কলকাতা ডার্বির একটি মুহূর্ত। ছবি: এক্স।
এই জন্যই বলা হয়, খেলা শেষ হওয়ার আগে উল্লাস করতে নেই। ৮৪ মিনিটের মাথায় এডমুন্ডের গোলের পর ইস্টবেঙ্গলের উল্লাস দেখে মনে হচ্ছিল, খেলা জিতে গিয়েছে তারা। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে মনঃসংযোগ ভাঙল তাদের। সেই সুযোগে ৯০ মিনিটের মাথায় জেসন কামিংসে গোল করে সমতা ফেরালেন। শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলে ড্র হল খেলা। এই ড্রয়ের ফলে অবশ্য ভাল জায়গায় ইস্টবেঙ্গল। শেষ ম্যাচে ইন্টার কাশীকে হারালেই প্রথম বারের জন্য আইএসএল চ্যাম্পিয়ন হবে তারা। অন্য দিকে মোহনবাগানের নিজেদের হাতে সবটা নেই। স্পোর্টিং দিল্লিকে হারালেও ইস্টবেঙ্গল ম্যাচের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে তাদের। ইস্টবেঙ্গল পয়েন্ট নষ্ট করলে তবেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ থাকবে মোহনবাগানের।
তবে যা খেলা হয়েছে, তাতে ১-১ ফল হওয়া উচিত ছিল না। দু’দলই অন্তত পাঁচটি করে গোল করতে পারত। বেশি ভাল সুযোগ পেয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। কিন্তু তা কাজে লাগাতে পারল না তারা। কিছু ক্ষেত্রে দু’দলের গোলরক্ষক পরিত্রাতা হলেন। আবার কিছু ক্ষেত্রে বল একটুর জন্য পোস্টের বাইরে গেল।
খেলার শুরুতে মোহনবাগানের প্রয়াত প্রাক্তন সভাপতি স্বপনসাধন (টুটু) বসুর স্মৃতিতে নীরবতা পালন করেন দু’দলের ফুটবলারেরা। খেলার শুরু থেকে আক্রমণ করতে শুরু করে মোহনবাগান। শুরুতে কর্নারও পায় তারা। লিস্টন কোলাসোর ক্রসে ভাল করে মাথা ছোঁয়াতে পারেননি টম অলড্রেড। বল বারের উপর দিয়ে বেরিয়ে যায়। তার পরেই আবার এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় বাগান। লাল-হলুদের ফুটবলারের কাছ থেকে বল কেড়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন শুভাশিস বসু। পাস দিয়েছিলেন সাহাল আব্দুল সামাদকে। সাহাল শট মারার আগেই ইস্টবেঙ্গলের এক ফুটবলার বল ক্লিয়ার করে দেন। দেরি করে ফেলেন সাহাল।
মোহনবাগানের প্রাথমিক আক্রমণ সামলে ধীরে ধীরে আক্রমণে উঠতে শুরু করে ইস্টবেঙ্গল। ১৫ মিনিটের মাথায় প্রথম সুযোগ পায় তারা। বক্সের বাইরে থেকে অ্যান্টন সোজবার্গের বাঁ পায়ের শট পোস্টে লেগে বেরিয়ে যায়। ইস্টবেঙ্গলের মাঝমাঠে ভরসা জোগাচ্ছিলেন পিভি বিষ্ণু। দ্রুত আক্রমণ করছিলেন তিনি। ফলে সুযোগও পায় লাল-হলুদ। যে সুযোগটি নষ্ট করলেন বিপিন সিংহ তা সহজে ভুলতে পারবেন না। জিকসন সিংহের কাছ থেকে থ্রু বল পেয়েছিলেন। সামনে স্রেফ একা গোলরক্ষক বিশাল কাইথ ছিলেন। বেশি সময় নিয়ে এবং বেশি কাটাতে গিয়ে গোলে শটই নিতে পারলেন না বিপিন। ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে বল বেরিয়ে যায়।
