বিশ্বকাপ নিয়ে উচ্ছ্বাস ভারতীয় দলের। ছবি: এএফপি।
হওয়ার কথা ছিল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। কার্যত হয়ে দাঁড়াল একপেশে ম্যাচ।
আড়াই বছর আগে যে স্টেডিয়ামে বুক ভেঙেছিল এক লক্ষ দর্শকের, রবিবার সেই ক্ষতে প্রলেপ পড়ল। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে নিউ জ়িল্যান্ডকে ৯৭ রানে হারিয়ে টানা দ্বিতীয় বার ট্রফি জিতল ভারত। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসাবে এই কৃতিত্ব অর্জন করল তারা। সব মিলিয়ে তৃতীয় বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এল ভারতের ঘরে। ২০২৪-এর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ২০২৫-এর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পর ২০২৬-এ ভারতের ঘরে আবার এল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। অর্থাৎ ১১ বছরের খরা কাটার পর তিন বছরে তিনটি আইসিসি ট্রফি।
সম্প্রচারকারী চ্যানেলে ম্যাচের মাঝে বেশ কয়েক বার দেখানো হল, কতগুলি ভাষায় বিশ্বকাপ দেখানো হচ্ছে। ধারাভাষ্যকারেরা বলছিলেন, ‘ক্রিকেট ইজ় ফর এভরিওয়ান’। ক্রিকেট সকলের। সূর্যকুমার যাদব, সঞ্জু স্যামসন, অক্ষর পটেলরা বুঝিয়ে দিলেন, এই বিশ্বকাপটিও সকলের। শুধু মাঠের লাখখানেক দর্শক নয়, এই ট্রফি প্রচণ্ড ভাবে চাইছিল ১৪০ কোটি দেশবাসীও। দিনের শেষে অহমদাবাদের মাঠ, ভারতের ফাঁড়া, বিপক্ষের দুই মারকুটে ব্যাটার, বিশ্বের সেরা ব্যাটার এবং বোলারদের খারাপ ফর্ম— কিছুই ধোপে টিকল না।
এ বারের বিশ্বকাপের আগে থেকেই রোহিত শর্মার মুখ দিয়ে বলানো হচ্ছিল, ‘হিস্ট্রি রিপিট করেঙ্গে, হিস্ট্রি ডিফিট করেঙ্গে’। অর্থাৎ ২০২৪-এর মতো আবার বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এবং প্রথম আয়োজক দেশ হিসাবে বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাসকে হারানো। সেই রোহিতের সামনে দুটো কাজই করে দেখাল ভারত। সাক্ষী থাকলেন মহেন্দ্র সিংহ ধোনিও।
ম্যাচের আগে পিচ বিশ্লেষণ করতে আসার সময় ইয়ান বিশপ দেখিয়েছিলেন, এক দিকে কালো মাটি এবং এক দিকে লাল মাটি রয়েছে। যেমন মনে করা হয়েছিল, তেমনই লাল এবং কালো মাটি মেশানো পিচ তৈরি করা হয়েছিল ফাইনালের জন্য। লালের পরিমাণ ছিল বেশি। এমন পিচে টস জিতে যে কোনও অধিনায়ক চোখ বুজে ব্যাটিং নেবেন। ফাইনালের মতো ম্যাচে কে না রানের বোঝা বিপক্ষের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চায়! মিচেল স্যান্টনার করলেন ঠিক উল্টোটা। টসে জিতে প্রথমে বল করার সিদ্ধান্ত নিলেন। যুক্তি দিলেন, পিচে অল্প ঘাস রয়েছে। পেসারদের দিয়ে তিনি ভারতের টপ অর্ডারকে বিপদে ফেলতে চান। তা তো হলই না। উল্টে ভারতের ওপেনারেরা এমন ভাবে শুরু থেকে কিউয়ি বোলারদের পেটাতে লাগলেন যে কয়েক ওভার যেতে না যেতে নিশ্চিত ভাবেই হাত কামড়াতে শুরু করেছিলেন স্যান্টনার।
