ICC T20 World Cup 2026

মন্দিরের চাতালে শুরু ক্রিকেট, রেকর্ড গড়া শতরানে পেল পূর্ণতা! বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার ভরসা মাঠকর্মী-ফুল বিক্রেতার সন্তান নিসঙ্ক

সিংহলি ভাষায় পাথুম নিসঙ্কের নামের অর্থ ‘আশা।’ তিনি শুধু আশা নন, চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার ভরসা হয়ে উঠেছেন।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৫৮
cricket

শ্রীলঙ্কাকে জিতিয়ে উঠে পাথুম নিসঙ্ক। ছবি: এএফপি।

বাড়িটা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলেন না প্রদীপ নিশান্ত। সুনামি-বিধ্বস্ত মানুষদের জন্য সরকারের তৈরি করে দেওয়া ছোট ছোট বাড়িগুলির মধ্যে কোনটা যে সেই ছেলেটার বাড়ি তা বুঝতে পারছিলেন না কলম্বোর এক স্কুলের ক্রিকেট কোচ। শুনেছিলেন, ছেলেটা নাকি কালুতারা বোদিয়া মন্দিরের চাতালে সারাদিন খেলে বেড়ায়। অগত্যা সেখানেই পৌঁছে যান নিশান্ত। তাঁর স্কুলের জন্য ছেলেটাকে সই করান। ১৭ বছর পর সেই ছেলেটির ব্যাটেই যে শ্রীলঙ্কা বিশ্বকাপের সুপার এইটে উঠবে তা অবশ্য ভাবেননি প্রশান্ত। কিন্তু সে দিন সেই মন্দিরের সিঁড়িতেই এক প্রতিভাকে খুঁজে নিয়েছিলেন তিনি। পাথুম নিসঙ্ক। সোমবারের পর ক্রিকেটবিশ্বে এই নামটা আর কেউ ভুলবে না।

Advertisement

সিংহলি ভাষায় পাথুম নিসঙ্কের নামের অর্থ ‘আশা।’ তিনি শুধু আশা নন, চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার ভরসা হয়ে উঠেছেন। অথচ এই ভরসা তিনি হয়ে উঠতেই পারতেন না, যদি না প্রদীপ তাঁর পিছনে পড়ে থাকতেন। কালুতারা বোদিয়ার চাতালে ক্রিকেট শুরু নিসঙ্কের। দরিদ্র পরিবারের সন্তান। বাবা কালুতারা ক্রিকেট মাঠে কাজ করতেন। পিচে জল দিতেন। মাঠের ঘাস ঠিক আছে কি না দেখতেন। তবে সেই মাঠে খেলার সুযোগ তাঁর ছেলের ছিল না। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, এক দিন তাঁর ছেলেও ক্রিকেটার হবে। স্বামীর রোজগার কম হওয়ায় তাঁকে সাহায্য করতেন নিসঙ্কের মা-ও। কালুতারা বোদিয়া মন্দিরের বাইরে ফুল বিক্রি করতেন তিনি।

নিসঙ্ক ও তাঁর বাবার সঙ্গে দেখা করার আগেই কাগজপত্র তৈরি করে ফেলেছিলেন প্রদীপ। মন্দিরের সিঁড়িতেই তাঁর স্কুলের জন্য নিসঙ্ককে সই করান তিনি। প্রদীপ সে দিন নিসঙ্ককে বলেছিলেন, “জানি না, মন্দিরের বাইরে আর কোনও বাচ্চা এ ভাবে কোনও স্কুলের ক্রিকেট দলে সই করেছে কি না। তবে এর থেকে বড় আশীর্বাদ তুমি আর পাবে না। তোমার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।” ১৭ বছর পর নিজের সেই ভবিষ্যদ্বাণী মিলে যেতে দেখে কী ভাবছেন প্রদীপ?

তার পরেও লড়াইটা সহজ ছিল না। নিসঙ্কের ক্রিকেটের খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন প্রদীপ। কিন্তু তত দিনে তিনি বুঝে গিয়েছেন, এই ছেলে তারকা হবে। তাই বন্ধু নীলন্থের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। প্রদীপ যখন নিসঙ্ককে সই করাতে গিয়েছিলেন, তখনও সঙ্গে ছিলেন নীলন্থ। একটি ফুল সরবরাহকারী সংস্থায় কাজ করতেন নীলন্থ। সেখানে সাহায্য চান তিনি। মালিক রাজিও হয়ে যান। সেখান প্রতি মাসে কিছু টাকা নিসঙ্ককে দেওয়া হত। নিসঙ্ক যখন শ্রীলঙ্কার হয়ে প্রথম বার ওয়েস্ট ইন্ডিজ় সফরে যাচ্ছেন, তখন তাঁর হাতে আড়াই লক্ষ টাকা তুলে দেয় সেই সংস্থা। অভিষেক টেস্টেই শতরান করেন নিসঙ্ক।