আক্রমণ, প্রতি-আক্রমণের খেলা চলছিল। দু’দলের খেলা দেখে বোঝা যাচ্ছিল, জয়ের জন্য খেলছে তারা। ফলে দু’দলই সুযোগ পাচ্ছিল। ২৮ মিনিটের মাথায় বক্সের বাইরে থেকে অনিরুদ্ধ থাপার জোরালো শট বাঁচান প্রভসুখন সিংহ। ৩৬ মিনিটে মাথায় মাঝমাঠ থেকে দু’-তিন জনকে কাটিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়েছিলেন লিস্টন। তবে বক্সের বাইরে থেকে মারা শট গোলের অনেকটা বাইরে দিয়ে বেরিয়ে যায়।
৩৭ মিনিটের মাথায় আরও একটি সুযোগ নষ্ট করে ইস্টবেঙ্গল। মিগুয়েল দুর্দান্ত পাস বাড়িয়েছিলেন। সোজবার্গের সামনে বিশাল ছাড়া কেউ ছিলেন না। বল নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বিশালের হাতেই তা তুলে দিলেন সোজবার্গ। এমন সুযোগ ডার্বিতে বার বার পাওয়া যাবে না। হতাশায় মাথায় হাত পড়ে কোচ অস্কারের। প্রথমার্ধে আর গোল হয়নি। গোলশূন্য অবস্থায় বিরতিতে যায় দু’দল।
প্রথমার্ধে সহজ সুযোগ ইস্টবেঙ্গল বেশি নষ্ট করলেও বলের দখল বেশি ছিল মোহনবাগানের। দ্বিতীয়ার্ধে ছবিটা বদলে যায়। শুরু থেকে আক্রমণে উঠতে শুরু করে ইস্টবেঙ্গল। শুরুতে গোলও পেয়ে যেত তারা। শুভাশিস বসুর ভুলে বক্সের মধ্যে বল পেয়েছিলেন বিপিন। সামনে গোলরক্ষক বিশাল ছাড়া কেউ ছিল না। বিপিনের শট বারের উপর দিয়ে চলে যায়।
গুরুত্বপূর্ণ এই ডার্বি দেখতে যুবভারতীতে দুই প্রধানের ৬২,২০১ সমর্থক ভিড় করেছিলেন। ফলে চিৎকারে কান পাতা দায় হচ্ছিল। ৫৯ মিনিটের মাথায় ফ্রি কিক পায় বাগান। ভাল শট মারেন লিস্টন। কিন্তু তা গোলের মধ্যে ছিল না। দ্বিতীয়ার্ধে ইউসেফ এজেজারিকে নামান ইস্টবেঙ্গল কোচ অস্কার ব্রুজ়ো। লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা নামার পর ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণ আরও বেড়ে যায়। ৬৬ মিনিটের মাথায় পর পর সুযোগ পায় ইস্টবেঙ্গল। বক্সের বাইরে থেকে মিগুয়েলের দুরন্ত শট বাঁচিয়ে দেন বিশাল। সেই বল ক্লিয়ার করতে পারেনি মোহনবাগান। আবার বল পেয়ে শট মারেন ইউসেফ। সেই শট বাঁচান অলড্রেড।
মোহনবাগানের আক্রমণ ভাগের মধ্যে বোঝাপড়া ভাল হচ্ছিল না। গতিও কম ছিল জেমস ম্যাকলারেন, সাহালদের। তাই বাধ্য হয়েই সাহালকে তুলে দিমিত্রি পেত্রাতোসকে নামান বাগান কোচ সের্জিয়ো লোবেরা। বাগানের যা আক্রমণ সব হচ্ছিল ডান প্রান্ত ধরে। কেউ বল পেলেই মনবীর না হলে অভিমিতেইয়ের পায়ে বল দিয়ে দিচ্ছিলেন। বৈচিত্র দেখা যাচ্ছিল না। ফলে সুযোগও কম পাওয়া যাচ্ছিল।
