সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ! —ফাইল চিত্র।
যতটা ভাবা হয়েছিল, বিপদ তার চেয়েও বেশি। পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ুর অনবরত পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের জলস্তর যে ভাবে বাড়ছে, তাতে আগামী কয়েক শতকের মধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বিস্তীর্ণ উপকূলবর্তী এলাকা যে জলের তলায় চলে যেতে পারে, আগেই তা জানিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু নতুন গবেষণায় আরও বিপদের সঙ্কেত মিলল। ত্রুটি ধরা পড়়ল পুরনো সেই গণনায়। ফলে বদলে যেতে চলেছে হিসাব।
সমুদ্রের জলস্তর নিয়ে সম্প্রতি গবেষণা করেছেন ইউরোপের একদল বিজ্ঞানী। তাঁদের বক্তব্য বুধবার নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। দেখা গিয়েছে, জলস্তরের বৃদ্ধি গণনা করে যে পরিকল্পনা ছকে রাখা হয়েছিল, তাতে গলদ রয়েছে। ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই উপকূলীয় জলস্তরের উচ্চতা গড়ে এক ফুট করে কম ধরা হয়েছে। বাস্তবে জলস্তর আরও বেশি। ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার কোনও কোনও উপকূলের জলস্তর তিন ফুট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। পুরনো গণনায় এই বৃদ্ধি চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল বলে দাবি নতুন গবেষণায়।
জলস্তরের পুরনো হিসাব অনুযায়ী, চলতি শতাব্দীর শেষ দিকেই সমুদ্রের জলস্তর আরও খানিকটা বেড়ে যেতে পারে। তার ফলে জল গ্রাস করে নেবে বহু গ্রাম, শহর, বিস্তীর্ণ জনপদ। নতুন হিসাব সঠিক হলে পরিসংখ্যান আরও বদলাতে পারে। বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করছেন, নতুন হিসাবে আরও ৩৭ শতাংশ উপকূলবর্তী ভূমি সমুদ্রের তলায় চলে যাবে চলতি শতাব্দীর শেষে। তাতে বিপন্ন হবে আরও ৭ থেকে ১৩ কোটি মানুষের জীবন। নেদারল্যান্ডসের অধ্যাপক ফিলিপ মিন্ডারহুড জানিয়েছেন, সমুদ্র এবং স্থলভাগের উচ্চতা পরিমাপের পদ্ধতিতে ভুল হয়েছিল এর আগে। তাই জলস্তরের প্রকৃত উচ্চতা চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল। গলদ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘‘আগে সমুদ্র এবং উপকূলের উচ্চতা পৃথক ভাবে পরিমাপ করা হয়েছিল। কিন্তু সমুদ্র যেখানে স্থলভাগের সঙ্গে মেশে, সেখানে আরও অনেক বিষয় কাজ করে। স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে তার সবটা ধরা সম্ভব নয়।’’
সমুদ্রের ঢেউ, স্রোত, বায়ু, পরিবর্তিত তাপমাত্রা, এল নিনোর মতো বিষয়গুলি ধরে জলস্তর পরিমাপ করতে হবে, মত বিশেষজ্ঞদের একাংশের। তবেই হিসাব হবে নিখুঁত। নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। ইউরোপ বা অতলান্তিক মহাসাগরের উপকূলের চেয়ে প্রশান্ত এবং ভারত মহাসাগরের উপকূলে জলস্তর বৃদ্ধির হার বেশি। এই উপকূলবর্তী এলাকায় তুলনামূলক বেশি সংখ্যক মানুষের বাস। ইতিমধ্যে অনেক জায়গাতেই সমুদ্র এগিয়ে এসেছে। জলের পরিধি স্থলভাগে আরও বিস্তৃত হয়েছে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ভানুয়াতুর বাসিন্দা পরিবেশবিদ ভেপাইয়ামেলে ট্রিফ জানিয়েছেন, এই ধরনের গবেষণা থেকে উঠে আসা পরিসংখ্যান মিথ্যা নয়। নিজের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘‘এগুলো শুধু কাগজে লেখা কিছু হিসাব নয়। শুধু সংখ্যা নয়। এগুলো উপকূলবর্তী মানুষের বাস্তব জীবন। জলবায়ুর পরিবর্তন এবং সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধির কারণে এই মানুষগুলোর জীবন পুরোপুরি বদলে যেতে চলেছে।’’
বিজ্ঞানীদের একাংশ অবশ্য নতুন গবেষণাকে তেমন গুরুত্ব দিতে রাজি নন। তাঁরা মনে করছেন, এই গবেষকেরা বিপদ নিয়ে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি চিন্তিত। ফ্রান্সের বিজ্ঞানী গোনেরি লে কজ়ানেট বলেন, ‘‘আমার মনে হয় ওঁরা জলস্তরের প্রভাবকে অতিরঞ্জিত করছেন। সমস্যাটি আসলে আমরা সকলেই ভাল ভাবে বুঝেছি। তার সমাধানের চেষ্টাও চলছে।’’ যদিও সমাধানের চেষ্টা আরও উন্নত হতে পারে বলে মনে করেছেন গোনেরি। মার্কিন বিজ্ঞানী তথা সমুদ্রের জলস্তর বিশেষজ্ঞ রবার্ট কপও একমত। তিনি জানিয়েছেন, বেশির ভাগ উপকূলবর্তী দেশই জলস্তর বৃদ্ধি সম্পর্কে সচেতন। সেই অনুযায়ী তাঁরা পরিকল্পনাও করে রেখেছেন। ফলে এত চিন্তিত হওয়ার কারণ এই মুহূর্তে নেই।
সম্প্রতি ইউনেসকোর একটি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, সমুদ্র আসলে কতটা কার্বন শোষণ করতে পারে, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীদের বোঝার ভুল রয়েছে। যে সমস্ত মডেল এই গণনায় ব্যবহার করা হচ্ছে, তার সঙ্গে বাস্তবের অসঙ্গতি অন্তত ১০ থেকে ২০ শতাংশ। ফলে সমগ্র বিশ্বেই পরিবেশ সংক্রান্ত গণনা এবং পরিসংখ্যানের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তা নিয়ে আলোচনার মধ্যেই সমুদ্রের জলস্তর সংক্রান্ত নতুন গবেষণার ফল প্রকাশ্যে এল। এতে প্রযুক্তির ত্রুটি নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।