Spring Season

প্রহর শেষের অন্য আলো

এমন চৈত্র বার বার আসুক, যার রঙিন সুগন্ধি ফুল মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখবে প্রাণপণ। মুছে দেবে সব বিষাক্ত হাওয়া। তার রাঙা আলোয় সমস্ত মনখারাপ ছাপিয়ে ডেকে উঠবে আশ্চর্য কোকিল। কারণ চৈত্র মাস আসলে চিরকালীন ভালবাসার কথাই বলে।

স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
শেষ আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৫৫
ছবি: অমিতাভ চন্দ্র।

ছবি: অমিতাভ চন্দ্র।

এমন চৈত্র বার বার আসুক, যার রঙিন সুগন্ধি ফুল মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখবে প্রাণপণ। মুছে দেবে সব বিষাক্ত হাওয়া। তার রাঙা আলোয় সমস্ত মনখারাপ ছাপিয়ে ডেকে উঠবে আশ্চর্য কোকিল। কারণ চৈত্র মাস আসলে চিরকালীন ভালবাসার কথাই বলে। স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

ছোটবেলায়, শীতের শেষে, সকালের কুয়াশা কমে এলেই বুঝতাম ফাল্গুন শেষ, চৈত্র চলে এসেছে! আর দূরের গাছপালার মধ্য দিয়ে উঁকি দিচ্ছে বৈশাখ! ফাল্গুন আর চৈত্র বসন্তকাল। কিন্তু ফাল্গুনের বসন্ত আর চৈত্রের বসন্তের মধ্যে, পার্থক্য আছে বেশ। এ যেন অনেকটা চায়ের ফ্লেভার আর লিকারের পার্থক্যের মতো! ফাল্গুনের বসন্তে ফ্লেভার বেশি, আর চৈত্রের বসন্তে বেশি লিকার!

আমি নিজে চা খাইনি কোনও দিন। কিন্তু ছোট থেকে চা-প্রেমীদের মাঝে বড় হয়ে ওঠায়, তাদের কথা শুনে শুনে, আমার এমন একটা ধারণা কী করে যেন তৈরি হয়ে গিয়েছে। মফস্সলের সেই ছোট্ট পাড়ায় আমাদের বাড়ির লোকেদের নিয়ে একটা মজা করা হত। বলা হত, কাক যেমন সকালে উঠে ‘কা-কা’ করে, তেমন আমাদের বাড়ির লোকজন নাকি সকাল হতে না হতেই ‘চা-চা’ করে! তবে আমি যে-হেতু চিরকালই প্রহ্লাদকুলে দৈত্য, তাই বাড়ির ধারার উল্টো হয়েছি। কোনও দিন চা খাইনি। কিন্তু শুনে শুনে ওই ধারণা হয়ে গিয়েছে।

আমার ঠাকুরদার একটা দোকান ছিল। প্রাথমিক ভাবে সেটা টেলারিং শপ হলেও পরে সেখানে ‘লুজ়’ চায়ের পাতা, লজেন্স, বিস্কুট, চানাচুর ইত্যাদি সবই বিক্রি হত। আর তাই এই চৈত্র এলেই শুনতাম ‘স্প্রিং ফ্লাশ’-এর চা এসেছে! দেখতাম, আমার কুট্টিদাদু ধাতুর কুলোর মতো একটা পাত্রে চায়ের পাতা নিয়ে মেশাচ্ছে, আর তার বাদামি রেণু থেকে হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে এক আশ্চর্য গন্ধ! আমাকে আবিরের গন্ধ যেমন ফাল্গুন চেনাত, তেমন ওই চায়ের গন্ধ বোঝাত, চৈত্র এসে গিয়েছে!

ছোটবেলায় অনেকের মতো আমিও বাড়িতে আঁকার স্যরের কাছে ছবি আঁকা শিখতাম। স্যর সিনারি আঁকার সময় জিজ্ঞেস করতেন, কোন ঋতুর ছবি আঁকছি। কারণ সেই মতো র‌ং বেছে দিতেন। হাতে ধরে শেখানোর চেষ্টা করতেন।

