতে নতুন মুদ্রা আনতে পারে ‘ব্রিকস’-ভুক্ত ১১টি দেশ। সেই তালিকায় আছে ব্রাজ়িল, রাশিয়া, ভারত, গণপ্রজাতন্ত্রী চিন (পিপল্স রিপাবলিক অফ চায়না) এবং সাউথ আফ্রিকা। সে ক্ষেত্রে মার্কিন মুদ্রাটির দাম আরও পড়ে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বেশ অবনতি হয়েছে। ইতিমধ্যেই অটোয়ার পণ্যে ৩৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দিয়েছেন তিনি, যা আগামী দিনে আরও বাড়তে পারে। তা ছাড়া গ্রিনল্যান্ড কব্জা করার চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। এর বিরোধিতা করে সেখানে সৈন্য পাঠিয়েছে অটোয়া।
কানাডার এই পদক্ষেপে বিরক্ত ট্রাম্প অটোয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দিলে আর্থিক দিক থেকে আরও বিপদে পড়বে অটোয়া। কারণ, তখন ডলার বা মার্কিন বন্ড কোনও ভাবেই কাজে লাগবে না তাদের। ফলে কঠিন হবে আন্তর্জাতিক লেনদেন। ২০২৪ সালে নির্বাচনে জেতার পর কানাডাকে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিশে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ট্রাম্প। অটোয়া তা প্রত্যাখ্যান করে। আগামী দিনে ফের ওয়াশিংটন আগ্রাসী হলে কী ভাবে ‘হলুদ ধাতু’র খনি রক্ষা করবে অটোয়া? উঠছে প্রশ্ন।
সব ছবি: সংগৃহীত।