কিছু দিন আগেই সূর্যকুমার যাদব একটি কথা বলেছিলেন, “আপনি হয়তো পাওয়ার প্লে-তে ম্যাচ জিততে পারবেন না। কিন্তু নিশ্চিত ভাবে হেরে যেতে পারেন।” বিশ্বকাপ ফাইনালে দুই দলের ইনিংস দেখলে এর চেয়ে খাঁটি উদাহরণ আর পাওয়া সম্ভব নয়। ভারত প্রথম দু’ওভারে তুলেছিল ১২ রান। আশঙ্কা ছিল প্রথম ৬ ওভারে কত উঠবে তা নিয়ে। সঞ্জু এবং অভিষেক মিলে পরের চার ওভারে যে খেলাটা খেললেন, ওখানেই ম্যাচ থেকে অর্ধেক ছিটকে গিয়েছিল নিউ জ়িল্যান্ড। ৬ ওভারের শেষের ভারতের স্কোর ছিল ৯২/০। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাওয়ার প্লে-তে যুগ্ম সর্বোচ্চ। তা-ও আবার ফাইনাল ম্যাচে। সেখানে নিউ জ়িল্যান্ড পাওয়ার প্লে-তে তুলল ৫২ রান। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, তারা হারায় তিন-তিনটি উইকেট। সাজঘরে ফিরে যান দলের তিন সেরা অস্ত্র ফিন অ্যালেন, রাচিন রবীন্দ্র এবং গ্লেন ফিলিপস। ওখান থেকে ম্যাচ বার করা নিউ জ়িল্যান্ডের পক্ষে কার্যত অসম্ভব ছিল। অঘটন হয়ওনি।
গোটা বিশ্বকাপ জুড়েই চর্চায় ছিল তাঁর ফর্ম। মাঝে জ়িম্বাবোয়ে ম্যাচে একটি অর্ধশতরান ছাড়া অভিষেক যতটা খারাপ খেলা সম্ভব, ততটাই খারাপ খেলেছেন। কেন তাঁকে দল থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে না, তার জন্য বার বার প্রশ্ন করা হচ্ছিল সূর্যকুমার এবং গৌতম গম্ভীরকে। দু’জনেই দ্ব্যর্থহীন ভাবে তরুণ ওপেনারের পাশে ছিলেন। বলেছিলেন, অভিষেকের রানে ফেরা সময়ের অপেক্ষা। সমালোচনা, নিন্দকদের জবাব দেওয়ার জন্য আসল ম্যাচটাই বেছে নিলেন অভিষেক। তাঁর প্রতিটি ছয়, প্রতিটি চার এবং প্রতিটি উল্লাস ছিল নিন্দকদের প্রতি এক-একটি জবাব। জেকব ডাফিকে পর পর দু’টি চার মেরে শুরু। কী অবলীলায় একের পর এক শট খেললেন! লকি ফার্গুসনের মতো বোলারকে অনায়াসে পাঠিয়ে দিলেন মাঠের বাইরে। দেখে মনেই হয়নি তিনি এত দিন খারাপ ছন্দে ছিলেন। আত্মবিশ্বাস এতটাই তলানিতে ছিল যে হাত থেকে লোপ্পা ক্যাচও পড়ে যাচ্ছিল। প্রতিভাবান তাঁরাই হন যাঁরা আসল মঞ্চে জ্বলে উঠতে পারেন। অভিষেক প্রমাণ করে দিলেন, তাঁকে হিসাবের বাইরে রাখলে ভুল হবে।
