ছবি: সৌমেন দাস।
তুলি রাস্তায় নেমে পড়েছিল। সিগন্যাল লাল হয়ে গেছে না দেখেই। বিকট হর্ন দিয়ে একটা বাইক ফুলস্পিডে ধেয়ে এল, তুলি লাফিয়ে ফিরে গেল ফুটপাতে।
ক্ল্যাসিক তুলি। যাচ্ছে, কিন্তু দেখছে না কোনও দিকে। হাঁটছে, যেন হাঁটার প্রক্রিয়ায় ওর কোনও হাত নেই। সিগন্যালে চোখ রেখে সামান্য পিক-আপ নিলেই ক্রসিং পেরিয়ে যেতে পারত। তুলির পিছনের লোকটা যা করল। তুলিকে ওভারটেক করে বাঁক নেওয়া ট্র্যাফিক, হর্ন অগ্রাহ্য করে এ-পারে পৌঁছে এখন শিস দিতে দিতে চলে যাচ্ছে।
সিগন্যালে পা-ফাঁক লাল মানুষ গুনছে একশো আঠারো, একশো সতেরো, একশো ষোলো। তুলি দাঁড়িয়ে আছে। তুলির হেলদোল নেই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ইয়ারফোনের জট ছাড়াচ্ছে।
আমিও দাঁড়িয়ে আছি অবশ্য। চাইলে পেরিয়ে যেতে পারতাম। আমার বাঁ কনুইয়ে গলানো ডান কনুই দিয়ে ফুলি টানও মেরেছিল। ছুটতে যাব, ক্রসিংয়ের ও-পারে তুলি আবির্ভূত হল। রিভার্স টান মারলাম। ফুলি থেমে গেল। বোঝেনি, হোপফুলি। নিশ্চয়ই বোঝেনি। কারণ ফুলি উত্তেজিত।
“কী লেভেলের অন্ধ হলে ‘উইমেন’স এজেন্সি ইন পোস্টকলোনিয়াল ইনস্টিটিউশনস’ প্যানেলে সব ক’টা স্পিকার পুরুষ রাখে? কী না, অ্যাকাডেমিক এক্সেলেন্স। ভাস্ট বডি অব ওয়ার্ক। বাট হোয়াট অ্যাবাউট রিপ্রেজ়েন্টেশন?”
“রত্নাবলী কী বলছে?” চোখের কোণ তুলিতে রেখেই জানতে চাই।
“কিস্যু না। ওর তো সব নৌকোয় পা দিয়ে চলতে হবে। তার মধ্যে ওই দীপক শ্রীবাস্তব বলছে, ‘ফুল্লরা ইজ় কারেক্ট। প্যানেলে সবাই পুরুষ এবং উচ্চবর্ণ। উই শুড পে মোর অ্যাটেনশন টু ইন্টারসেকশনালিটি।’ যেন ইন্টারসেকশনালিটির জন্য ব্যাটা মরে যাচ্ছে! অক্সফোর্ড থেকে ইন্টারসেকশনালিটিতে ডি-ফিল করে এসেছে বলে সবেতে ওই ফোড়ন দিয়ে যাচ্ছে।”
দীপক শ্রীবাস্তব। যন্তর মাল। আমাকে দেখলে এমন একটা হাসি দেয়, যেন বাকিরা যেটা এখনও টের পায়নি, ও ধরে ফেলেছে।
ফুলির কনুই থেকে নিজের কনুই ছাড়াই। সিগারেট বার করি। লাইটার আড়াল করা হাতের উপর দিয়ে তুলিকে দেখি। তুলি এখনও জট ছাড়িয়ে চলেছে। কত বার বলেছি, “তুলি, আর একটু গোছালো হও।”
আটানব্বই, সাতানব্বই, ছিয়ানব্বই।
জানতে চাই, “অক্সফোর্ডের আগের ব্যাকগ্রাউন্ড কী মালটার?”
