ICC T20 World Cup 2026

দুধের শিশুদেরও অলআউট করতে পারেননি বুমরাহ-বরুণেরা! ব্যাটিং-উদ্বেগ কাটিয়ে রবি ইডেনে ভারতের চিন্তা ‘বিশ্বসেরা’ বোলিং

ভারতের বিরুদ্ধে শেষ ১০ ওভারে জ়িম্বাবোয়ে ১১৮ রান তুলেছে। শেষ তিনটি ম্যাচে ভারত ওভারপ্রতি ৯ রানের বেশি দিয়েছে। কোনও বোলারই নিজের চার ওভারে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে পারছেন না।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৫
picture of cricket

(বাঁ দিক থেকে) জসপ্রীত বুমরাহ, গৌতম গম্ভীর এবং বরুণ চক্রবর্তী। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

ম্যাচ জেতায় ব্যাটারেরা। প্রতিযোগিতা জেতায় বোলারেরা।

Advertisement

গত বছর আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জেতার পর নভজ্যোৎ সিংহ সিধুকে বলেছিলেন গৌতম গম্ভীর। ভারতীয় দলের কোচ এই বিশ্বাসের কথা আগেও বলেছেন। ক্রিকেটের সঙ্গে যাঁদের যোগযোগ রয়েছে, তাঁরাও অনেকে এ কথা মানেন।

কেন বোলিং নিয়ে উদ্বেগ

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের অভিযান কি তবে রবিবার ইডেনেই শেষ হয়ে যাবে? প্রশ্ন উঠছে, কারণ, দলকে উদ্বেগে রেখেছেন বোলারেরা। শেষ তিনটি ম্যাচে ভারতের বিরুদ্ধে বিপক্ষ দলগুলি ২০০-র কাছাকাছি রান করেছে। এর মধ্যে নেদারল্যান্ডস এবং জ়িম্বাবোয়ের মতো দু’টি দেশও রয়েছে।

ভারতের বিরুদ্ধে জ়িম্বাবোয়ে ২০ ওভারে ১৮৪ রান করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা করেছে ১৮৭ রান। তার আগে নেদারল্যান্ডসও করেছে ১৭৬ রান। শেষ তিন ম্যাচে ৬০ ওভারে ভারতীয় বোলারেরা খরচ করেছেন ৫৪৭ রান। ওভারপ্রতি দিয়েছেন ৯.১১ রান। এই ৬০ ওভারে উইকেট এসেছে ২০টি। অর্থাৎ, দুই-তৃতীয়াংশ উইকেট নিতে পেরেছেন ভারতীয় বোলারেরা। প্রতিটি উইকেটের জন্য ভারত খরচ করেছে ২৭.৩৫ রান। বোলারদের এই পারফরম্যান্স চ্যাম্পিয়ন দল-সুলভ নয়।

উদ্বিগ্ন খোদ অধিনায়ক

জসপ্রীত বুমরাহ, অর্শদীপ সিংহ, বরুণ চক্রবর্তী, অক্ষর পটেল, হার্দিক পাণ্ড্যেরা কি পারছেন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ম্যাচ জেতাতে? এঁদের মধ্যে বরুণ আইসিসি-র বিচারে এখন বিশ্বসেরা! বৃহস্পতিবার জ়িম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে ভারতের একপেশে জয়ের পর বোলিং নিয়ে আক্ষেপ শোনা গিয়েছে সূর্যকুমার যাদবের মুখে। ভারতীয় দলের অধিনায়ক বলেছেন, ‘‘আমাদের বোলারদের আরও নিয়ন্ত্রিত বল করতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে আমাদের মাথা কাজে লাগাতে হবে।’’ সূর্য জানাতে ভোলেননি, বোলারদের পারফরম্যান্স কখনও কখনও তাঁর বিরক্তির কারণও হয়েছে। জ়িম্বাবোয়ে শেষ ১০ ওভারে ১১৮ রান তোলায় খুশি নন তিনি।