শ্রীলঙ্কার হয়ে পাঁচ বছর ধরে খেলছেন নিসঙ্ক। ১৮ টেস্টে ১৩০৫ রান, ৭৭ এক দিনের ম্যাচে ১৮২৯ রান ও ৮৭ টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ২৫৭৪ রান করেছেন তিনি। তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ১৩টি শতরান ও ৪৩টি অর্ধশতরান রয়েছে এই ডানহাতি ব্যাটারের। শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ বলা হচ্ছে তাঁকে। সোমবার তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, পাঁচ বছর ধরে খেললেও এত দিনে বিশ্বক্রিকেটে আবির্ভাব হয়েছে তাঁর।

অচেনা এক ছেলের জন্য টাকা দিয়েছে যে সংস্থা, নিজের কেরিয়ারের কথা না ভেবে সারা দিন পড়ে থেকেছেন যে কোচ, সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সব রকম চেষ্টা করেছে দিন আনি দিন খাই যে পরিবার, সব স্বপ্ন সত্যি হয়েছে সোমবার। মাঠকর্মী-ফুল বিক্রেতার সন্তান চলতি বিশ্বকাপের প্রথম শতরান করেছেন। রেকর্ড গড়েছেন নিসঙ্ক। তিনিই প্রথম ব্যাটার যিনি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে শতরান করেছেন। শ্রীলঙ্কার হয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দ্রুততম শতরান (৫২ বলে) তাঁর। গত বছর এশিয়া কাপে ভারতের বিরুদ্ধেও ৫২ বলে শতরান করেছিলেন নিসঙ্ক। সেই ম্যাচ জেতাতে পারেননি। আউট হয়ে গিয়েছিলেন। এ বার জিতিয়েছেন। দলকে সুপার এইটে তুলে মাঠ ছেড়েছেন।

অস্ট্রেলিয়া তাঁকে থামানোর সব চেষ্টা করেছে। কিন্তু পারেনি। ১০ চার, পাঁচ ছক্কার ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার সব পরিকল্পনা ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছেন তিনি। ১৭ বছর পর বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছে শ্রীলঙ্কা। ম্যাচ শেষে নিসঙ্ক বলেছেন, “উইকেট খুব ভাল ছিল। আমি নিজের স্বাভাবিক খেলা খেলেছি।” স্বাভাবিক খেলা। যেন বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো অন্য কোনও ম্যাচের মতোই। আসলে যিনি জীবনের যুদ্ধে জিতেছেন, তাঁর কাছে এই লড়াই তো স্বাভাবিক মনে হবেই।

নিসঙ্গ কী পরিকল্পনা করে খেলছিলেন? তিনি বলেছেন, “কুশল মেন্ডিসের সঙ্গে ভাল জুটি গড়ার চেষ্টা করেছি। সেটা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত থাকতে চেয়েছিলাম। নিজের পছন্দের জায়গায় বল আসার অপেক্ষা করছিলাম। বেশ কিছু বল ভাল জায়গায় পেয়েছি। সেগুলো কাজে লাগিয়েছি।” বলের জন্য অপেক্ষা! এই অপেক্ষার শিক্ষাই তো ছোট থেকে তিনি পেয়েছেন। ফুল বিক্রেতা মা, মাঠকর্মী বাবা, স্কুলের দলের কোচ, কঠিন সময়ে পাশে থাকা সংস্থার কাছে অপেক্ষার শিক্ষা পেয়েছেন। ক্রিকেটবিশ্বের নজরে পড়ার অপেক্ষা তো তিনি এত বছর ধরে করছেন। তাঁর কাছে খারাপ বলের অপেক্ষা আর কী কঠিন।

সোমবার পাল্লেকেলে স্টেডিয়ামে শতরানের পরেও বিশেষ উচ্ছ্বাস দেখাননি তিনি। দু’দিকে হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়েছেন। এক বার আকাশের দিকে তাকিয়েছেন। তাঁকে ঘিরে তখন গোটা মাঠে উল্লাসে মেতেছেন শ্রীলঙ্কার সমর্থকেরা। জয়ের উল্লাস শুরু হয়ে গিয়েছে ডাগ আউটেও। তখন হয়তো নিসঙ্ক ভাবছিলেন, কালুতারা বোদিয়া মন্দিরের সেই সিঁড়ি, সেই চাতালের কথা। যেখানে শুরু হয়েছিল তাঁর ক্রিকেট। ১৭ বছর পর তা পূর্ণতা পেয়েছে। সে দিন এক আশা, এক বিশ্বাস থেকে তাঁকে সই করিয়েছিলেন প্রদীপ। আর আজ তিনি বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার ভরসা হয়ে উঠেছেন।

Advertisement
আরও পড়ুন