অনেক কিছুর মতো আঁকতেও শিখিনি আমি। কিন্তু স্যরের বলে দেওয়ার পর আমি খেয়াল করতে শিখেছিলাম যে, ফাল্গুন থেকে চৈত্র আসতে আসতে কী ভাবে রোদের রং, গাছের পাতার রং বদলাতে শুরু করে। সব রংই যেন গাঢ় হতে শুরু করে। হাওয়ায় কেমন একটা বদল আসে। রোদ্দুর যা বলে, হাওয়া যেন তা বলে না! বড় হওয়ার পরে ‘গ্রেট এক্সপেক্টেশনস’ পড়তে গিয়ে দেখেছিলাম চার্লস ডিকেন্স লিখে গিয়েছেন, “ইট ওয়াজ় ওয়ান অব দোজ় মার্চ ডেজ় হোয়েন দ্য সান শাইনস হট অ্যান্ড দ্য উইন্ড ব্লোজ় কোল্ড: হোয়েন ইট ইজ় সামার ইন দ্য লাইট, অ্যান্ড উইন্টার ইন দ্য শেড।”

ছোটবেলায় এই সময় আমাদের মর্নিং স্কুল চলত। সকাল সাড়ে ছ’টায় নিউল্যান্ড বাস স্টপে আসত নীল স্কুলবাস। ঝকঝকে বড় রাস্তার দু’দিকেই বড়-বড় মাঠ। তাতে ছোট-ছোট সাদা-লাল কোয়ার্টার। সোজা রাস্তার গা-ঘেঁষে সার দেওয়া কৃষ্ণচূড়া গাছ। এ সময় সেই গাছগুলোয় ঝেঁপে আসত ফুল। সকালের নরম ঘাসে ছড়িয়ে থাকত কুঁড়ি। আমরা সেই কুঁড়ি কুড়িয়ে নিতাম। তার ভিতরের পুংকেশরগুলো বার করে আমরা কাটাকুটি খেলতাম। চৈত্রের সেই সময়টায় এই খেলাটা আমাদের খুব প্রিয় ছিল। স্কুলের সবাই কুঁড়ি কুড়োনোর সুযোগ পেত না। কারণ সবাই তো স্কুলবাসে করে আসত না। আমরা কয়েক জন প্লাস্টিকের ব্যাগে করে কুঁড়িগুলো নিয়ে স্কুলে যেতাম। রেশমীদি আড়ালে বলত, “আমাকে কয়েকটা এক্সট্রা দিস তো! অরিন্দমকে দেব!”

অরিন্দম মানে অরিন্দম মুখার্জি। আমরা স্কুলে মুখোপাধ্যায় বলতাম না তখন। অরিন্দমদাকে দেখতে দারুণ ছিল, ব্যবহারও ছিল খুব ভাল। সঙ্গে ফুটবলটাও খেলত দুর্ধর্ষ। ম্যাচের সময় অরিন্দমদা আর কৃশানুদা যদি আমাদের টিমে থাকত, তা হলে কেউ আমাদের হারাতেই পারত না। ছোট্টখাটো চেহারার, কোঁকড়া চুলের কৃশানু গুহকে সবাই ‘ছোট কৃশানু’ বলত। তার এমন আশ্চর্য স্কিল ছিল ওই বয়সে যে, লোকে হাঁ করে তার খেলা দেখত!

এই দাদাদের পাশাপাশি চৈত্র মাস এলে আজও আমার মনে পড়ে সোমাদির কথা। সোমাদি হল, আমরা যে বাড়িতে ভাড়া থাকতাম, সেই বাড়ির বাড়িওলা জেঠু আর মাম্মামের মেয়ে। আমাদের ছোটদের কী যে ভালবাসত সোমাদি! বৈশাখে পাড়ায় গানের প্রোগ্রাম হবে। তার জন্য চৈত্র থেকে শুরু হত রিহার্সাল। সোমাদি হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইত, ‘ফাগুন প্রাতের উতলা গো, চৈত্র রাতের উদাসী/ তোমার পথে আমরা ভেসেছি।’ গাইত, ‘আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি।’

পয়লা বৈশাখে দেবে বলে সোমাদি আমাদের ছোটদের জন্য নিজের হাতে কার্ড তৈরি করত। আমরা সবাই অপেক্ষা করতাম দেখার জন্য যে, কার জন্য কেমন কার্ড বানাল সোমাদি! সেই অপেক্ষার আনন্দ লিখে বোঝানোর নয়।