গোটা ম্যাচেই স্যান্টনারের একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু ম্যাচের শুরুর দিকেই তিনি যে ভুলগুলি করলে তা ম্যাচ থেকে ছিটকে দিল নিউ জ়িল্যান্ডকে। প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে কোল ম্যাকঞ্চিকে বসানো নিয়ে। যে ভারত এমনিতেই অফস্পিনারের বিরুদ্ধে খেলতে পারছিল না, তাঁকে এ রকম গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে বসিয়ে দেওয়া হবে? নেওয়া হয়েছিল ডাফিকে। প্রথম ওভারে ম্যাট হেনরি বেশ ভাল সুইং পাচ্ছিলেন। আর একটু হলে প্রথম বলেই সঞ্জুকে ফিরিয়ে দিচ্ছিলেন। তাঁকে পরের ওভারে আনা হবে না? ডাফিকে তৃতীয় ওভারে আনলেন স্যান্টনার। ওখান থেকেই ম্যাচ ঘুরে গেল ভারতের দিকে। ডাফি দিলেন ১৫ রান। তার পরের ওভারে আরও এক নতুন বোলার আনা হল। লকি ফার্গুসন দিলেন ২৪। পঞ্চম ওভারে হেনরিকে ফেরানো হলেও তাঁর আত্মবিশ্বাস তলানিতে চলে গিয়েছিল। একের পর এক ওয়াইড দিয়ে ভারতের সুবিধা করে দিলেন। দিলেন ২১ রান। স্যান্টনারের প্রশংসা করতে হবে একটি বিষয়ে, তা হল জিমি নিশামকে বোলিংয়ে আনা। নিশাম এক ওভারে তিনটি উইকেট নেওয়ায় তবু ভারতের রান ৩০০-র কমে আটকানো গিয়েছে। না হলে ফার্গুসন, ডাফিদের লুকিয়ে রাখা যাচ্ছিল না।
১৫তম ওভারে নিশাম পর পর ফিরিয়ে দেন সঞ্জু এবং ঈশানের মতো ক্রিজ়ে জমে যাওয়া দুই ব্যাটারকে। ষষ্ঠ বলে ফিরে যান সূর্যও। এক ওভারে তিনটি উইকেট কিছু ক্ষণের জন্য হলেও ম্যাচের মুহূর্ত ঘুরিয়ে দিয়েছিল নিউ জ়িল্যান্ডের দিকে। রানের গতি এক ধাক্কায় অনেকটা কমে যায়। যে ভারত তিনশোর স্বপ্ন দেখছিল তারাই তখন ভাবছিল স্কোর আদৌ ২৩০ হবে কি না। বিশেষ করে পরের দু’টি ওভারে ডাফি এবং নিশাম কম রান দেন। সেখান থেকে শেষ ওভারে খেলা ঘুরিয়ে দেন শিবম। নিশাম তিন ওভারে দিয়েছিলেন মাত্র ২২ রান। তাঁরই ওভার থেকে শিবম নিলেন ৪,৬,৬,৪,০,৪। ২৪ রান এল শেষ ওভার থেকে। ওটাই ভারতকে ২৫০-র গন্ডি পার করে দিল।
অহমদাবাদের মোতেরা স্টেডিয়াম থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরের নাদিয়াদে তাঁর বাড়ি। ঘরের মাঠে জীবনের সবচেয়ে বড় ম্যাচটি খেলতে নেমেছিলেন অক্ষর পটেল, যিনি সতীর্থদের কাছে পরিচিত ‘বাপু’ নামে। অহমদাবাদ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করল ‘বাপু ম্যাজিক’। ২০২৩-এর এক দিনের বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলেননি অক্ষর। আগের ম্যাচে রান হজম করেছিলেন। অভিষেকের মতো ফাইনালে তিনিও যেন নেমেছিলেন সব কিছুর জবাব দিতে। দর্শকাসনে তাঁর পরিবার এবং পাড়াপড়শিদের অনেকে ছিলেন। প্রথম ওভারেই তিনি ফেরালেন অ্যালেনকে, যাঁকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তা ছিল ভারতীয় শিবিরে। পরের ওভারে তিনি ফেরালেন গ্লেন ফিলিপসকে। অক্ষরের হাত থেকে বেরোল ‘স্লাইডার’, যা বাইরের দিকে ঘোরার বদলে ঢুকে এল ভেতরে। সোজা শট খেলতে গিয়েছিলেন ফিলিপস। সম্পূর্ণ বোকা বনে গেলেন কিউয়ি ব্যাটার। বল এসে ভেঙে দিল লেগ স্টাম্প। দু’টি উইকেট নেওয়ার পরেই দর্শকাসনের দিকে তাকিয়ে বিশেষ একটি উৎসব করতে দেখা গেল অক্ষরকে। তৃতীয় উইকেটটি পেলেন তৃতীয় ওভারে। প্রথম বলেই মিচেলের ক্যাচ ফেলেন হার্দিক। তৃতীয় বলে তা পুষিয়ে দিলেন ঈশান।
