রানি রূপমতী ও মালোয়ার রাজা বাজ বাহাদুরের প্রেমকাহিনি মিশে আছে মান্ডু-তে। ছবি: সংগৃহীত।
বসন্তে বদলে যায় প্রকৃতি। শীতের রুক্ষ খোলসে যেন রং লাগে। দিগন্ত হয় ওঠে রঙিন। পলাশ, শিমুলের রঙে ছেয়ে যায় বনভূমি। মনেএ লাগে রং। এমন মরসুমেই বেড়ানোর পরিকল্পনা করছেন?
সমুদ্র-পাহাড়-বনভূমি তা ঘোরা হল, বসন্তে চলুন এমন জায়গায় যেখানে রয়েছে ইতিহাস, আছে মনোমুগ্ধকর স্থাপত্য আর লোকমুখে প্রচলিত প্রেমকাহিনি। একটু অন্য রকম ভ্রমণের শরিক হতে বেছে নেবেন কোন স্থান?
মান্ডু
রানি রূপমতী ও মালোয়ার রাজা বাজ বাহাদুরের প্রেমকাহিনি মিশে আছে মান্ডু-তে। সত্য-মিথ্যা নিয়ে তর্কবিতর্ক থাকতে পারে। তবে এখানকার রূপমতী মহলকে প্রেমের স্মারক হিসাবেই মেনে নিয়েছেন অনেকে। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গিরের অতি প্রিয় মান্ডু, বিশেষ করে বর্ষাকালে। তিনি নাম দিয়েছিলেন সাদিয়াবাদ, অর্থাৎ সিটি অফ জয়।
মধ্যপ্রদেশের ধার জেলায় মান্ডুতে গেলে অনেক কিছুই দেখতে পাবেন। মান্ডু জুড়ে ছড়িয়ে আছে নানা সৌধ, প্রাসাদ ইত্যাদি। দুই থেকে তিন দিনে মান্ডু-র বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান দেখে নিতে পারবেন। মোটামুটি তিন ভাগে বিভক্ত মান্ডু-র প্রধান আকর্ষণ হল, ভিলেজ বা সেন্ট্রাল গ্রুপ, রয়্যাল গ্রুপ এবং রেওয়াকুণ্ড গ্রুপ।
শোনা যায়, রূপমতীর জন্যই বাজ বাহাদুর পাহাড়ের মাথায় বানিয়ে দিয়েছিলেন একটি মহল, যা পরিচিত রূপমতী মহল নামে। এই স্থান থেকেই চারপাশের দৃশ্যাবলি দেখতেন তিনি। তারই অদূরে রয়েছে রেওয়া কুণ্ড। সেখান থেকে জল এনে তিনি পূজা-অর্চনা করতেন। রূপমতী মহল থেকে খানিক দূরেই রয়েছে বাজ বাহাদুরের মহল। মান্ডুর আর একটি আকর্ষণ হল জাহাজ মহল। দু’টি কৃত্রিম জলাশয়ের মাঝে তার অবস্থান। প্রতিটি মহলের নিজস্বতা রয়েছে। বর্ষায় মান্ডু সুন্দর হলেও, বসন্ত বড় আরামদায়ক। সেজে ওঠা প্রকৃতির সঙ্গে ঐতিহাসিক মহলগুলি ঘুরতে ভালই লাগবে।
মাউন্ট আবু
রাজস্থানের পাহাড়ি শহর মাউন্ট আবু। ইতিহাস-ভূগোলের এক আশ্চর্য সমাহার মিলবে এই স্থানে গেলে। সড়কপথে মাউন্ট আবু যাওয়ার সময় দেখতে পাবেন পাথরে বায়ুর ক্ষয়কাজের চিহ্ন। মরু অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি।
দিলওয়াড়া মন্দিরটির শ্বেতপাথরের কারুকাজ দেখলে অজান্তেই তাজমহলের সঙ্গে তুলনা চলে আসতে পারে। ছবি: সংগৃহীত।
মাউন্ড আবু ভারি শান্ত একটি জনপদ। দর্শনীয় স্থানও নেহাত কম নয়, তবে সবচেয়ে বেশি বিস্ময় সৃষ্টি করার ক্ষমতা রাখে এখানকার জৈন মন্দিরটি। দিলওয়াড়া মন্দিরটির শ্বেতপাথরের কারুকাজ দেখলে অজান্তেই তাজমহলের সঙ্গে তুলনা চলে আসতে পারে। পাথর কেটে তৈরি এই মন্দিরের নকশা আর স্থাপত্য মনোমুগ্ধকর। বড় বড় খিলান ও গম্বুজ, মন্দিরের চেহারায় আলাদা গাম্ভীর্য এনেছে। মন্দিরের ছাদে পাথরের সূক্ষ্ম কারুকাজ বিস্ময় জাগায়।
দিলওয়ারা মন্দিরগুলি জৈন তীর্থঙ্কর আদিনাথের নামে উৎসর্গীকৃত। মন্দিরগুলি একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে চালুক্য রাজবংশ দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। এ ছাড়াও এখান থেকে ঘুরে নেওয়া যায় নককি হ্রদ, টড রক, গুরু শিখর-সহ একাধিক জায়গা। ২-৩ দিন লাগবে মাউন্ট আবু ঘুরতে।
বিরূপাক্ষ মন্দির। ছবি: সংগৃহীত।
হাম্পি, কর্নাটক
শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’। সেই তুঙ্গভদ্রা নদীর পাশেই কর্নাটকের ঐতিহাসিক শহর হাম্পি। এক সময় এই স্থানকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল বিজয়নগর সাম্রাজ্য। দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী হিন্দুরাজ্য হিসাবে খ্যাতি ছিল বিজয়নগরের। এই হাম্পিতেই এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে প্রাচীন মন্দির, ঐতিহাসিক নিদর্শন, ধ্বংসাবশেষ। ১৯৮৬ সালে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের স্বীকৃতি দেয় হাম্পিকে। এখানে এলে ঘুরে নিতে পারেন বিরূপাক্ষ মন্দির। কেউ কেউ আবার একে পম্পাপতির মন্দিরও বলেন। প্রবেশপথে রয়েছে তোরণ ও দু’টি বিশালাকার প্রাঙ্গণ। মন্দিরের মূল গর্ভগৃহে রয়েছে পাথরের তৈরি বিশাল শিবলিঙ্গ। এ ছাড়াও মন্দিরের ভিতরে রয়েছে পম্পাদেবী, ভুবনেশ্বরী, পাতালেশ্বর, সূর্যনারায়ণ প্রভৃতি দেবতার মন্দির। এখানকার আর এক সুন্দর মন্দির হল বিজয়বিঠ্ঠল। মন্দির প্রাঙ্গণে রয়েছে গ্রানাইট পাথরের তৈরি একটি সুবিশাল রথ। তার গায়ে গায়ে সূক্ষ্ম কারুকার্য। রয়েছে মিউজ়িক টেম্পল। একক পাথরের তৈরি বিশালাকার ১৬টি স্তম্ভ ধরে আছে মন্দিরের ছাদ। কান পেতে আঘাত করলেই শোনা যায় সপ্তসুর। ঘুরে নিতে পারেন হাম্পি গ্রাম। দর্শনীয় স্থান রয়েছে আরও। ভাল ভাবে হাম্পি ঘুরতে গেলে অন্তত ৩টি দিন এখানে থেকে যেতে হবে।