ধারাবাহিক উপন্যাস ।। পর্ব ১৮
Bengali Literature

দেখা হবে

নীলিমাকে দেখলেই তার কেন যেন মনে হয়, ও এই পৃথিবীর কেউ নয়। আনমনা সেই বিখ্যাত দিক্‌-বালিকা যেন পথ ভুলে এই নেতাজি কলোনিতে এসে পড়েছে। ওর চেহারায় বর্ষার মেদুরতা। ওর দীঘল শরীর, টিকলো নাক, কুন্দফুলের মতো দাঁতের সারি। আর চোখ!

বিপুল দাস
শেষ আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬ ০৭:১৯

ছবি: কুনাল বর্মণ।

পূর্বানুবৃত্তি: ভোলা আর উদয়ের প্রথমে নিরুদ্দেশ এবং তার পরে খুন হওয়ার খবরটা যখন বিভু সমাদ্দারের কাছে পৌঁছল, তখনই তার মনে পড়ে গেল বিভূতি লস্করের ঠান্ডা চাউনি আর তারক শীলের ঠান্ডা শাসানির কথা। সে বুঝতে পারল তার অনেকটা ক্ষতি হয়ে গেল, তবু সে আপসের রাস্তায় হাঁটল না। দীর্ঘ দিন পরে পলাশগুড়ির বকুলডাঙার বাড়িতে ফিরেছেন রামপ্রিয় সান্যাল। বয়সে অনেকটা ছোট হলেও প্রিয়তোষের সঙ্গে তাঁর গভীর সখ্য তৈরি হয়েছিল। কারণ তাঁর মতো প্রিয়তোষও গানবাজনায় যথেষ্ট আগ্রহী। অসুখী দাম্পত্যের কারণে স্ত্রী চন্দ্রার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল রামপ্রিয় সান্যালের। কিন্তু ঘনিষ্ঠতা বেড়েছিল প্রিয়তোষের সঙ্গে। সে গানের টিউশনি করত। নীলিমা নামের এক ছাত্রী ছিল তার। গানবাজনার যতটুকু জানে, সবটুকু নীলিমাকেই শিখিয়ে যাওয়ার কথা ভাবত প্রিয়তোষ।

বাবা বলেছিলেন প্রিয়তোষকে, সঙ্গীতের সিদ্ধি আসে অনেক পুরুষের সাধনা বেয়ে। গানবাজনা এক জেনারেশনে হয় না। যার রক্তের ভিতরে এক বার সেই অসম্ভব শ্রুতিকে ছোঁয়ার তীব্র নেশা ধরে গেছে, তার আর রেহাই নেই। দিনের শেষে কারও বা শূন্য ঝুলি, কারও হাতে সাতরঙের বাহার নিয়ে ধরা দেয় অলীক পাখি। সুরের সাধনা যেন জীবন বাজি রেখে পাশা খেলা। সমস্ত সুখ, ঐশ্বর্য, ভোগবাসনা এক পাশে সরিয়ে রেখে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো শুষে নেয় ষড়জ থেকে নিষাদ। তবু কেউ বলতে পারে না, ‘হ্যাঁ, আমি পেয়েছি। আমি স্বর্গের চাবি পেয়েছি।’ নীলিমার জন্য তার কান্নার কথা রামুদাকে বলে কী লাভ। থাক, দেখা হবে গোসাঁই, এক দিন গানের পারে তোমার সঙ্গে দেখা হবে। আমার এই ভাঙা হারমোনিয়ামে তোমাকে শোনাব— যমুনা কে তীর রাধে বজি শ্যাম কে মুরলিয়া... আমাদের এই মাটির পৃথিবী কোনও দিন স্বর্গ হয়ে উঠবে না। আসল স্বর্গ বলে যাকে সবাই চেনে, সে তা হলে মিথ্যে হয়ে যাবে। মলিন হয়ে যাবে মন্দির-মসজিদ-গির্জা-গুরুদ্বার। তবু কিছু মানুষ ছবি এঁকে, গান গেয়ে, স্টেশনে বাচ্চাদের ‘বর্ণ পরিচয়’ শিখিয়ে, গল্প লিখে চেষ্টা করে যাতে একটুখানি স্বর্গের মতো হোক মাটির এই পৃথিবী, নোংরা ধুলোর প্রচ্ছদ সরে গেলে হঠাৎ সোনালি রোদ্দুরের মতো সুন্দর উঁকি দেয়, পলকে পৃথিবীর সমস্ত গাছ হয়ে যায় পারিজাত।