আবার আর এক রকম অপেক্ষাও ছিল। তনুদা সেই অন্য রকম অপেক্ষা করত লালীদির জন্য।

লালীদি তনুদার চেয়ে বয়সে বছর চারেকের বড় ছিল। তনুদা ছিল ফুটবল-পাগল। কলেজ পাশ করে এম এ-তে ভর্তি না হয়ে ‘কাঠগোলা বয়েজ়’ ক্লাবের সঙ্গে খেলার মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াত।

না, তনুদা নিজে খেলত না। কিন্তু টিমের কাছে অপরিহার্য ছিল ও। গোটা টিমকে নিয়ে যাওয়া, তাদের জন্য বাস জোগাড় করা। ট্রেনের টিকিট কাটা। খেলার সময় লেবু, জল, চিনি, উইন্টোজেনো, বরফ গুছিয়ে রাখা— সব ছিল তনুদার দায়িত্ব! এমন কী রেফারি, লাইন্সম্যানের সঙ্গে ঝগড়া করা। দরকারে মারামারি করাও ছিল তনুদারই দায়িত্ব। কাঠগোলা বয়েজ়কে সবাই ‘কেজিবি’ বলত। আর ‘কেজিবি’ মানেই ছিল তনুদা।

উল্টো দিকে, হাসিখুশি লালীদি চাকরি করত সরকারি অফিসে। দারুণ ছাত্রী ছিল লালীদি। সঙ্গে তেমন সুন্দরী! আমাদের মফস্সলের পারভিন বাবি। তনুদাদের বাড়ির সঙ্গে লালীদিদের বাড়ির সম্পর্ক ছিল খুব ভাল। আর তনুদা-লালীদির মধ্যেও ইয়ার্কি-খুনসুটি চলত সারা ক্ষণ। আমাদের বাড়ির সামনেই ছিল অরুণাচল সঙ্ঘের মাঠ। সেখানে ফুটবল খেলা হত। বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পথে লালীদি মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত হয়ে লাফাতে থাকা তনুদাকে দেখে বলত, “উচ্চিংড়ে একটা! নিজে খেলতে পারে না, শুধু লাফঝাঁপই সার!”

তনুদা রেগে বলত, “তাতে তোর কী? সবাই খেলে? তা হলে মিনেত্তি, তেলে সান্তানা হবে কে? লালী, যা জানিস না তা নিয়ে ফালতু বকিস না! বুর্জোয়া কোথাকার! দে, দু’টাকা দে!”

সেই যে অপেক্ষার কথা বলেছিলাম, তনুদার বিকেলের টিফিনের টাকাটা লালীদি দিত। আর সেটার জন্য অপেক্ষা করত তনুদা! কিন্তু শুধু কি সেটার জন্যই? আমরা অবাক হয়ে ভাবতাম, চার বছরের বড়কে কি কেউ এমন নাম ধরে ডাকে! হ্যাঁ, আমরা তখন বয়সে এক বছরের বড়কেও ‘দাদা’ বা ‘দিদি’ বলতাম! তখনও আমাদের জীবনে কর্পোরেট কালচারের মতো প্রায় সবাইকে নাম ধরে সম্বোধন করার মতো স্মার্টনেস এসে ঢোকেনি!

কেন লালীদিকে শুধু ‘লালী’ বলে ডাকে তনুদা, সেটা বুঝলাম পরের বছর এপ্রিলের শুরুতে। শুনলাম দু’বাড়ির মধ্যে কী নিয়ে যেন বিশাল ঝামেলা লেগে গিয়েছে!

কী কেস? না, তনুদা আর লালীদি বিয়ে করে বসেছে! এক জন বসু, আর এক জন গাঙ্গুলি! তার উপর ছেলে আবার বয়সে মেয়ের চেয়ে বেশ ছোট! এখন এ-সব তেমন কোনও ব্যাপার না হলেও আশির দশকে এ ছিল আশ্চর্য এক ঘটনা! পাড়া-বেপাড়ার লোকেদের কাছে শিঙাড়া আর ফুচকার চেয়েও মুখরোচক এক খাদ্য!