তাঁকে নিয়ে আর নতুন করে কী-ই বা বলার আছে। বড় ম্যাচে জ্বলে ওঠা অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছিলেন তিনি। রবিবার তাঁর সামনে মঞ্চ তৈরিই ছিল। সেটাকে কাজে লাগালেন পুরোদমে। অহমদাবাদ বুমরাহেরও ঘরের মাঠ। বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো ম্যাচে তাঁর বোলিং ফিগার ৪-০-১৫-৪। অর্থাৎ প্রতি ওভারে চারেরও কম রান দিয়েছেন। সঙ্গে চারটি উইকেট। এর থেকে বড় পারফরম্যান্স আর কী হতে পারে!
সঞ্জু উইকেটকিপার হিসাবে খেলায় ঈশানকে সাধারণ ফিল্ডার হিসাবে খেলতে হচ্ছে প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই। উইকেটকিপারে সাধারণত আউটফিল্ডে অতটাও ক্ষিপ্র হন না। রবিবার সেটা বোঝাই গেল না ঈশানকে দেখে। এমনিতে তিনি পরিচিত ‘পকেট রকেট’ নামে। ফাইনালে তিনি পুরোদস্তুর ‘রকেট’ হিসাবেই মাঠে আবির্ভূত হলেন। ব্যাট হাতে ২৫ বলে ৫৪ রানের ইনিংস খেলেছেন। ফিল্ডিংয়েও মাতিয়ে দিলেন। প্রথমে তাঁর অসাধারণ ক্যাচে ফিরলেন রাচিন। ডিপ ব্যাকওয়ার্ড লেগে ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্যাচ নিলেন ঈশান। দ্বিতীয় ক্যাচটি সেইফার্টের। বল ধরে ভারসাম্য হারিয়েছিলেন। আকাশে বল ছুড়ে দিয়ে বাউন্ডারে ও পারে গিয়েই পর ক্ষণে এ পারে এসে সহজেই ফিরতি ক্যাচ ধরলেন। তৃতীয় ক্যাচটি ড্যারিল মিচেলের। আরও একটি ক্যাচ নিয়েছিলেন ১১তম ওভারে। বাউন্ডারির ধারে দাঁড়িয়ে মিচেলের শট লাফিয়ে তালুবন্দি করলেও ঈশানের পা ছুঁয়ে যায় দড়ি। শুধু ক্যাচই নয়, ফিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রেও পারদর্শিতা দেখিয়েছেন ঈশান।
ফাইনালের আগে ডেল স্টেন দাবি তুলেছিলেন, নিউ জ়িল্যান্ড হারলে তাঁদের ‘চোকার্স’ তকমা দেওয়া হোক। দীর্ঘ দিন এই তকমা সেঁটে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে। তা সরিয়ে দেওয়ার দাবি তুলেছিলেন স্টেন। দেখা গেল, খুব ভুল বলেননি তিনি। শেষ দশ বছরে তারা ছ’টি আইসিসি প্রতিযোগিতার ফাইনালে উঠেছে। তার মধ্যে একটি, ২০২১-এর বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল জিতেছে তারা। হারিয়েছিল ভারতকে। এ ছাড়া পাঁচ বারই হেরেছে তারা। গত বছর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ফাইনালেও ভারতের কাছেই হারতে হয়েছিল কিউয়িদের। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও তার ব্যতিক্রম হল না।