না-হওয়ারই কথা। বৃহস্পতিবার ভারতীয় দলের লক্ষ্য শুধু ম্যাচ জেতা ছিল না। আসল লক্ষ্য ছিল, বিশ্বকাপে টিকে থাকা। আগামী রবিবার একই লক্ষ্য নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে খেলতে নামবেন গত বারের চ্যাম্পিয়নেরা। ইডেন গার্ডেন্সে জিতলে ট্রফির লড়াইয়ের আরও কাছাকাছি পৌঁছোনো যাবে। না হলে, কলকাতা থেকেই বাড়ি ফেরার বিমান ধরতে হবে গম্ভীরদের।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের এই দলে রয়েছেন ব্র্যান্ডন কিং, শাই হোপ, শিমরন হেটমায়ার, রভম্যান পাওয়েল, রোস্টন চেজ, শারফেন রাদারফোর্ড, জেসন হোল্ডারেরা। যাঁরা সারা বছর বিভিন্ন দেশ ঘুরে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট খেলেন। যে দিন যাঁর ব্যাটে-বলে হয়, সে দিন তিনি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন। বিশ্বকাপে ক্যারিবিয়ান ব্যাটিং লাইন আপ নিঃসন্দেহে বিপজ্জনক। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপের মরণ-বাঁচন ম্যাচের আগে স্বাভাবিক ভাবেই উদ্বেগে অধিনায়ক। কোচ গম্ভীরও।

বোলারদের কাটাছেঁড়া

বুমরাহ, অর্শদীপ, বরুণ, অক্ষর, হার্দিকদের নিয়ে তৈরি বোলিং আক্রমণ হেলাফেলা করার মতো নয়। প্রথম একাদশে জায়গা হচ্ছে না মহম্মদ সিরাজ, কুলদীপ যাদবের মতো বোলারের। বুমরাহ এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা জোরে বোলার। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অন্যতম সেরা জোরে বোলার অর্শদীপ। ভারতের সফলতমও। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বিশ্বের অন্যতম সেরা স্পিনার বরুণ। হার্দিক, অক্ষর বল হাতে যে কোনও সময় প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করে দিতে পারেন। এমন বোলিং আক্রমণ নিয়েও উদ্বেগে সূর্য।

বোলার শিবম দুবের কথা যত কম বলা যায় তত ভাল। জ়িম্বাবোয়ের বিরুদ্ধেও ২ ওভারে ৪৬ রান দিয়েছেন। দেখে মনে হচ্ছে, মূলত ওয়াইড বল করছেন। দু’-একটা বল সঠিক লাইনে পড়ে যাচ্ছে! কিন্তু বাকিরা? মার খেয়েছেন সকলে। ধারাবাহিকতার অভাব দেখা যাচ্ছে। নিজেদের চার ওভারই ব্যাটারদের চাপে রাখতে পারছেন না কেউ। সকলে একসঙ্গে ভাল বল করতে পারছেন না। বুমরাহ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ৫টি ম্যাচ খেলে ৭টি উইকেট নিয়েছেন। অর্শদীপের ৫ ম্যাচে ৮ উইকেট। অক্ষরের ৪ ম্যাচে ৭ উইকেট। হার্দিকের ৬ ম্যাচে ৫ উইকেট। সফলতম বরুণের ৬ ম্যাচে ১১ উইকেট।

বোলারেরা কি উদ্বিগ্ন?

অর্শদীপের কথায় অন্তত মনে হয়নি। জ়িম্বাবোয়ে ম্যাচের পর তিনি বলেছেন, ‘‘আমাদের ব্যাটারেরা ব্যাটিং উপভোগ করছে। ভাল রান করছে। ওরা রান করায় আমরা খুব খুশি। বোর্ডে ভাল রান থাকলে বল করা সহজ হয়। গত দু’বছর ধরে আমরা এ ভাবেই খেলার চেষ্টা করছি। প্রচুর রান তুলে ডিফেন্ড করার চেষ্টা করছি।’’ ভারতের সফলতম টি-টোয়েন্টি বোলার হয়তো চাইছেন, ব্যাটারেরা বড় রান তুলে চাপে ফেলুন প্রতিপক্ষকে। প্রতিপক্ষের ক্ষমতার বেশি রান তুললে চিন্তা কী!