খবরটা চার দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল দ্রুত। এই নিয়ে দুই বাড়ির মধ্যে ঝামেলা, মারামারি, থানা-পুলিশ, কী না হয়েছিল! ক্লাস ফোরে পড়া আমি, আপাতভাবে ছোট হলেও আবহাওয়ার গুণে অনেক কিছুই বুঝতে শুরু করেছিলাম।

মনে আছে, এক রবিবার দুপুরে এক দিকে ‘বোরোলীনের সংসার’ আর অন্য দিকে পাঁঠার মাংসের গন্ধের মধ্যে খেতে বসে, ছোটপিসি আমার সেজকাকাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “হ্যাঁ রে সেজদা, চৈত্র মাস তো মলমাস, এই মাসে ওরা বিয়ে করল কী করে?”

সেজকাকা, যাঁকে আমি ভাইপো বলে ডাকতাম, বলেছিল, “প্রেমের আবার ‘শুদ্ধমাস’ ‘মলমাস’ কী! আর এ-সব চৈত্রে মাসে হবে না তো কবে হবে? রবিঠাকুর পড়িসনি? তিনি কবে এই মাসের সর্বনেশে কাণ্ডকারখানার কথা বলে গিয়েছিলেন!”

এখন তনুদা আর লালীদি নিউ আলিপুরে থাকে। ওদের ছেলে বাপ্পাই, ইঞ্জিনিয়ার। থাকে নিউকাসলে। তনুদা এখনও ফুটবল-পাগল। এখনও মাঠে যায়। লালীদি রিটায়ার্ড এখন। বাড়িতে বাচ্চাদের নাচ শেখায়। কিন্তু এখনও এপ্রিলের দু’তারিখ আমাদের কয়েক জনকে নেমন্তন্ন করে খাওয়ায়! এই চৈত্রেই ওদের বিয়ের দিন যে!

তনুদা এক বার আমাকে বলেছিল, “চৈত্রের হাওয়ায় যে কী আছে! যে ফুল ফাল্গুনে ফোটে সে যে চৈত্রে আরও গাঢ় হয়ে ওঠে! তার যে কী মায়া! কী জাদু! না হলে লালীর মতো মেয়ে সবার বিরুদ্ধে গিয়ে, এক মাথা নিন্দে সহ্য করে আমাকে বিয়ে করে? বেকার আমাকে নিয়ে এক কামরার ঘরে সংসার পাতে? ‘তিন ভুবনের পারে’ কি শুধু উপন্যাসে আর সিনেমাতেই হয়? জীবনে হয় না বুঝি!”

সত্যি, জীবনে কত কী যে হয়! চৈত্রে এক আশ্চর্য আলোয় ভরে যায় পৃথিবী। বছর শেষ হওয়ার আগে সে যেন শেষ বারের মতো জ্বলে ওঠে এক বার। গ্রীষ্মের প্রখরতায় সব পুড়ে যাওয়ার আগে সে যেন আর এক বার গাছে গাছে রং লাগায়, ফুলে আলো ঢালে। সে যেন হাওয়ায় ভরে দেয় এক অজানা সুগন্ধ। রোদের সোনালি জরি পেতে দেয় পথেঘাটে। প্রহর শেষ হয়ে আসার কালে মানুষের মনে সে যেন সূক্ষ্ম সুচের কাজে ফুটিয়ে তোলে এক অনাবিল নকশা। ফুটিয়ে তোলে প্রেম।

বছর শেষের এই সময়টায় কত কী যে মনে পড়ে যায়! মোবাইল আসার আগের সেই অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা, আর চিঠি লেখার সময়ের কথা মনে পড়ে যায় আমার। শিয়ালদা থেকে দক্ষিণে বজবজ শাখায় ছিল আমাদের মফস্সলের ছোট্ট সুন্দর একটা স্টেশন। তখনও ডবল লাইন হয়নি। ট্রেনও লেট হত বেশ। মনে আছে, সকাল ন’টা তেত্রিশ আর দশটা পঁচিশে দুটো আপ ট্রেন ছিল। এই ট্রেনে অফিসযাত্রীদের চেয়ে বেশি ভিড় হত ছাত্রছাত্রীদের। আর এই ট্রেন-যাত্রার মাঝে বহুবিধ প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হত। কিছু আবার ভেঙেও যেত। আমাদের অঞ্চলে এই ট্রেন দুটোর নাম ছিল ‘প্রজাপতি এক্সপ্রেস’!

