Glaciers Antibiotic Resistance

কোটি কোটি বছর ধরে হিমবাহে জমে ক্ষতিকর জিন! উষ্ণায়নে বিষ বরফ গলে মিশছে নদী, সমুদ্রে! গবেষণায় বিপদের ইঙ্গিত

শুধু বরফ গলে সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি নয়। চিনের একদল বিজ্ঞানী বলছেন, হিমবাহে আরও বিপদ রয়েছে। কোটি কোটি বছর ধরে তার মধ্যে জমে রয়েছে ক্ষতিকর জিন!

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৯
আন্টার্কটিকার হিমবাহে নতুন বিপদের ইঙ্গিত পেলেন বিজ্ঞানীরা।

আন্টার্কটিকার হিমবাহে নতুন বিপদের ইঙ্গিত পেলেন বিজ্ঞানীরা। ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।

দূষণে দ্রুত বদলে যাচ্ছে পৃথিবী। বাড়ছে তাপমাত্রা। বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে নানা সময়ে নানা বিপদের ভবিষ্যদ্বাণী করছেন বিজ্ঞানীরা। বলা হচ্ছে, পরিবেশ দূষণের ফলে পৃথিবী যত উষ্ণ হচ্ছে, তত হিমবাহের বরফ গলছে। ধীরে ধীরে বেড়ে চলেছে সমুদ্রের জলস্তর। কিন্তু হিমবাহ থেকে বিপদ কি শুধু একটাই?

Advertisement

চিনের একদল বিজ্ঞানী সম্প্রতি নতুন এক দাবি করেছেন। বলেছেন, হিমবাহে আরও বিপদ রয়েছে। গবেষণা করে তাঁরা দেখেছেন, কোটি কোটি বছর ধরে হিমবাহের মধ্যে জমে রয়েছে ক্ষতিকর জিন! বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে তা বরফের সঙ্গে গলে মিশছে নদী আর সমুদ্রের জলে। এমনকি, এর ফলে ভবিষ্যতে বাড়তে পারে জলবাহিত রোগের প্রকোপও। যে সমস্ত জায়গায় হিমবাহ-গলা জল গিয়ে মেশে, সেখানেই স্বাস্থ্যের ঝুঁকির আশঙ্কা দেখিয়েছেন চিনা বিজ্ঞানীরা।

কী এমন ক্ষতিকর জিন মিশে রয়েছে জমে থাকা বরফের চাঁইতে? বিজ্ঞানীদের দাবি, এই জিন অ্যান্টিবায়োটিক বা জীবণুনাশক প্রতিরোধকারী। যে সমস্ত ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করে, এই জিন তাদের সাহায্য করে। ফলে এটি জলে মিশে জলের জীবাণুনাশক ক্ষমতাকে কমিয়ে দিতে পারে। বিশ্ব উষ্ণায়নের সঙ্গে অবশ্য এই ধরনের জিনের তেমন সম্পর্ক নেই। বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, বিশ্ব উষ্ণায়ন শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই হিমবাহে এই ধরনের ক্ষতিকর জিন মিশে রয়েছে। তবে আগে তা জমাট বাঁধা অবস্থাতেই থাকত। তাতে পৃথিবী বা জীবজগতের কোনও ক্ষতি হত না। কিন্তু বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহ গলতে শুরু করায় বিষাক্ত জিন এখন মানুষের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদী এবং হ্রদগুলিতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধকের সক্রিয় উৎসে পরিণত হয়েছে এই জিন।

হিমবাহে যে এই ধরনের বিপদ লুকিয়ে থাকতে পারে, তা বিজ্ঞানীরা আগে বোঝেননি। দীর্ঘ দিন ধরে হিমবাহগুলিকে বিচ্ছিন্ন, বদ্ধ, হিমায়িত চাঁই হিসাবেই বিবেচনা করেছে বিজ্ঞান। নতুন গবেষণা বলছে, হিমবাহ আসলে শুধু জমাট বাঁধা জল নয়, এগুলি জমাট বাঁধা আস্ত জীবতত্ত্ব। চিনা গবেষকদলের অন্যতম সদস্য গুয়ান্নান মাও বলেন, ‘‘হিমবাহগুলিকে দীর্ঘ দিন ধরে বিচ্ছিন্ন হিসাবে দেখে আসা হয়েছে। আমাদের গবেষণা দেখাচ্ছে, এগুলি আসলে জিনগত সংরক্ষণাগারও বটে, যা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধকগুলিকে সঞ্চয় করে।’’

অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধককে অনেকেই দূষণের ফল বলে মনে করেন। তা পুরোপুরি ঠিক নয়। বিজ্ঞানীদের দাবি, বহু প্রতিরোধক জিন আসলে প্রাচীন। বছরের পর বছর ধরে অ্যান্টিবায়োটিক যৌগের সঙ্গে জীবাণুদের প্রতিযোগিতামূলক সহাবস্থানের ফলে প্রাকৃতিক ভাবেই এই ধরনের জিন তৈরি হয়েছে। ঠান্ডায় অণুজীব এবং তাদের ডিএনএ-কে দীর্ঘ সময় ধরে বন্দি করে রাখতে পারে হিমবাহ।

গবেষণার স্বার্থে আন্টার্কটিকা, আর্কটিক এবং তিব্বতীয় মালভূমির হিমবাহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা জানিয়েছেন, দূষিত এলাকার হিমবাহে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক জিনগুলির পরিমাণ তুলনায় কম। জলের নমুনা পরীক্ষা করে দেখলে বিপদের ইঙ্গিত আরও স্পষ্ট হয়। হিমবাহপুষ্ট নদী এবং হ্রদের জলে এই ধরনের প্রতিরোধকের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই তা পশুপাখি এবং মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারের জল। এ প্রসঙ্গে গুয়ান্নান বলেন, ‘‘হিমবাহপুষ্ট নদী এবং হ্রদ বহু মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় জলের উৎস। প্রতিরোধক জিনগুলি এই জলে মিশলে তা আধুনিক ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শে আসে এবং তার মাধ্যমেই ছড়িয়ে পড়ে।’’

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, জীবাণু-জগতে জিনের স্থানান্তরের জন্য আদৌ প্রজননের প্রয়োজন পড়ে না। সেই কারণেই অনুকূল পরিস্থিতিতে এত ব্যাপক ভাবে ছড়়িয়ে পড়তে পারে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক। এখানেই শেষ নয়। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো রয়েছে ভাইরাস। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, প্রতিরোধক জিনগুলি ভাইরাসের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে। এর ফলে ব্যাকটেরিয়ার রোগসৃষ্টি আরও সহজ হয়। এদের সহাবস্থান যে কোনও সংক্রমণের চিকিৎসাকেও কঠিন করে তোলে। তাই বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহের গলনকে আর সাধারণ পরিবেশগত সমস্যা হিসাবে দেখতে চাইছেন না বিজ্ঞানীদের একাংশ। নতুন গবেষণা এর বৃহত্তর ঝুঁকির দিকটিও উন্মুক্ত করে দিয়েছে।

Advertisement
আরও পড়ুন