নীলিমাকে দেখলেই তার কেন যেন মনে হয়, ও এই পৃথিবীর কেউ নয়। আনমনা সেই বিখ্যাত দিক্‌-বালিকা যেন পথ ভুলে এই নেতাজি কলোনিতে এসে পড়েছে। ওর চেহারায় বর্ষার মেদুরতা। ওর দীঘল শরীর, টিকলো নাক, কুন্দফুলের মতো দাঁতের সারি। আর চোখ! পৃথিবীর সমস্ত মেঘ— তা সে রামগিরির হোক বা ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকার উপর জমে থাকা কিংবা বিকেলের বকুলডাঙার উপর হঠাৎ ঘনিয়ে আসা— সব যেন হাজার বছরের অভিমান নিয়ে মেয়েটার দু’চোখে ঘনায়। থার্মোমিটারের ও-পারে পারদের মতো ছোঁয়া যায় না নীলিমাকে। ‘আমার দুখজাগানিয়া, তোকে একদিন গান শোনাব’— আপনমনে বলে প্রিয়তোষ লাহিড়ি।

দু’জন মানুষ ফের ঘাস ছেড়ে মাটির পৃথিবীতে ফিরে আসে। ফিরে আসে পলাশগুড়ির দিকে। তাদের আশপাশে অজস্র জোনাকি জ্বলে-নেভে। ব্যাকরণের বন্ধনহীন এই জ্বলা-নেভা।

১২

আলমারির তাকে বইগুলো ছিল। ‘নক্ষত্র পরিচয়’, ‘দি ইউনিভার্স’, ‘ফান্ডামেন্টাল অ্যাস্ট্রোনমি’, ‘স্টেলার স্ট্রাকচার’। কিছু রেকর্ড ছিল নীচের তাকে। পুরনো দিনের গানের রেকর্ড। গওহরজান, সব গানের শেষে সেই ‘মাই নেম ইজ় গহরজান’। আর ছিল আঙুরবালা। নবজলধর পীতাম্বর শ্যাম বিপিনচারী। আহা, কী স্পষ্ট দানার কাজ।

এ বার অনেক দিন বাদে বাগান থেকে পলাশগুড়ি এলেন। চাকরিজীবন প্রায় শেষ হয়ে এল। আসল অবসর হয়ে গেলেও মালিকপক্ষের অনুরোধে আরও অনেক দিন চাকরি করলেন। নিউ গ্রাহাম চা-বাগান যেন তাঁর রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে। রাত্রির পরিষ্কার আকাশ, আকাশগঙ্গা। ওখানেই কোথাও আছে আমাদের সূর্য। দূরের ওই ভুটান পাহাড়, খরস্রোতা পাহাড়ি নদী, ঘন সবুজ অরণ্য, আর মনমায়ার নরম বুকের নিশ্চিন্ত আশ্রয়— এক গভীর প্রশান্তি। জীবনে যা চেয়েছিলেন, সব না পেলেও এও বা কম কী। সব চাওয়া কী আর মানুষের এক জীবনে পাওয়া হয়? সন্ধেবেলায় প্রিয় হুইস্কি, প্রিয় নারীর সঙ্গ, প্রিয় গান। কোনও দিন দলছুট এক দামাল হাতি আসে ভুটান পাহাড়ের কালো মেঘের মতো। মদস্রাবী গ্রন্থির ক্ষরণে সঙ্গিনীর জন্য মাতাল হয়ে ফেরে। সে রাতগুলো যেন উদ্দাম এক আদিম অরণ্য হয়ে ওঠে তার ঘর। ক্ষারগন্ধে ভরে যায় ডাক্তারবাবুর বাংলো। দিঘির ফুটে ওঠা কমলের মতো মনমায়ার শরীর তাকে প্ররোচিত করে তুমুল মাতাল হয়ে উঠতে। মত্ত রামপ্রিয় সান্যাল যুবক হয়ে ওঠেন। কমলের শেষ দলটিও ছিন্নভিন্ন করার সময় চূড়ান্ত আক্ষেপে একটা গর্জন শোনা যায়।