নীলমণি পাল ছিল আমাদের মফস্সলের বড় ব্যবসায়ী। তার নাতির নাম শান্তি। আমাদের চেয়ে বয়সে কিছুটা ছোট ছিল ও। তত দিনে আমি মফস্সল ছেড়ে কলকাতায় চলে এসেছি। পড়াশোনা চুকিয়ে নিজেদের ব্যবসায় কাজ শুরু করেছি। কিন্তু ওই ছোট্ট শহরটায় যে-হেতু আমাদের সব আত্মীয়স্বজন থাকত, তাই মাঝে মধ্যে আমি তাদের বাড়ি যেতাম। থাকতাম।

এমনই এক বার রাতে ছোট পিসির বাড়িতে থেকে সকালে সেই প্রজাপতি এক্সপ্রেস ধরেছিলাম অফিস আসব বলে। ট্রেনে শান্তির সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়েছিল। শান্তি তখন এম এসসি করছে। শান্তিকে কেমন যেন এলোমেলো লেগেছিল আমার। যে ছেলে এত হাসিখুশি, সে কেমন যেন ঘেঁটে আছে, মনে হয়েছিল।

ট্রেনে বেশ ভিড়। আমি আর শান্তি এক পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “কী হয়েছে রে? এমন ডাউন হয়ে আছিস কেন?”

শান্তি একটু সময় নিয়ে বলেছিল, “চৈত্র টু চৈত্র এক বছর হয়ে গেল, কিন্তু কুহু এক বারও আমার কথাটা ভাবল না! জানো রাজাদা, আমি এ বার পাগল হয়ে যাব!”

আমি কিছুই জানি না। জিজ্ঞেস করেছিলাম, “কী ব্যাপার!”

শান্তি বলেছিল ওর গল্প।

গত বছর এমনই চৈত্র মাসে নীলমণি পালের আশিতম জন্মদিন পালন করা হয়েছিল বড় করে। শান্তিদের বিশাল বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই প্যান্ডেল করা হয়েছিল। সেখানে একটা ম্যাজিক শো আয়োজন করা হয়েছিল। আর ম্যাজিক দেখাতে এসেছিল একটি মেয়ে। কুহু মালাকার।

কে কী ম্যাজিক দেখেছিল জানি না। শান্তি দেখেছিল কুহুকে! অফুরন্ত রুমাল, টুপি থেকে পায়রা, শূন্য গাছে ফুল নিয়ে আসা, এ সব না-দেখে ও হাঁ হয়ে তাকিয়েছিল কুহুর দিকে।

শান্তি আমাকে সেই ট্রেনে যেতে যেতে বলেছিল, “কী কনফিডেন্স রাজাদা! আর কী দেখতে! আমি মাইরি কিচ্ছু ম্যাজিক দেখিনি, হাঁ করে ওকে দেখেছিলাম! পরে আলাপও করেছিলাম ওর সঙ্গে। সন্তোষপুরে থাকে, জানো। বাবা অসুস্থ। মা একটা ছোট স্টেশনারি দোকান চালায়। আর ও লেখাপড়ার মাঝে টিউশন করে আর ম্যাজিক শো পেলে সেটা করে! ভাবো এক বার স্ট্রাগলটা! দেখামাত্র প্রেমে পড়ে গিয়েছি আমি।”

“দেখামাত্র! অ্যাট ফার্স্ট সাইট!” আমি অবাক হয়েছিলাম।

শান্তি বলেছিল, “হ্যাঁ গো। জানি বিশ্বাস করবে না। কিন্তু সত্যি বলছি। আসলে ভূত দেখা আর লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট যার সঙ্গে হয়, সে ছাড়া অন্য কেউ বিশ্বাস করে না!”

“ওকে বলেছিস?”

“বহু বার! কিন্তু আমাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। বড়লোকের বখাটে ছেলে ভাবে আমাকে! বলে আমার নাকি দায়িত্ববোধ নেই। আমি প্রেম বুঝি না! জীবন বুঝি না! জীবন কি ফিজ়িক্সের থিয়োরি যে বুঝব! জীবন তো একটা ধারা, একটা স্রোত! তার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে অভিজ্ঞতা হবে, তাই না! এক বছর হল, জানো! এ বারও আমরা দাদুর জন্মদিন করেছিলাম। ওকে ডাকাও হয়েছিল, ও আসেনি। বলে আমি নাকি ওকে স্টক করছি! আমি নাকি লম্পট! এ-সব শুনে বাবা আমাকে হেবি কেলিয়েছে! তেইশ বছরের ছেলেকে কেউ মারে? তাও আমি মার খেয়েছি কুহুর কথা ভেবে! কিন্তু ও কিছুতেই ‘হ্যাঁ’ বলছে না!”

