শনিবার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ছবি: পিটিআই।
পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব নিয়েই নিজের লক্ষ্য স্পষ্ট করে দিলেন শুভেন্দু অধিকারী। বুঝিয়ে দিলেন, এখন তাঁর কাছে অন্যের সমালোচনা করার সময় নেই। দায়িত্বপূরণ করার পালা।
শুভেন্দুর শপথগ্রহণ পর্ব ঘিরে কলকাতায় সকাল থেকেই ছিল সাজো সাজো রব। শপথ সমারোহের জন্য সেজে উঠেছিল ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড। শনিবার সেখানেই রাজ্যপাল আরএন রবির উপস্থিতিতে শপথবাক্য পাঠ করেন শুভেন্দু। বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ জয়ের গুরুত্ব বোঝাতে তাঁর শপথ পর্বে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নড্ডার মতো বিজেপির শীর্ষনেতারা। আদিত্যনাথ, হিমন্ত বিশ্বশর্মা, মানিক সাহা, রেখা গুপ্ত, সম্রাট চৌধরি-সহ বিজেপিশাসিত বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরাও ছিলেন। কেন্দ্রের শাসকজোট ‘এনডিএ’-র বিভিন্ন নেতারাও আমন্ত্রিত ছিলেন শপথ সমারোহে।
পর পর দু’টি বিধানসভা ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাস্ত করেছেন শুভেন্দু। এ বারের ভোটে জিতেছেন নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর— দুই আসনেই। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে তিনি যে এগিয়ে ছিলেন, তা নিয়ে গণনার পর থেকেই বিস্তর আলোচনা এবং জল্পনা চলছিল। সেটিই সত্যি হয় শুক্রবার। বিজেপির পরিষদীয় দলনেতা হিসাবে বেছে নেওয়া হয় শুভেন্দুকে। দলের সকলের প্রস্তাবে তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে ঘোষণা করেন শাহ। রাজ্যে প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার পরে শুভেন্দুকে জড়িয়ে ধরেন মোদী এবং শাহ। নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে গেরুয়া উত্তরীয় পরিয়ে দেন আদিত্যনাথ। বস্তুত, শুভেন্দুর পোশাকেও শনিবার ছিল গেরুয়ার ছোঁয়া। হাফ হাতা গেরুয়া ফতুয়া, সরু দুধে আলতা পাড়ের সাদা ধুতি পরে, কপালে গেরুয়া তিলক কেটে ব্রিগেডের মঞ্চ থেকে শপথবাক্য পাঠ করেন শুভেন্দু।
মুখ্যমন্ত্রীর শপথের পরে আরও পাঁচ জন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য হিসাবে শপথ নেন। উত্তরবঙ্গ থেকে দু’জন এবং দক্ষিণবঙ্গ থেকে তিন জনকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে যেমন আদিবাসী মুখ রয়েছেন, তেমন মতুয়া, রাজবংশী এলাকার বিধায়কও আছেন। নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছেন— দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, ক্ষুদিরাম টুডু এবং নিশীথ প্রমাণিক। তবে তাঁদের দফতর বণ্টন হয়নি শনিবার। বিজেপি সূত্রে খবর, শুভেন্দুর মন্ত্রিসভার বাকি সদস্যদের শপথগ্রহণ হবে আগামী সোমবার, ১১ মে। সে দিনই পরিষ্কার হয়ে যাবে কে কোন দফতর সামলাবেন।
শপথগ্রহণের পরে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে যান শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রণাম জানানোর পরে শুভেন্দু জানান, তাঁর সরকার পশ্চিমবঙ্গের ‘নবনির্মাণ’ করবে। তিনি বলেন, “পশ্চিমবাংলার অনেক ক্ষতি হয়ে গিয়েছে। সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। শিক্ষা হারিয়ে গিয়েছে। আমরা পশ্চিমবাংলাকে নবনির্মাণ করব। অনেক দায়িত্ব। এখন একে অপরের সমালোচনার সময় নেই।” পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার গঠনের মুহূর্তকে রাজ্যের এক নতুন জাগরণের সূচনা বলেই মনে করছেন তিনি। শুভেন্দু বলেন, ‘‘বাংলা এবং বাঙালির সংস্কৃতি, কবিগুরুর ভাবনাতে, কবিগুরুর চেতনাতে শুভ সূচনা হল সরকারের। একটাই মন্ত্র— চরৈবেতি, চরৈবেতি।’’
পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠা দিবস নিয়ে পূর্বতন তৃণমূল সরকারের সঙ্গে প্রায়ই সংঘাতে জড়িয়েছিল রাজ্যের বর্তমান শাসকদল বিজেপি। ২০২৩ সালে বিধানসভায় প্রস্তাব পাশ করিয়ে পয়লা বৈশাখকে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠা দিবস হিসাবে চিহ্নিত করেছিল তৎকালীন মমতার সরকার। বিজেপি প্রশ্ন তুলেছিল, কেন ২০ জুনকে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠা দিবস হিসাবে মান্যতা দেওয়া হবে না? মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার পর সেই একই প্রসঙ্গ তুললেন শুভেন্দু। শনিবার সন্ধ্যায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘১৯৪৭ সালের ২০ জুন, যদি পশ্চিমবঙ্গ ভারতে যুক্ত না হত, তবে আজ আমরা এখানে দাঁড়াতে পারতাম না।’’ রাজ্যে নতুন সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বর্ণনা দিয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘‘আমি নিশ্চিত ভাবে ক্যাবিনেট এবং বিধানসভায় বিষয়টা রাখব, আমার ভাবনার মধ্যে আছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠা দিবস ১৯৪৭ সালের ২০ জুনই হওয়া উচিত। ইতিহাসকে বদলে দেওয়া যায় না।’’
শনিবার ছিল রবীন্দ্রজয়ন্তী। পশ্চিমবাংলার সাধারণ জনতার আবেগকে স্পর্শ করতেই রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিনে শপথ সমারোহের আয়োজন করা হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। শনিবার ব্রিগেডের মঞ্চে উঠে প্রথমেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন মোদী। হাতজোড় করে বিশ্বকবিকে প্রণামও করেন। মঞ্চে মোদীর শ্রদ্ধাজ্ঞাপনে আলাদা করে তার প্রতিফলন ঘটেছে। এর পরেই মঞ্চের মাঝে গিয়ে ভিড়ের দিকে মুখ করে প্রণাম করেন মোদী। প্রথমে হাঁটু মুড়ে বসে পড়েন প্রধানমন্ত্রী। তার পর মাথা নিচু করে মঞ্চে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম সারেন। ফেসবুকে এই ভিডিয়ো পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, ‘‘আমি পশ্চিমবঙ্গের জনশক্তির কাছে মাথা নত করছি।’’
ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে শপথের পর একের পর এক কর্মসূচি ছিল শুভেন্দুর। শপথগ্রহণের দিনই ধর্মতলায় পূর্ত দফতরের তাঁবুতে একপ্রস্ত প্রশাসনিক বৈঠক সারেন তিনি। রাজ্যের মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিওয়ালা, স্বরাষ্ট্রসচিব সংঘমিত্রা ঘোষ এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্তের সঙ্গে বৈঠক করেন শুভেন্দু। রাজ্যের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে খোঁজখবর নেন। এ ছাড়া বেশ কিছু সামাজিক কর্মসূচিতেও যোগ দেন তিনি। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বাসভবন ঘুরে তিনি পৌঁছে যান বালিগঞ্জে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘে। পরে কালীঘাট মন্দিরে গিয়েও পুজো দেন শুভেন্দু। যান চেতলায় শীতলা মন্দিরেও।