গা-ছাড়া এই মনোভাবের ভিতর লুকিয়ে থাকতে পারে অশনিসঙ্কেত। বৃহস্পতিবার খেলা শেষ হওয়ার পর দুবে এবং হার্দিককে নিয়ে অনুশীলন করাতে নেমে পড়েছিলেন বোলিং কোচ মর্নি মর্কেল। সূর্যের সঙ্কেত পড়তে পারছেন গম্ভীর এবং তাঁর সাপোর্ট স্টাফেরা। পড়তে হবে বোলারদেরও। হাতে প্রস্তুতির সময় তেমন নেই। বিশ্বকাপের দুটো ম্যাচের মধ্যে ব্যবধান থাকছে দু’-তিন দিনের। তার এক দিন চলে যায় সফর এবং রিকভারিতে। টানা ম্যাচের মধ্যে কঠোর অনুশীলন করানোও সম্ভব নয় সব সময়। ক্রিকেটারদের শারীরিক চাপ, চোট-আঘাত লাগার সম্ভাবনার বিষয়গুলি মাথায় রাখতে হয়।

ম্যাচের পর হার্দিক, দুবেকে অনুশীলন করতে দেখে সুনীল গাওস্কর বলেছেন, ‘‘ম্যাচের পরই মর্কেল ওদের অনুশীলন শুরু করাল। তার মানে জ়িম্বাবোয়ে ম্যাচ নিয়ে ভারতীয় শিবির আর ভাবছে না। ওরা এগোতে চাইছে। উন্নতি করতে চাইছে। দুটো ম্যাচের মাঝে ৭২ ঘণ্টা সময়। তবু যতটা সম্ভব পরিশ্রম করছে। এটা ভাল দিক। সূর্যের বোলিং নিয়ে বার্তাও স্পষ্ট।’’

শুরুতে চিন্তা ছিল ব্যাটিং, এখন বোলিং

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শুরুতে ভারতীয় শিবিরের চিন্তা ছিল ব্যাটিং। অভিষেক শর্মা শূন্যের হ্যাটট্রিক করেছেন। বাকি ব্যাটারেরাও ধারাবাহিক ছিলেন না। কোনও ম্যাচে ঈশান কিশন, কোনও ম্যাচে সূর্য বা হার্দিক বাঁচিয়ে দিয়েছেন। সেই উদ্বেগ কেটেছে। সকলে কম-বেশি রান করছেন। নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বোলিং নিয়ে।

বাংলার প্রাক্তন অধিনায়ক সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বিষয়টাকে উদ্বেগজনক বলছেন না। যদিও তিনি মনে করেন, বোলিং আরও ভাল হওয়া দরকার। তিনি বলেছেন, ‘‘ভারতের যা বোলিং শক্তি, তাতে আরও ভাল পারফরম্যান্স হওয়া উচিত। বোলিংয়ে আরও নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। মূল দায়িত্ব নিতে হবে বুমরাহ এবং বরুণকে। অর্শদীপ, অক্ষর, হার্দিকেরাও রয়েছে। এখন ভারতের কাছে সব ম্যাচ নক আউট। অল আউট খেলতে হবে। তবে দুবেকে নিয়ে ভাবতে হবে। ও প্রতিপক্ষকে লড়াইয়ে ফেরার সুযোগ করে দিচ্ছে।’’

বাংলার প্রাক্তন বোলার শিবশঙ্কর পালের বক্তব্য, ‘‘ভারতের বোলিং যথেষ্ট ভাল এবং অভিজ্ঞ। বিশ্বকাপের এই পর্যায়ে আর একটু শৃঙ্খলা প্রয়োজন। দক্ষিণ আফ্রিকার বোলারেরা ভাল স্লোয়ার, ইয়র্কার ব্যবহার করছে। লেংথ বদল করছে। ভারতীয়েরাও সে রকম ভাবতে পারে। একটু বৈচিত্র দরকার। কারণ ভারতের পিচগুলো ব্যাটিং সহায়ক। চিন্তার কিছু না থাকলেও উন্নতির সুযোগ সব সময় রয়েছে। আর টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে রান হবেই। কেউ বলতে পারে না, একটা ওভারেও ১৪-১৫ রানে দেবে না। এ নিয়ে ভাবার কিছু নেই।’’

প্রতিযোগিতা যত এগোয়, লড়াই তত কঠিন হয়। শেষ দিকে ছোট ভুলেরও বড় মাসুল দিতে হতে পারে। এখনই সতর্ক হওয়া দরকার। হয়তো সে কারণেই বোলারদের বার্তা দিয়েছেন সূর্য।

Advertisement
আরও পড়ুন