কেকেআরের বিরুদ্ধে ৫ উইকেট নেওয়ার পর উল্লাস মহসিন খানের। ছবি: পিটিআই।
অজিঙ্ক রাহানে, টিম সেইফার্ট, ক্যামেরন গ্রিন, রভম্যান পাওয়েল ও অনুকূল রায়। এই পাঁচ ক্রিকেটারের মধ্যে মিল রয়েছে। লখনউ সুপার জায়ান্টসের বিরুদ্ধে কলকাতা নাইট রাইডার্সের এই পাঁচ ব্যাটারকেই আউট করেছেন মহসিন খান। চার ওভারে ২৩ রান দিয়ে ৫ উইকেট নিয়েছেন তিনি। অথচ তিন বছর আগে তাঁর হাতটাই কেটে ফেলতে হত। কোনও রকমে জীবন রক্ষা পায় তাঁর। সেই মহসিনের হাতেই ভেঙে গেল কেকেআরের ব্যাটিং অর্ডার।
এ বারের আইপিএলে মাত্র চারটি ম্যাচ খেলেছেন মহসিন। নিয়েছেন ৯ উইকেট। ওভার প্রতি ৬.৩৭ রান দিয়েছেন। বিশেষ করে লখনউয়ের কালো মাটির উইকেটে তাঁকে ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে। গুড লেংথে বল ফেলে উইকেট নিচ্ছেন। বলের গতির হেরফের করছেন। কেকেআরের বিরুদ্ধে পাঁচটি উইকেটই বলের গতির হেরফেরে। স্পেলের শেষ দুই বলে উইকেট নিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ, পরের ম্যাচের প্রথম বলে উইকেট নিলে হ্যাটট্রিক করবেন তিনি।
টি-টোয়েন্টিতে মেডেন ওভার খুব একটা দেখা যায় না। এ বারের আইপিএলে পাঁচটি মেডেন ওভার হয়েছে। তার মধ্যে তিনটিই মহসিন করেছেন। বোঝা যাচ্ছে, তাঁর বল খেলতে কতটা সমস্যা হচ্ছে ব্যাটারদের। কিন্তু মহসিনের একটিই সমস্যা রয়েছে। বড্ড চোট পান তিনি। ১২ মাসের মধ্যে ১০ মাস চোটেই থাকেন। এ বারও শুরুর কয়েকটি ম্যাচে খেলতে পারেননি। সুস্থ হয়ে ফিরে অবশ্য ছন্দে তিনি। যেন সাজঘর থেকে তৈরি হয়ে এসেছেন।
যে হাতে কেকেআরের ব্যাটিং ভাঙলেন, সেই হাতই হয়তো থাকত না মহসিনের। শেষ হয়ে যেতে পারত ক্রিকেটজীবনও। ২০২৩ সালের আইপিএলের আগে বাঁ হাতে গুরুতর চোট পান মহসিন। চিকিৎসা শুরু করতে আর কিছু দিন দেরি হলে কেটে ফেলতে হত তাঁর বাঁ হাত। তাঁর বাঁ কাঁধে রক্ত জমাট বেঁধে গিয়েছিল। সুস্থ হওয়ার জন্য অস্ত্রোপচার করাতে হয়।
সেই সময়ের কথা নিজেই বলেছিলেন মহসিন। তিনি ধন্যবাদ দিয়েছিলেন লখনউ সুপার জায়ান্টসকে। মহসিন বলেছিলেন, ‘‘প্রার্থনা করব, আমার মতো চোট কোনও ক্রিকেটার পাবে না। আঘাত লেগে আমার ধমনীতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমার হাতের স্নায়ু সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসক আমাকে জানিয়েছিলেন, আর মাস খানেক দেরি হলে আমার বাঁ হাতটাই কেটে ফেলতে হত। সেই কঠিন সময়ে ক্রিকেট সংস্থা, গৌতম গম্ভীর স্যর, রাজীব শুক্লা স্যর, লখনউ ফ্র্যাঞ্চাইজ়ি, সঞ্জীব গোয়েঙ্কা স্যর এবং পরিবারের সকলের কাছ থেকে অনেক সাহায্য পেয়েছি।’’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘‘সুস্থ হওয়ার জন্য অস্ত্রোপচারের আগে এবং পরে আমাকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে। খুব কঠিন ছিল বিষয়টা। ভাবিনি আবার কখনও ক্রিকেট খেলতে পারব। আমি হাত তুলতে পারতাম না। হাত পুরো সোজাও করতে পারতাম না।’’