আমি বলেছিলাম, “জোর করলে হয় না! ভালবাসা আসার হলে এমনি আসে। ধমকে বা বায়না করে কি গাছে ফুল ফোটাতে পারবি? এও তেমন!”

“কিন্তু গাছের তো মন নেই। মানুষের তো আছে! আমি যে এমন ডেডিকেশন দেখাচ্ছি, সেটা কিছু নয়? মানুষ হিসেবে ও কি বুঝবে না? হাজার হাজার চৈত্র মাস কাটুক, আমি লেবার দিয়ে যাব, দেখো! বছর শেষ হলেও আমার ভালবাসা শেষ হবে না!”

আমি আর কিছু বলিনি। প্রেমে পড়লে মানুষ অনেক কিছু ভাবে। করে। সে-সব নিয়ে কিছু বলার মানে হয় না। আমিও বলিনি। টালিগঞ্জ আসায় নেমে পড়েছিলাম। তার পর কাজের আবহে ভুলেও গিয়েছিলাম শান্তির কথা।

একটা বছর কেটেও গিয়েছিল।

অফিসে পয়লা বৈশাখে গণেশ পুজো হত আমাদের। চৈত্রসংক্রান্তির দিনে সবাই মিলে অফিস পরিষ্কার করতাম। আমার ধুলোয় অ্যালার্জি হলেও সবার সঙ্গে নাকে রুমাল বেঁধে কাজে হাত লাগাতাম। কাজের সঙ্গে হইহুল্লোড়ের আনন্দটা ছিল ফাউ।

আমাদের কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, এমন সময় বিকেলের দিকে অফিসের লাইনে ফোনটা এসেছিল। তখনও মোবাইল আসেনি। আমি ফোনটা ধরেছিলাম। এক দাদা ফোন করেছিল। আর তার পর যা বলেছিল, শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম!

সামনের বৈশাখে কুহু মালাকারের বিয়ে ঠিক হয়েছে। না, শান্তির সঙ্গে নয়। অন্য কারও সঙ্গে। আর সেই সংবাদ মেনে নিতে পারেনি আমাদের শান্তিময় পাল। নিজের ঘরে, সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে পড়েছে গত রাতে! আর রেখে গিয়েছে একটা কাগজ। তাতে শুধু লেখা—‘ভ্যানিশ’!

অফিসের বাইরে বেরিয়ে এসে একা দাঁড়িয়েছিলাম আমি। দেখেছিলাম, উঁচু-উঁচু বাড়ির মাথার উপর রাঙা হয়ে, ছড়িয়ে আছে প্রহরশেষের সর্বনাশা আলো! আর তাতে ডুবে, ভেসে পাখিরা ফিরছে বাসায়। চৈত্রের সঙ্গে বছরও শেষ হয়ে আসছে। আর এরই মাঝে আমাদের শান্তিময় পাড়ি দিয়েছে অনন্তের পথে!

কলকাতায় এসে বসবাস শুরু করার পরে ঋতু পরিবর্তনের ব্যাপারটা অনেক পাল্টে গিয়েছিল। আমাদের হুগলি নদীর গা-ঘেঁষা মফস্সলে আমরা যেমন ঋতু পরিবর্তনটা বুঝতে পারতাম, কলকাতায় এসে সেটা অনেক সীমিত হয়ে গিয়েছিল। সেই কামুর লেখার মতো যেন অনেকটা। এখানে দোকানে ফুল এসে পৌঁছলে যেন বসন্ত বোঝা যায়! “ইন দ্য সিটি, দ্য অনলি ওয়ে টু নো দ্যাট স্প্রিং ইজ় হিয়ার ইজ় টু সি দ্য ইনফ্লাক্স অব ফ্লাওয়ার্স ইন দ্য মার্কেটস।”

শহরের রুপোলি রঙের টিনের শরীরওয়ালা বাস আর হলুদ কালো ট্যাক্সির ধোঁয়ায় বা রাস্তার মাঝে ঘাস বোনা আইল্যান্ডের উপর দিয়ে ঘড়ঘড় শব্দে চলে যাওয়া ট্রামের ঘণ্টার আওয়াজের মাঝে গ্রীষ্ম, বর্ষা আর শীত ছাড়া বাকি তিনটে ঋতু, বা তার সঙ্গে যুক্ত বাংলা মাসের আসা-যাওয়া আমরা সেভাবে টেরই পেতাম না!