ইদানীং তার আবার জ্যোতির্বিজ্ঞানের বইগুলো পড়তে ইচ্ছে করছে। বইগুলো ও-বাড়িতে রয়ে গেছে। এ বার গিয়ে বইগুলো নিয়ে আসবেন। অন্য কাজও রয়েছে। এ বার বিষয়সম্পত্তি নিয়ে আইনত কিছু লেখাপড়া করে রাখা দরকার। প্রিয়তোষ দীর্ঘ দিন এই ফ্যামিলিতে নিজের লোকের মতো সার্ভিস দিয়েছে। শিলিগুড়ির জমিটা তাকে দিতে পেরে মনে একটা শান্তি পেয়েছিলেন। মন্টু কোনও একটা স্কুলে চাকরি পেয়েছে। তার জন্য কিছু করার ভাবনা রয়েছে। শিবু আর তার বৌ নন্দা রয়েছে। চন্দ্রা আর ওদের দু’জনের জন্য যা থাকবে— যথেষ্ট। এক বার ভেবেছিলেন পলাশগুড়িতে শিবুর জন্য একটা ওষুধের দোকান করে দেবেন। পরে ভেবে দেখলেন, শিবুর দ্বারা ব্যবসা হবে না। সে সপ্তাহে চার দিন দোকান বন্ধ রেখে মাছ ধরতে যাবে। ওদের বোধহয় আর ইস্যু-টিসু হবে না। এ নিয়ে শিবু বা নন্দার সঙ্গে কথা বলাও তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। মা চলে যাওয়ার পর বাড়ির রাধামাধবের মন্দিরে নিত্যসেবাটুকু কোনও মতে বজায় রয়েছে। আর সব রবরবা আর আগের মতো নেই। আগে লোকজনে বাড়ি গমগম করত। এখন কেমন যেন নির্জন হয়ে এসেছে। চন্দ্রা তার ঘরে গোপাল নিয়ে থাকেন, রাধামাধবের মন্দিরে তাঁর কোনও আগ্রহ নেই।

এ বার অনেক দিন বাদে পলাশগুড়ি এসে বেশ অবাক হয়ে গেলেন রামপ্রিয়। কোথায় গেল সেই ছোট্ট মফস্‌সল শহর! কোথায় গেল পথের পাশে সেই বিশাল শিরীষ গাছগুলো! পিডব্লিউডি অফিসের সামনের সেই হেলে পড়া শিরীষ গাছটাও কেটে ফেলা হয়েছে। রাস্তা কত চওড়া হয়েছে। পথের দু’পাশ জুড়ে হোটেল আর নার্সিং হোমের বিজ্ঞাপন। কত বড় বড় বাড়ি। পথে অজস্র গাড়ি, রিকশা, অটো, টোটো। বকুলডাঙায় যাওয়ার পথ যেন কোনটা— গুলিয়ে যাচ্ছিল তাঁর। চিনতে পারলেন মোড়ে সাজ্জাদের ছাতা সারাইয়ের দোকান দেখে। অবিকল একই রকম আছে। দোকানের ভিতরে সাদা দাড়িওয়ালা যে বুড়োটা চাদর গায়ে বসে আছে, সে নিশ্চয়ই সাজ্জাদ। আর যে ছেলেটি ছাতা খুলে সারাই করছে, সে ওর ছেলে নিশ্চয়ই। কুড়ি-পঁচিশ বছর পরে দৃশ্য হয়তো একই থাকবে, চরিত্রগুলো জায়গা পাল্টে নেবে। সেই বিখ্যাত লাইন মনে পড়ল রামপ্রিয়র— সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে, তার পরিবর্তন হয়নি।

সাজ্জাদের দোকানের সামনে টোটো স্ট্যান্ড। এরা কেউ তাঁকে চিনবে না। একটা টোটোয় উঠে তিনি ভিতরে যেতে বললেন। বকুলডাঙা যাওয়ার পথের চেহারাও বদলে গেছে। পথের দু’পাশে বড় বড় বাড়ি। অনেক অ্যাপার্টমেন্ট। পথের উপরেই প্রায় শনিমন্দির। ঝাঁ-চকচকে দোকানপাট। পথে যেতে অনেকগুলো সাজানো তোরণ দেখলেন। কোনও মন্ত্রী এসেছিল হয়তো। পলিটিক্যাল পার্টির পোস্টার, বড় বড় হোর্ডিং আর পতাকায় পথ ভর্তি। সুন্দর সব বাড়ি। কিছু দিন পরে এলেন, তার মধ্যেই এত পরিবর্তন ঘটে গেল! এ-সব বাড়ির পাশে তাঁদের ‘সান্যাল-কুটির’ বোধহয় সবচেয়ে পুরনো আর সবচেয়ে হতশ্রী। এ বার যতটা পারা যায় সারিয়ে-সুরিয়ে রেখে যাবেন। শিবুর ক্ষমতা নেই এ বাড়ি মেনটেন করার। যা করার, তাঁকেই করে যেতে হবে।

