Antarctica Mystery Unfolds

‘দানব’ লুকিয়ে আছে বরফের তলায়! আন্টার্কটিকার হিমবাহের সেই গোলাপি পাথর রহস্যের সমাধান হল এত বছরে

এখন আমরা আন্টার্কটিকা মহাদেশকে যে ভাবে দেখি, তা শুরু থেকেই এমন ছিল না। জুরাসিক যুগে এই অঞ্চল এখনকার মতো বরফে মোড়া থাকত না। তখন এটি ছিল একটি নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৪ মার্চ ২০২৬ ০৮:৫৫
আন্টার্কটিকার পাইনদ্বীপ হিমবাহের নীচে কী রয়েছে, জানা গেল এত দিনে।

আন্টার্কটিকার পাইনদ্বীপ হিমবাহের নীচে কী রয়েছে, জানা গেল এত দিনে। ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।

চারদিকে চাঁই চাঁই বরফ। আন্টার্কটিকার কথা ভাবলে প্রথমে এই দৃশ্যই চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিন্তু এই বরফের নীচেই লুকিয়ে আছে এক অদৃশ্য জগৎ। যা নিয়ে অবিরাম গবেষণা চলছে। তেমনই এক গবেষণায় খোঁজ মিলল বরফের স্তূপের তলায় লুকিয়ে থাকা এক ‘দানব’-এর।

Advertisement

আন্টার্কটিকার পশ্চিমে রয়েছে হাডসন পর্বতমালা। সেখানেই রয়েছে পাইনদ্বীপ হিমবাহ। রয়েছে বিভিন্ন আগ্নেয়গিরিও। সেই আগ্নেয়গিরিগুলির চূড়ায় প্রায়শই কিছু অদ্ভূত-দর্শন পাথর পড়ে থাকতে দেখা যায়। গোলাপি রঙের গ্রানাইট পাথর। যা পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সঙ্গে একেবারেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সেই কারণেই এগুলি আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছিল। আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে বেমানান এই উজ্জ্বল গোলাপি রঙের বোল্ডারগুলি কী ভাবে আগ্নেয়গিরির চূড়ায় পৌঁছোল, তা গত কয়েক দশক ধরে ভাবিয়ে তুলেছিল বিজ্ঞানীদের।

এই অস্বাভাবিকতার উৎস সন্ধানের চেষ্টা চলছিল বহু বছর ধরেই। এত দিনে সেই রহস্যের সমাধান হল। গোলাপি পাথর রহস্য বিজ্ঞানীদের পৌঁছে দিল আন্টার্কটিকার হিমবাহের নীচে এক অজানা দুনিয়ায়। খোঁজ মিলল গ্রানাইট পাথরের এক দানবাকার স্তূপের। যা চওড়ায় প্রায় ১০০ কিলোমিটার। এবং প্রায় সাত কিলোমিটার পুরু। যে প্রকাণ্ড চেহারা এই গ্রানাইট স্তূপের, তাতে ব্রিটেনের ওয়েল্‌সের প্রায় অর্ধেক ধরে যাবে।

আন্টার্কটিকায় কোনও স্থায়ী মনুষ্যবসতি নেই। গবেষণার প্রয়োজনে এখানে বিজ্ঞানীরা গিয়ে সাময়িক আস্তানা তৈরি করেন। ব্রিটিশ আন্টার্কটিক সার্ভে (বিএএস)-এর নেতৃত্বে এক গবেষকদলও গত কয়েক বছর ধরে আন্টার্কটিকায় গবেষণা চালাচ্ছে। এই গোলাপি পাথর রহস্যের সমাধানও করে ওই গবেষকদলই। তারা প্রথমে পাহাড়ের চূড়ায় পড়ে থাকা গ্রানাইটের নমুনা বিশ্লেষণ করে দেখেন। তাতে দেখা যায়, পাথরগুলির বয়স প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি বছর। অর্থাৎ, পাথরগুলি জুরাসিক যুগের।