শুধু শেষ রাতে হু-হু করে ডেকে ওঠা কোকিলের সুর শুনলে মনে হত, তবে কি বসন্ত এল! দোল চলে গিয়েছে তো বেশ কিছু দিন! তা হলে এটাই কি চৈত্র মাস!

কিন্তু তার কয়েক বছর পর থেকে আর বুঝতে অসুবিধে হত না যে, চৈত্র মাস এসেছে! কারণ চৈত্র এলেই সুদূর গ্রাম থেকে বলাইকাকু আর মিনতিকাকিমা আসত মাধুকরী করতে। মনে আছে, বাড়ির দরজায় এসে বলাইকাকু সুর করে হাঁক দিত, “বাবার চরণের সেবা লাগে মহাদে-এ-এ-ব!” আমি এই মায়াময় ডাকের অপেক্ষায় থাকতাম! কখন আসবে ওরা! কখন ডাকবে বলাইকাকু!

মা ওদের জন্য, একটা স্টিলের থালায় চাল, আনাজপাতি গুছিয়ে রাখত। আর দিত এগারো টাকা। সে-সব ওদের ঝোলায় ঢেলে দিয়ে আমিও আমার মাধুকরীর জন্য হাত পাততাম। মিনতিকাকিমা হেসে এক মুঠো নানা রঙের ফুল রাখত আমার কিশোর হাতে। বলাইকাকু বলত, “আমাদের গ্রামে এ সময় যে কী সুন্দর ফুল ফোটে! বাবুর জন্য তাই নিয়ে আসি! শহরে তো এ-সব পাও না!”

এই কথা বলতে বলতে দেখতাম, বলাইকাকু আর মিনতিকাকিমার চোখ ছলছল করে উঠছে! গলার স্বর কেমন যেন ভাঙাচোরা! চৈত্রের দুপুরের রোদে তপ্ত, খড়ি-ওঠা মুখে কেমন যেন এক ছায়া পড়ত ওদের!

কেন ফুল দেওয়ার সময় প্রতি বার চোখে জল আসে ওই দম্পতির! কেন আমার জন্য ফুল আনে ওরা! মা’কে বলেছিল বলাইকাকু। বলেছিল সুমন্তর কথা। ওদের একমাত্র ছেলে। কলকাতা থেকে ট্রেনে করে বাড়ি ফেরার সময় ভিড়ের চাপে পড়ে যায় লাইনের পাশে। আর ওঠেনি। সুমন্ত ভাল ছাত্র ছিল। বাগান করত। ভাল বেহালা বাজাত। বাবা-মা’কে বলত, বড় হয়ে প্রফেসর হবে। মাঝপথে সে যে এমন খেলা ভেঙে চলে যাবে, কেউ কি ভেবেছিল! আমাকে দেখলে ওদের নাকি সুমন্তর কথা মনে পড়ে। তাই সেই বাগানের ফুল নিয়ে আসে আমার জন্য! আমি হাত পেতে যে নিই, তাতেই ওদের আনন্দ! কিন্তু শুধুই কি আনন্দ! আনন্দের তলায় যে এক মনখারাপের নদী বয়ে যায়, তা কি সত্যি নয়! আমাকে দেখে কি ওদের আরও কষ্ট বাড়ত না!

এটা যখন শুনেছিলাম, তখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। এর পর আরও দু’বছর ওই পাড়ায় ছিলাম। তার পর থেকে আমার হাতে ওরা যখনই ফুল রাখত, আমি সঙ্কোচে কুঁকড়ে যেতাম। মনে হত, আমার জন্য কি কষ্ট পাচ্ছে ওরা! আমার কাছে তো ওদের কষ্টের উপশম নেই! নিজেকে খুব অসহায় আর অক্ষম মনে হত।