ফুলি বলে, “বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি। হিস্ট্রি। গোল্ড মেডেল-ফেডেল নাকি।”
পরামর্শ দিই, “চোখ-কান খোলা রাখিস। ওরা আজকাল সর্বত্র ইনফিলট্রেট করছে। অ্যালাই হয়ে ঢুকে ফ্যাসিস্ত হয়ে বেরোবে।”
আমি তুলির অ্যালাই হতে চেয়েছিলাম। তুলিকে ঠিক জায়গায় ফেলে দিতে পারতাম। দেশ-বিদেশের কনফারেন্স, প্যানেল, বুক রিলিজ়। তুলি বলে গেল, “দূর দূর! আমার দ্বারা ও-সব হবে না।”
কী-সব হবে না, কে জানে। এই যে ফুলি, আগাপাশতলা মিডিয়োকার। ঠিক সময় ঠিক জায়গায় পড়েছে বলে বুলি থামছেই না।
তুলি লক্ষ্যহীন শূন্যতায় চোখ ভাসিয়ে রেখেছিল, “কিছু একটা হয়ে যাবে।”
‘কিছু একটা হয়ে যাবে’— এই বুলি কোথা থেকে শিখেছে তুলি, আমি জানি। মগজ-প্রক্ষালনের গর্ভগৃহ স্বচক্ষে দেখে এসেছি। তুলির বাবা, একটা থার্ড গ্রেড কলেজে ইংরেজি পড়ায়, অ্যাম্বিশনের ‘অ্যা’-ও নেই শরীরে। তুলির মা, হাউসওয়াইফ। হার্মলেস এবং হিসাবের বাইরে। ও-বাড়িতে পেট্রিয়ার্কি বোঝানো মানে গাধাকে দরবারি কানাড়া গাওয়ানো। চল্লিশ ওয়াটের টিউব জ্বালিয়ে চৌকিতে বসে বুক চুলকোচ্ছিল আর বোকার মতো হাসছিল তুলির বাবা।
“আমি আর কী বলব! তুলির ভবিষ্যৎ তুলিই ঠিক করবে। তুলির যা পছন্দ।”
আহ, পছন্দ! সেই ম্যাজিক ওয়ার্ড। বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম, “পছন্দ গাছ থেকে পড়ে না তুলি। তুমি ভাবছ তোমার পছন্দ, আসলে নয়। তুমি ভাবছ তুমি স্বাধীন, আসলে নও। পিতৃতন্ত্রের অপ্রেসিভ ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে তুমি অপারেট করছ। তা ছাড়া চয়েসেরও মুড়ি-মিছরি ভুল-ঠিক আছে। আমি তোমাকে গাইড করব।”
বোঝাতে বোঝাতে গলা চড়েছিল, আশপাশের টেবিল থেকে লোকজন তাকাচ্ছিল। তুলি নির্বিকার। ওই রকম চড়াই পাখির মতো চেহারা, কিন্তু জমি কামড়ে থাকতে জানে। ঠ্যাঁটা টু দ্য পাওয়ার ইনফিনিটি।
সম্পর্কটা এমনিও থাকত না। মানসিকতার এত অমিল থাকলে হয় না। ফুলি ওই সময়েই জয়েন করল। সেও আর এক কাহিনি। টক্সিক বয়ফ্রেন্ড। বিদেশ থেকে পিএইচ ডি-ফিএইচ ডি করা মেয়েরা এই সব সম্পর্কে ঢোকে এবং থাকে কী করে ভগবান জানে! ঘণ্টার পর ঘণ্টা বুঝিয়ে অবশেষে ব্রেকআপ হল। এত ভেঙে পড়েছিল ফুলি, চিয়ার আপ করতে উইকএন্ডে শান্তিনিকেতন প্ল্যান করেছিলাম। চেক ইন-এর সময়, রিসেপশনিস্ট আমার দিকে, ফুলির দিকে, আবার আমার দিকে তাকাচ্ছিল। যত ক্ষণে মনে পড়ল, যা হওয়ার হয়ে গেছে।
ছেলেটি তুলির বাবার এক্স-ছাত্র।
শান্তিনিকেতন থেকে ফিরে আমিই সম্পর্ক শেষ করার কথা বলেছিলাম। নাকি তুলি বলেছিল? হোয়াটএভার। এক বছর হতে চলল তো।
দশ মাস সতেরো দিন, টু বি প্রিসাইজ়।
*****
ফুলির ফোন বাজছে। আর সতেরো সেকেন্ডের মধ্যে সিগন্যাল ছাড়বে, তবু ফুলি ফোনটা ধরবে। হাজার বার বারণ করেছি, তাও। মেয়েরা জাস্ট ডোন্ট লিস্ন। তুলি একটাও কথা শুনল না আমার। ফুলি তুলির চেয়ে বেটার, কিন্তু শেষমেশ ডবল-এক্স ক্রোমোজ়োম তো।
ফুলি উত্তেজিত গলায় কথা বলছে। একটা লোক হেলমেট-পরা মুন্ডু ঘোরাচ্ছে। ফুলির কাঁধে চাপ দিলাম। ফুলি গলা নামিয়ে বলল, “রত্নাবলীদিরা ওদের মতো করুক...” আমার দিকে এক ঝলক তাকাল ফুলি, “আমরা একটা রিডিং গ্রুপ অর্গানাইজ় করি চলো। সারা আহমেদের ফিমেল কিলজয়ের ন্যারেটিভটা...”
ফুলির কাঁধে হাত রাখলাম, “সারা আহমেদ নয়, বেল হুকস। স্ট্রাকচারাল অ্যাবসেন্স।”
ফুলি শুধরে নিল। কিন্তু বলল না যে, সাজেশনটা আমার। চাপ নেই, রত্নাবলীর সঙ্গে কালই দেখা হবে।
তিন দুই এক। লাল মানুষ ফের সবুজ, আকাশে-বাতাসে হর্নের নিউক্লিয়ার বোমা বিস্ফোরণ। আমরা রাস্তায় নামলাম। ওদিক থেকে তুলিও নেমেছে। আমার দিকে এগোচ্ছে। আমাকে সত্যি সত্যি দেখেনি? নাকি ফুলি আছে বলে দেখতে চাইছে না?
কে জানে। তুলির পছন্দ আমার বোধের অগম্য। তুলির কানে গান। তুলির চোখ লক্ষ্যহীনতায় স্থির। তুলির পদক্ষেপ গন্তব্যহীনতায় অচঞ্চল। তুলি এখন পাঁচ হাতের মধ্যে। দম বন্ধ করে একটা অদৃশ্য বুদবুদ বানাই। এই শহরের সব কিছুকে, সবাইকে বার করে দিয়ে শুধু আমি আর তুলি, তুলি আর আমি।
মনে মনে বলে ফেলি, ‘তুলি, এক বার চোখ তোলো, এক বার সব ভুলে যাও, এক বার আমাকে তোমার পছন্দ করো...”
বুদবুদ ছিঁড়ে তুলি চলে যায়।