লিগ জিততে হলে এই ম্যাচে জয় বেশি দরকার ছিল মোহনবাগানের। গোলপার্থক্য বেশি থাকায় ইস্টবেঙ্গল কিছুটা হলেও ভাল জায়গায় ছিল। সময় কমছিল দুই দলের কাছেই। ফলে দুই কোচই পরিকল্পনা মাফিক কিছু বদল করছিলেন। তাঁরা জানতেন, এই সময় গোল খেয়ে গেলে ফেরা কঠিন। গোল পাওয়ার জন্য মাঝমাঠে রবসন রবিনহোকে নামিয়ে দেন লোবেরা।
৭৮ মিনিটের মাথায় থ্রু বল থেকে আবার ভাল জায়গায় বল পান ম্যাকলারেন। সামনে কেভিন সিবিলে ছাড়া কেউ ছিলেন না। কিন্তু তাঁকে পরাস্ত করতে পারেননি ম্যাকলারেন। বল বার করতে গিয়ে বলের উপর পড়ে যান সিবিলে। রেফারি ভেবেছিলেন ম্যাকলারেন তাঁকে ফাউল করেছেন। ফলে তিনি ফাউল দেন। পরে রিপ্লেতে দেখা যায় ম্যাকলারেন তাঁকে ফাউল করেননি। এমনই বলের উপর পড়ে যান সিবিলে। সে ক্ষেত্রে পেনাল্টি হতে পারত। কিন্তু রেফারি ধরতে না পারায় বেঁচে যায় ইস্টবেঙ্গল।
গোল পাওয়ার জন্য শেষ তাস জেসন কামিন্সকেও নামিয়ে দেন বাগান কোচ। দু’দলেরই এক ভুল হচ্ছিল। বল পেয়ে অনেক বেশি পায়ে রাখছিলেন ফুটবলারেরা। বল ছাড়তে দেরি করছিলেন। ফলে গোল করার সুযোগ কমছিল।
৮৪ মিনিটের মাথায় ইস্টবেঙ্গলকে এগিয়ে দেন এডমুন্ড লালরিন্ডিকা। তিন পাসে ভেঙে পড়ে বাগানের রক্ষণ। এজেজারির কাছ থেকে বল পান মিগুয়েল। তিনি পাস বাড়ান এডমুন্ডকে। ডিফেন্ডারকে ঘাড়ের উপর নিয়ে আগুয়ান বিশালের ডান দিক দিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন এ়ডমুন্ড। এগিয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল।
গোলের পর বেশ কিছু ক্ষণ ধরে উল্লাস করে ইস্টবেঙ্গল। দেখে মনে হচ্ছিল, খেলা তারা জিতে গিয়েছে। এই ম্যাচ জিততে পারলেন লিগ প্রায় হাতের মুঠোয় চলে আসত। কিন্তু সেটা করতে গিয়েই ভুল করল লাল-হলুদ। কিছুটা হলেও মনঃসংযোগ নষ্ট হয় তাদের। তা কাজে লাগায় বাগান। ৯০ মিনিটের মাথায় রবসনের কর্নার থেকে ব্যাক হেডে গোল করেন কামিংস। সমতা ফেরায় বাগান।
তার পরেও দু’দল গোল করার দু’টি সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল। বিপিনের পাস ধরতে পারেননি এজেজারি। সংযুক্তি সময়ের একেবারে শেষ মিনিটে গোলের সামনে বলে পা লাগান ম্যাকলারেন। কিন্তু প্রভসুখনকে পরাস্ত করতে পারেননি তিনি। খেলা ড্র হয়। খেলা শেষে অবশ্য ইস্টবেঙ্গলের ফুটবলারদের শরীরী ভাষা বেশি ফুরফুরে দেখাচ্ছিল। তাঁরা জানেন, আর একটি ম্যাচ জিতলেই লিগ তাঁদের। কিন্তু মোহনবাগানের সুযোগ নিজেদের হাতে নেই। ফলে একটু হলেও হতাশ দেখাচ্ছিল পেত্রাতোসদের।