১০ দলের অধিনায়কের মাঝে আইপিএলের ট্রফি। ছবি: এক্স।
সাদা বলের ক্রিকেটে ভারতের দাপট এখন স্বীকৃত। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) আর্থিক সামর্থ্যে নয়। বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, জসপ্রীত বুমরাহ, শুভমন গিল, সূর্যকুমার যাদবদের ক্রিকেটীয় দক্ষতা এবং সাফল্যে প্রতিষ্ঠিত দাপট। হরমনপ্রীত কৌর, স্মৃতি মন্ধানাদের অবদানও অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
টানা দু’বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছে ভারত। গত বছর এসেছে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। ছেলেরা টানা তিন বছর তিনটি আইসিসি ট্রফি জেতার মাঝে প্রথম বার এক দিনের ক্রিকেট চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন হরমনপ্রীত, মন্ধানারা। সাফল্য আরও রয়েছে। পুরুষ এবং মহিলা দু’বিভাগেই অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ভারত।
বিশ্ব পর্যায়ে ভারতীয় ক্রিকেটের এই সাফল্য প্রত্যাশা বাড়িয়েছে ক্রিকেটপ্রেমীদের। দ্বিপাক্ষিক সিরিজ় বা বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতায় প্রত্যাশা বাড়িয়েছে। প্রত্যাশা বেড়েছে আইপিএল ঘিরেও। ভারতীয় দলের ক্রিকেটারদের মতো ক্রিকেটপ্রেমীরাও ভাগ হয়ে যান বিভিন্ন দলে। দিল্লি, কলকাতা, মুম্বই, চেন্নাই, বেঙ্গালুরুর মতো শহরগুলি ভাগাভাগি করে নেয় সমর্থন। তাতে প্রত্যাশার চাপ কমে না। বরং বাড়ে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে জয়ের জন্য ক্রিকেটপ্রেমীরা যদি সাত-আট জনের দিকে তাকিয়ে থাকেন, আইপিএলে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় তিন-চারে। আবার সারা বছর যাঁদের উপর প্রত্যাশার তেমন চাপ থাকে না, আইপিএলে তাঁদের দিকেও তাকিয়ে থাকেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। আবার গোটা বছর ভক্তেরা যে ক্রিকেটারদের সাফল্য চান, আইপিএলের আড়াই মাস তাঁদেরই কারও কারও সাফল্য চান না তাঁরা। বা সংশ্লিষ্ট ক্রিকেটারের সাফল্য চাইলেও তাঁর দলের চান না!
আইপিএল ভারতীয় ক্রিকেটের মহাকুম্ভ। উত্তরণের সন্ধানে এক মঞ্চে মিলিত হন সকলে। কেউ ক্রিকেটজীবনের উত্তরণ চান। কেউ দলের, কেউ ব্যবসার, কেউ কোচিংজীবনের বা কেউ ক্রিকেটপ্রেমী হিসাবে। সারাবছর যাঁরা ক্রিকেটের খবর রাখেন না, তাঁদের অনেকে আইপিএল দেখতে মাঠে যান। এ জন্য খেলার নিয়ম জানা বা বোঝা বাধ্যতামূলক নয়। ক্রিকেটারদের চেনাও জরুরি নয়। গ্যালারিতে বসে আইপিএলের ম্যাচ দেখার ছবি সমাজমাধ্যমে পোস্ট করলে সামাজিক উত্তরণের একটা শ্লাঘা অনুভব করেন অনেকে।
উত্তরণ হয়ে চলেছে আইপিএলেরও। বিশ্বের দ্বিতীয় ধনীতম ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এখন আইপিএল। আমেরিকার ন্যাশনাল ফুটবল লিগের ঠিক পরে। এনবিএ, এমএলবি, ইপিএল, এনএইচএল, বুন্দেশলিগা, লা লিগা— সব পিছনে। অথচ বয়সের দিক থেকে আইপিএল এদের মধ্যে সবচেয়ে নবীন। শুরু ২০০৮ সালে। গত মরসুমে সবে সাবালক হয়েছে। এ বার ১৯তম মরসুম। আইপিএলের এই উত্তরণের স্বাদ চাইছেন আমেরিকা, ইউরোপের ধনকুবেররাও। প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকায় রাজস্থান রয়্যালস এবং প্রায় ১৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর মালিকানা বিক্রিই প্রমাণ। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছেন আমেরিকার একাধিক খ্যাতনামী ব্যবসায়ী।
আইপিএল শুধু ক্রিকেট নয়, ক্রিকেট অর্থনীতি। ভারতীয় এবং বিশ্বক্রিকেটের অর্থভান্ডার। ভারতীয় দলের সাপ্লাই লাইন। বিশ্ব খেলাধুলোর মানচিত্রে ভারতের গর্বের উপস্থিতি। ঐতিহ্য বা ইতিহাস সমৃদ্ধ না হলেও উজ্জ্বল। যে ঔজ্জ্বল্য তাক লাগিয়ে দিচ্ছে গোটা বিশ্বকে। এক বছর অপেক্ষার পর শনিবার এই আইপিএলের উদ্বোধন। না উদ্বোধন হবে না! গত বছর ৪ জুন বেঙ্গালুরু প্রথম বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার উৎসব চলাকালীন পদপিষ্ট হয়ে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এ বছরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিসিআই। আইপিএলের জৌলুস তাতে একটুও কমছে না। বরং ক্রিকেট-জনতা সরাসরি ২২ গজের লড়াইয়ে ঢুকে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা, পরিজনদের প্রতি সমবেদনার আড়ালে লুকিয়ে থাকবে উত্তেজনা, উন্মাদনা। প্রতিযোগিতা যত এগোবে তত উত্তরণ ঘটবে ক্রিকেটপ্রেমীদের উত্তেজনা, উন্মাদনারও। আগামী ৩১ মে ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের একাংশের উত্তেজনার বিস্ফোরণ ঘটবে।
এ বারের আইপিএলে দলের সংখ্যা ১০ই থাকছে। তবে ম্যাচের সংখ্যা ৭৪ থেকে বেড়ে হচ্ছে ৮৪। ‘কিং সাইজ়’ আইপিএল। ১৩টি শহরে হবে ম্যাচগুলি। বেঙ্গালুরু, রাজস্থান এবং পঞ্জাব কিংস একাধিক মাঠে হোম ম্যাচ খেলবে। আইপিএলের ম্যাচই শুধু বাড়ছে না, বাড়ছে আয়োজনের পরিসরও। এও এক উত্তরণ।