এখন আমরা আন্টার্কটিকা মহাদেশকে যে ভাবে দেখি, তা শুরু থেকেই এমন ছিল না। জুরাসিক যুগে এই অঞ্চল এখনকার মতো বরফে মোড়া থাকত না। তখন এটি ছিল একটি নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল। ছিল কনিফার এবং ফার্ন জাতীয় গাছে ঢাকা এক ঘন অরণ্য। জলবায়ু শীতল ছিল ঠিকই, তবে এতটা তীব্র নয়। সেই সময়ে ডাইনোসরদের বেশ কিছু প্রজাতির বেঁচে থাকার জন্যও অনুকূল ছিল এই ভূখণ্ড। তার মধ্যে অন্যতম সাত মিটার লম্বা ‘ক্রায়োলোফোসরস’। এই মাংসাশী ডাইনোসরেরা আসলে হিংস্র টি-রেক্সের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। তবে এখন হাডসন পর্বতমালায় সামান্য লাইকেন এবং শ্যাওলা ছাড়া বিশেষ কিছুই চোখে পড়ে না। মাঝে মাঝে দুই-একটি ‘স্নো পেত্রেল’ পাখিকে দেখা যায়। এই বরফে ঢাকা অঞ্চলে যে অতীতে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল, তা আরও এক বার প্রমাণ হল সাম্প্রতিক গবেষণায়।

প্রাথমিক গবেষণায় পাথরগুলির বয়স জানা গেলেও সেগুলি কোথা থেকে এসেছে, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনও ধারণা ছিল না। এই ধোঁয়াশা কাটাতে ভূ-পদার্থবিদ টম জর্ডানের নেতৃত্বে ওই গবেষকদল আকাশ থেকে গোটা অঞ্চলের তথ্য সংগ্রহ করেন। ওই অঞ্চলের মাধ্যাকর্ষণ টান কোথায় কেমন, তা একটি বিমানে করে বিশ্লেষণ করেন তাঁরা। তাতেই হিমবাহের নীচে কিছু অস্বাভাবিক ইঙ্গিত মেলে। ওই তথ্য বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন, হিমবাহের নীচে গ্রানাইটের একটি প্রকাণ্ড স্তূপ চাপা পড়ে রয়েছে।

বিএএস-এর এই গবেষণাটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘নেচার কমিউনিকেশনস আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ জার্নালে। গবেষকদলের প্রধান জর্ডানের কথায়, “ভূপৃষ্ঠে পাওয়া গোলাপী গ্রানাইটের বোল্ডারগুলি আমাদের বরফের নীচে লুকিয়ে থাকা এক বিশাল বস্তুর সন্ধান দিয়েছে। এটি খুবই আশ্চর্যজনক।” গবেষণাপত্রের সহলেখক তথা ভূতত্ত্ববিদ জোয়ান জনসন বলেন, “আমাদের পৃথিবীর কী ভাবে পরিবর্তন হয়েছে, বিশেষ করে বরফ কী ভাবে আন্টার্কটিকার ভূমিরূপকে ক্ষয় করেছে, তার এক আশ্চর্য দলিল হল এই পাথরের স্তূপ। বরফের নীচে, আমাদের নাগালের বাইরে কী রয়েছে, তা জানার জন্য এ এক অমূল্য ভান্ডার।”

আন্টার্কটিকা মহাদেশের যে দিকে চোখ যায়, শুধুই বরফের চাঁই। উদ্ভিদ বলতে শুধু গুল্মজাতীয় কিছু গাছ। তবে সাম্প্রতিক অপর এক গবেষণায় দাবি করা হচ্ছে, গুল্মজাতীয় নয়, এক কালে বড় বড় উদ্ভিদও ছিল আন্টার্কটিকায়। এখন যে সব অঞ্চলে গুটি গুটি পায়ে পেঙ্গুইনেরা ঘুরে বেড়ায়, সেই সব জায়গা বহু বছর আগে ভরে থাকত সবুজ বনভূমিতে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় সাড়ে তিন কোটি বছরের পুরনো এমনই এক হারিয়ে যাওয়া বনভূমির সন্ধান মিলেছে অপর এক গবেষণায়। অন্য এক গবেষণায় আন্টার্কটিকার বরফের নীচে লুকিয়ে থাকা ২০৭টি হিমবাহের সন্ধান মিলেছে। গত কয়েক দশক ধরে আন্টার্কটিকাকে নিয়ে এমন বিভিন্ন নতুন তথ্য উঠে এসেছে। এ বার তাতে জুড়ল দানবাকার এই গ্রানাইট শিলার কথাও।

Advertisement
আরও পড়ুন