তার পর সেই পাড়া ছেড়ে নিজেদের ফ্ল্যাটে চলে এসেছিলাম আমরা। আর জীবনের ফাঁকে আমাদের চৈত্র মাসের সেই বন্ধু দু’জন কোথায় যে হারিয়ে গিয়েছিল, আর জানি না! তবে আজও চৈত্র মাসে পাড়ায় যখন সন্ন্যাসী আসে, যখন ডাক শুনি, “বাবার চরণের সেবা লাগে মহাদে-এ-এ-ব!” আমার বলাইকাকু আর মিনতিকাকিমার মুখ মনে পড়ে যায়! দেখি, শাঁখা-পলা পরা হাত ফুল রাখছে আমার করতলে! যেন প্রকৃতি, সামান্য মানুষের হাতে সাজিয়ে দিচ্ছে তার শ্রেষ্ঠ সম্ভার! নানা যন্ত্রণার মধ্যেও সে রূপ-রসের আনন্দ আর সম্ভাবনার আলো নিয়ে আসছে আমাদের জন্য!

চৈত্র মাস বছর শেষের মাস, কিন্তু আসলে আমাদের মনে আশা-ভরসা জাগানোর মাস। শীতের শূন্যতা থেকে পূর্ণ এক পৃথিবীর প্রতিশ্রুতি দেওয়ার মাস। সংক্রান্তি পেরিয়ে পয়লা বৈশাখের আনন্দ আর উৎসবে আমাদের পৌঁছে দেওয়ার মাস।

এ বারও চৈত্র এসেছে। তোমার গ্রামে, তোমার মফস্সলের গাছে গাছে, বা শহরের ব্যালকনিতে সাজানো টবে কি ফুল ফুটেছে এখন? কিন্তু এই ধ্বংসের আবহে ফুলের কথা বলা কি ঠিক?

আমি জানি না এ কেমন চৈত্র মাস। চার দিকে যুদ্ধের ভয়াবহ চিৎকার, মৃত্যু আর ধ্বংসের হাহাকার! এক-একটা বোমায় শয়ে শয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে! তার আগুনে পুড়ে যাচ্ছে ফুল, তার শব্দে ঢেকে যাচ্ছে পাখির গান! এ বার বসন্তে কি কোকিল ডাকছে? ‘তোমার চোখে’ যে সর্বনাশ আমরা দেখতে চেয়েছিলাম, তা ছিল ‘মধুর সর্বনাশ’। এমন বিভীষিকাময় সর্বনাশ তো দেখতে চাইনি। এমন চৈত্র মাসও তো চাইনি কখনও।

তাও এখনও চৈত্র মাস এলে সেই হারিয়ে-যাওয়া সময়ের হাওয়াই যেন ফিরে আসে আমার মনে। যেন দেখতে পাই, রেশমীদি কৃষ্ণচূড়ার একমুঠো কুঁড়ি রাখছে অরিন্দমদার হাতে! যেন দেখতে পাই, গোলের আনন্দে তনুদা লাফাচ্ছে মাঠের পাশে। আর লালীদি ফিরছে অফিস থেকে, পাগল হাওয়ায় তার ওড়না উড়ছে সমান্তরাল! দেখতে পাই, আমার কুট্টিদাদু স্প্রিং ফ্লাশের চা-পাতা ঢালছে ঠোঙায়। আর তার বাদামি রেণুর আশ্চর্য গন্ধে দ্রবীভূত হয়ে যাচ্ছে আমাদের একমুঠো মফস্সল! দেখতে পাই, সোমাদি ছোটদের জন্য নববর্ষের কার্ড বানাচ্ছে তার সমস্ত ভালবাসা দিয়ে! বুঝি, চৈত্র মাস আসলে চিরকালীন ভালবাসার কথাই বলে! আমি চাই এমন চৈত্র বার বার আসুক, যেখানে বলাইকাকু আর মিনতিকাকিমা বাড়ি-বাড়ি ঘুরে সবার হাতে রাখবে একমুঠো ফুল। সেই ফুল, যা মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখবে প্রাণপণ। তার সুগন্ধ ঢেকে দেবে সব বিষাক্ত হাওয়া। আমি চাই আবারও এমন চৈত্র মাস আসুক, যখন প্রহরশেষের অন্য আলোয় আমরা সবাই অপেক্ষা করব সেই মধুর সর্বনাশের! আশা করব, সবার সমস্ত মনখারাপ ছাপিয়ে যেন ডেকে ওঠে আশ্চর্য কোকিল! কুহুস্বরে সে যেন বোধন করে নেয় শান্তিময় আগত বৈশাখকে।

আরও পড়ুন