ছোটবেলায় অবশ্য বোলার নন, ব্যাটার হতে চাইতেন মহসিন। উত্তরপ্রদেশের মোরাদাবাদের বাসিন্দা মহসিনের বাবা অবসরপ্রাপ্ত সাব-ইন্সপেক্টর। বড় ছেলে ক্রিকেট খেলতেন। ছোট ছেলে মহসিন তখনও খেলা শুরু করেননি। দাদা এক দিন তাঁকে নিয়ে যান কোচ বদরুদ্দিনের কাছে। এই বদরুদ্দিনের হাত থেকেই বেরিয়েছেন মহম্মদ শামির মতো ক্রিকেটার। পোড়খাওয়া কোচ বুঝেছিলেন এই ছেলে ভাল বোলার হতে পারবে। তিনি মহসিনকে বোলিংয়ের দিকে নজর দিতে বলেন। পাশাপাশি ব্যাটিং অনুশীলনও চলতে থাকে। উত্তরপ্রদেশের হয়ে অনূর্ধ্ব-১৬ ক্রিকেটে মাত্র তিন ম্যাচে ১৭ উইকেট নেন মহসিন। কিন্তু তত দিনে তাঁর অন্য খেলার দিকে আগ্রহ জন্মেছে।
বদরুদ্দিন জানতে পারেন টেনিস বলের ক্রিকেট খেলা শুরু করেছেন মহসিন। সেখানে নাকি ব্যাটারদের সঙ্গে বাজি ধরে বল করেন তিনি। কোচ বুঝতে পারেন এই নেশা লাগলে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে মন দিতে পারবেন না মহসিন। তাঁর পরামর্শে ফের খেলায় মন দেন মহসিন। তত দিনে উত্তরপ্রদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে মহসিনের নাম ছড়িয়েছে। ২০১৮ সালে আইপিএলের নিলামে তাঁকে কেনে মুম্বই ইন্ডিয়ান্স। সে বছরই উত্তরপ্রদেশের হয়ে লিস্ট এ ক্রিকেটে অভিষেক হয় তাঁর। ২০১৯ সালে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সুযোগ পান এই বাঁ হাতি পেসার।
আইপিএলে মুম্বই কিনলেও প্রথম একাদশে সুযোগ পাননি মহসিন। হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। বাধ্য হয়ে ফোন করে বসেন কোচকে। সব কথা শুনে বদরুদ্দিন তাঁকে পরামর্শ দেন জাহির খান ও লাসিথ মালিঙ্গার সঙ্গে কথা বলতে। তাঁদের কাছ থেকে যতটা সম্ভব শিখতে। ঠিক যে ভাবে শিখেছিলেন তাঁর আর এক ছাত্র। কলকাতা নাইট রাইডার্স কিনলেও প্রথম দু’বছর আইপিএলে খেলার সুযোগ পাননি শামি। কিন্তু ওয়াসিম আক্রমের কাছে শিখেছিলেন খুঁটিনাটি। সেই শিক্ষা তাঁকে ভারতীয় দলের অন্যতম সেরা পেসার তৈরি করেছে।
কোভিডের কারণে লকডাউন হওয়ায় খেলা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সেই লকডাউন আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেয় মহসিনের কাছে। আমরোহাতে নিজের বাড়ির কাছে পিচ বানিয়ে অনুশীলন করছিলেন শামি। সেখানে তিনি মহসিনকে ডেকে নেন। দু’জনে মিলে বেশ কয়েক মাস অনুশীলন করেন। বদরুদ্দিন তখন মহসিনকে বলেছিলেন, শামির কাছ থেকে যতটা সম্ভব শিখে নিতে। সেটাই করেন মহসিন। তরুণ পেসারের প্রতিভায় মুগ্ধ শামিও জানান, মহসিন এক দিন তাঁর থেকেও ভাল বোলার হবেন। খুব ভুল কথা বলেননি শামি। রবিবার তাঁর থেকে অনেক ভাল বল করলেন মহসিন।