Earth and Moon Bonding

কোটি কোটি বছর ধরে গোপনে চাঁদের পেট ভরাচ্ছে পৃথিবীই! তৈরি করে দিচ্ছে বাসযোগ্যতা, গবেষণায় নতুন হদিস

আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৪০০ কোটি বছর আগে চাঁদের উৎপত্তি। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, আগামী দিনে এই উপগ্রহের মাটিকেও মানুষের বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব। সাম্প্রতিক গবেষণার পর সেই ধারণা আরও জোরালো হয়েছে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৬
পৃথিবীর সঙ্গে প্রকাণ্ড পাথরখণ্ডের সংঘর্ষে উপগ্রহ চাঁদের উৎপত্তি।

পৃথিবীর সঙ্গে প্রকাণ্ড পাথরখণ্ডের সংঘর্ষে উপগ্রহ চাঁদের উৎপত্তি। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

চাঁদের সঙ্গে পৃথিবীর সম্পর্ক যতটা আদিম, তার চেয়েও বেশি রহস্যে ঘেরা। পৃথিবীর একমাত্র এই উপগ্রহকে নিয়ে মানুষের আগ্রহ, কৌতূহলের শেষ নেই। সেই কৌতূহলের রথে চেপেই সম্প্রতি রহস্যের আরও এক মোড়ক উন্মোচন করে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা। হঠাৎ তাঁরা জানতে পেরেছেন, কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবী সুকৌশলে, অত্যন্ত গোপনে তার উপগ্রহের পেট ভরিয়ে চলেছে। সেখানে তৈরি করে চলেছে বাসযোগ্যতা!

Advertisement

আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৪০০ কোটি বছর আগে চাঁদের উৎপত্তি। সৌরজগতের পথচলা তখন সবেমাত্র শুরু হয়েছে। বাইরে থেকে এসে তরুণ পৃথিবীকে ধাক্কা মেরেছিল বিশাল এক মহাজাগতিক পাথরখণ্ড। মঙ্গলগ্রহের সমান আকারের সেই পাথরের ধাক্কায় পৃথিবীর বুক ভেঙে ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছিল একটি ছোট অংশ। তা-ই চাঁদ হয়ে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে চলেছে। পৃথিবীতে প্রাণ থাকলেও চাঁদের বায়ুমণ্ডলে তার কোনও হদিস পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, আগামী দিনে এই উপগ্রহের মাটিকেও মানুষের বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব। সাম্প্রতিক গবেষণার পর সেই ধারণা আরও জোরালো হয়েছে।

সত্তরের দশকে চাঁদে মানুষ পাঠিয়েছিল আমেরিকার অ্যাপোলো অভিযান। সেখান থেকে চাঁদের মাটি এবং পাথরের যে নমুনা পৃথিবীতে নিয়ে আসা হয়েছিল, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। দেখা গিয়েছে, চাঁদের মাটিতে রয়েছে জল, কার্বন ডাই অক্সাইড, হিলিয়াম, আর্গন এবং নাইট্রোজেনের মতো পদার্থের স্তর। অধিকাংশ পদার্থই চাঁদে গিয়েছে পৃথিবী থেকে।

বিজ্ঞানীরা জানতেন, সৌরবায়ু পৃথিবী থেকে বিভিন্ন পদার্থের কণা চাঁদ পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু এই ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। চাঁদে যে পরিমাণ নাইট্রোজন রয়েছে, তা শুধু সৌরবায়ুর মাধ্যমে পৃথিবী থেকে স্থানান্তরিত হওয়া সম্ভব নয়। পুরনো গবেষণায় এই রহস্যের অন্য একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, সৌরবায়ুর মাধ্যমেই প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেনের কণা চাঁদে পৌঁছেছিল,তবে তা পৃথিবীতে চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হওয়ার আগে। চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হওয়ার পরে আর তা সম্ভব নয়। কারণ, বায়ুমণ্ডলীয় কণাগুলিকে বাইরে যেতে বাধা দেয় ওই চৌম্বকক্ষেত্র।

নতুন গবেষণায় এই হিসাবই পাল্টে গিয়েছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করে আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অফ রচেস্টারের বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, চৌম্বকক্ষেত্র আদৌ বায়ুমণ্ডলীয় কণার বহির্গমন আটকায় না, বরং তা আরও সহজ করে তোলে। কোটি কোটি বছর ধরে তাই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থেকে সৌরবায়ুর মাধ্যমে চাঁদে পৌঁছে যাচ্ছে হরেক পদার্থের কণা। বিজ্ঞানীদের চোখের আড়ালেই গোপনে পেট ভরে চলেছে উপগ্রহের। নেচার কমিউনিকেশন্‌স আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট পত্রিকায় এই সংক্রান্ত গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে।

পৃথিবীচ্যুত এই কণাগুলি চাঁদের মাটিতে গিয়ে মেশে। তাতে এমন কিছু পদার্থও রয়েছে, যা আগামী দিনে চাঁদের মাটিতে মানুষের বসতি সম্ভব করে তুলতে পারে। অর্থাৎ, পৃথিবী আসলে চাঁদকে বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টাই চালাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে ইউনিভার্সিটি অফ রচেস্টারের পদার্থবিদ্যার গবেষক এরিক ব্ল্যাকম্যান বলেছেন, ‘‘চাঁদের মাটিতে সংরক্ষিত কণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং সৌরবায়ু ও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মিথষ্ক্রিয়ার গণনামূলক মডেলিং এক জায়গায় করে আমরা চৌম্বকক্ষেত্রের ইতিহাস খুঁজে পেতে পারি।’’ গবেষণায় দেখা গিয়েছে, চাঁদের মাটিতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন পদার্থের স্থায়ী সংরক্ষণ রয়েছে। ভবিষ্যতে তা চাঁদে বসবাসের দরজা খুলে দিতে পারে। শুধু জল এবং নাইট্রোজেনের অস্তিত্বই চাঁদের মাটিতে মানুষের দীর্ঘস্থায়ী কার্যকলাপ বজায় রাখতে সাহায্য করবে। মহাকাশচারীরা চাঁদে থেকে কোনও গবেষণা করতে চাইলে পৃথিবী থেকে তাঁদের জন্য উপাদান সরবরাহ করার আর প্রয়োজন নেই। এর ফলে তাঁদের অনুসন্ধান আরও বাস্তবসম্মত হয়ে উঠবে, আশাবাদী গবেষকদের একাংশ।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বছরের পর বছর ধরে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের একটি অংশ যে ভাবে চাঁদের মাটিতে গিয়ে থিতু হচ্ছে, তাতে এই বায়ুমণ্ডলের একটি রাসায়নিক ইতিহাস চাঁদের মাটিতে সংরক্ষিত থাকা অসম্ভব নয়। আগামী দিনে এই মাটি পরীক্ষা করেই পৃথিবীর জলবায়ু, সমুদ্র এবং প্রাণের বিবর্তন সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

Advertisement
আরও পড়ুন