— প্রতীকী চিত্র।
এত দিন লুকিয়ে ছিল সমুদ্রের নীচে। সম্প্রতি জানা গিয়েছে অস্তিত্বের কথা। কথা হচ্ছে সমুদ্রগর্ভে ডুবে থাকা এক আগ্নেয়গিরি নিয়ে। তবে তা কত গভীরে রয়েছে, সেটি স্পষ্ট নয় এখনও। উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, ওই আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত থেকে তৈরি হতে পারে নতুন এক দ্বীপ।
সমুদ্রতলে অগ্নুৎপাতের ফলে নতুন দ্বীপের সৃষ্টি নতুন ঘটনা নয়। এ ঘটনা আগেও হয়েছে। বছর তিনেক আগে জাপানে এমন একটি দ্বীপ সৃষ্টি হয়েছিল। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে জেগে উঠেছিল ইয়োটো দ্বীপ। এ বার তেমনই এক দ্বীপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ওশিয়ানিয়ার পাপুয়া নিউ গিনি সংলগ্ন সমুদ্রে। নাসার উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে তেমনই আভাস পাওয়া গিয়েছে।
সমুদ্রের তলায় কোন অঞ্চলে কী রয়েছে, সেই রহস্যের সমাধান এখনও হয়নি। প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ চাঁদ এবং মঙ্গলগ্রহেরও পৃষ্ঠদেশের বিষয়েও বিশদে জেনে নিয়েছে। তবে আমাদের নিজেদের গ্রহের সমুদ্রতলের সম্পূর্ণ ম্যাপিং এখনও হয়ে ওঠেনি। সমুদ্রের তলদেশের প্রায় ৭০ শতাংশ অঞ্চলে কী রয়েছে, সেই মানচিত্র নেই বিজ্ঞানীদের কাছে। কারণ, এই অঞ্চলগুলি এতটাই গভীর যে সোনার (সাউন্ট নেভিগেশন অ্যান্ড রেঞ্জিং) প্রযুক্তির মাধ্যমে সেখানে সমুদ্রের তলদেশের গভীরতা সঠিক ভাবে নির্ধারণ করা যায় না। বর্তমান পরিস্থিতি এমন যে, নিজেদের গ্রহের সমুদ্রতলের তুলনায় মঙ্গলগ্রহের পৃষ্ঠদেশ সম্পর্কে অনেক বেশি তথ্য রয়েছে বিজ্ঞানীদের হাতে।
পাপুয়া নিউ গিনির উত্তর-পূর্ব দিকে মধ্য বিসমার্ক সাগরে সম্প্রতি সন্ধান মিলেছে সমুদ্রের নীচে ডুবে এক আগ্নেয়গিরির। সমুদ্রের মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু ধরা পড়ে নাসার উপগ্রহে। যা থেকে ইঙ্গিত মেলে সমুদ্রের নীচে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত হয়েছে। উপগ্রহচিত্রে সমুদ্র থেকে বাষ্পের কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। তার পাশে সমুদ্রের জলের রঙও বদলে যায়। গত ২১ মে নাসার আর্থ অবজ়ারভেটরি ওই ছবি প্রকাশ করে। কিন্তু ওই অঞ্চলে সমুদ্রের তলদেশের বিশদ মানচিত্র এখনও তৈরি হয়নি। ফলে ওই অগ্নুৎপাতের সম্পর্কে খুব বেশি তথ্যও জানা যায়নি।
এর আগে ১৯৭২ সালে পাপুয়া নিউগিনির কাছে সমুদ্রের তলায় আরও একটি অগ্নুৎপাত ঘটেছিল। বিজ্ঞানীর ধারণা, এটি তার থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে কোনও একটি জায়গায় ঘটেছে। তবে ঠিক কোন আগ্নেয়গিরিটি সক্রিয় রয়েছে, সেটির জ্বালামুখ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কতটা গভীরে রয়েছে বা সেখানে এর আগে শেষ করে অগ্নুৎপাত হয়েছিল— এই বিষয়গুলি এখনও অস্পষ্টই। বিজ্ঞানীরাও এ বিষয়ে কোনও ঐকমত্যে আসতে পারেননি।
সমুদ্রগর্ভস্থ এই আগ্নেয়গিরিতেও অন্য আগ্নেয়গিরির মতো অগ্নুৎপাত হয়। সেগুলি থেকেও লাভা নির্গত হয়। তবে ওই উত্তপ্ত লাভা সমুদ্রের তলার শীতল জলের সংস্পর্শে এসে দ্রুত কঠিন হতে থাকে। ঘন ঘন অগ্নুৎপাতের ফলে ওই লাভা স্তরে স্তরে জমতে থাকে এবং একটি পর্যায়ে এসে তা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাকে ছাপিয়ে নতুন দ্বীপ হিসেবে উঠে আসে।
নাসার বিজ্ঞানী জিম গারভিন এক বিবৃতিতে বলেন, “এখানে একটি নতুন দ্বীপ তৈরি হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য আমরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। এ ধরনের ঘটনা কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে খুবই কম ধরা পড়েছে।” উল্লেখ্য, সমুদ্রের তলায় অগ্নুৎপাতের ফলে নতুন দ্বীপ তৈরি হলেও সবসময় যে তা দীর্ঘস্থায়ী-ই হবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। ২০২০ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে লাভাগঠিত শিলাগুলি সহজে ক্ষয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে দ্বীপগুলির বয়স কখনও কয়েক মাস, বা কখনও কয়েক বছরের বেশি হয় না। আবার কিছু ক্ষেত্রে দ্বীপগুলি অনেক বেশি দিন টিকে থাকে।
গত ৮ মে সিসমোমিটারে কিছু ছোট ছোট ভূমিকম্প ধরা পড়ে বিসমার্ক সমুদ্রে। তার পরই উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে সমুদ্রের তলায় অগ্নুৎপাতের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। গত ৯ মে নাসার অ্যাকোয়া এবং টেরা কৃত্রিম উপগ্রহে ধরা পড়ে বাষ্প এবং ধোঁয়া। সমুদ্র থেকে উঠে তা বায়ুমণ্ডলে মিশছিল। অন্য দিকে নাসার পেস কৃত্রিম উপগ্রহতেও সমুদ্রের জলের রঙে কিছু পরিবর্তন ধরা প়ড়ে। যা থেকে গারভিন এবং তাঁর সঙ্গীদের অনুমান ওই অগ্নুৎপাত থেকে একটি দ্বীপ তৈরি হতে পারে বিসমার্ক সাগরে।