টোটো থেকে নেমে টাকা দিয়ে এক বার বাড়িটার দিকে তাকালেন। সত্যিই হতশ্রী অবস্থা। পাশেই একটা নতুন তিনতলা বাড়ি উঠেছে। নতুন রং, সুন্দর ব্যালকনি সাজানো রয়েছে ফুলের টব দিয়ে। ফুল ফুটে রয়েছে। এটা তো মানিক ঘোষের বাড়ি ছিল। তাঁদের পাড়ায় রেশন দোকান ছিল মানিক ঘোষের। ভোটে দাঁড়িয়েছিল এক বার। ‘সান্যাল কুটির’ লেখা ফলকটা এখন আর পড়া যায় না। মন্দিরের দেওয়ালে বটপাকুড়ের চারা গজিয়েছে। শেকড় ছড়িয়ে পড়েছে দেওয়াল জুড়ে। আশ্চর্য গাছ এই বটপাকুড়। কঠিন পাথর ফাটিয়ে ঠিক রস খুঁজে নেয়।

গেট খুলে ভিতরে ঢুকলেন। আরও জীর্ণ হয়েছে ঘরবাড়ি। তাঁর নিজের বাড়ি, অথচ ঢুকতে কেমন যেন সঙ্কোচ হচ্ছে তাঁর। যেন অন্য কারও বাড়িতে ঢুকছেন। এখন কাকে ডাকবেন! ইতস্তত করে বারান্দায় উঠলেন। উঠোনের বাঁ দিক থেকে নন্দা বেরিয়ে এল।

“আপনি? কখন এলেন? আসুন, ও তো আজ অফিসে গেছে।”

“ব্যস্ত হোয়ো না। ব্যাগটা আমার ঘরে রেখে এসো। সবাই ভাল আছ তোমরা?”

“হ্যাঁ, ঠিকই আছি। আপনার শরীর ঠিকআছে তো?”

“আছি। বয়স তো হল।”

নন্দার দিকে এক বার ভাল করে তাকিয়ে দেখলেন। মেয়েটাকে তাঁর বড় ভাল লাগে। মুখে একটা স্নিগ্ধ লাবণ্য জড়িয়ে থাকে। কিন্তু এ বার তার মুখে একটা গোপন বিষাদ টের পেলেন তিনি। হতে পারে, সন্তানহীনতার জন্য একটা কষ্ট তো থাকে। আর শিবু তো সংসারে থেকেও উদাসীন। নাম কা ওয়াস্তে চাকরি, আর মাছ ধরে বেড়ানো। কে জানে বৌয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেমন!

“চাকরি আর কত দিন করবেন আপনি, এ বার এখানে চলে আসুন। ওদিককার পাট চুকিয়ে দিন। শুনেছেন, মন্টুর বড় অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল! এখন ভাল আছে। একা থাকে, আমি গিয়ে দেখে এসেছি।”

“সে কী! কেমন করে হল?”

“চুমুকপুরের ওদিকে কোথায় জমি দেখতে গিয়েছিল। পলাশগুড়ি থেকে শিলিগুড়ির দিকে নতুন বাইপাস চালু হয়েছে। সেই রাস্তা দিয়ে আসার সময় ওর বাইকের সঙ্গে অন্য গাড়ির ধাক্কা লেগেছিল। কপালের জোরে বেঁচে গেছে।”

“দেখি, সময় পেলে এক বার দেখা করে যাব। ওর ফোন নম্বর আছে না তোমার কাছে? আমার কথা বলে এক বার ফোন কোরো তো। বোলো ডাক্তারজেঠু খোঁজ করছিল। ভাল কথা, আমার পুরনো ঘরের চাবিটা নিয়ে এসো তো। কয়েকটা রেকর্ড আর কিছু বই নিয়ে যাব এ বার।”

বুক কেঁপে উঠল নন্দার। দামি দামি সব বই পুড়িয়ে দিয়েছে তার শাশুড়ি। রেকর্ডগুলো ডিসকাস থ্রো-এর মতো শূন্যে ছুড়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। পাগলামি ক্রমশ বেড়েই চলেছে তাঁর। এ নিয়ে মন্টুর সঙ্গে কথা বলবে ভেবেছিল। সে তো এখন আর হবে না। দেখা যাক, শ্বশুরমশাই যদি কিছু প্রেসক্রিপশন করে দেন। এই দু’জন মানুষের কথা ভাবলে তার খুব কষ্ট হয়। একদম বিপরীত মেরুর মানুষ দু’জন। তাঁর শ্বশুরমশাই আধুনিক ভাবনাচিন্তার মানুষ, উদার, একটু ইন্ট্রোভার্ট, আবার তাঁকে খুব রোম্যান্টিকও মনে হয় নন্দার। এখনও কী সুন্দর হ্যান্ডসাম রয়েছেন। এই মানুষের সঙ্গে কী করে ওই মহিলার মনের মিল হবে!

ক্রমশ

আরও পড়ুন