রাবণের দেশে দেখে আসুন রামায়ণ-সমৃ্দ্ধ স্থান! গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
রামায়ণ মহাকাব্য বলছে, রাবণ ছিলেন লঙ্কেশ্বর, অর্থাৎ লঙ্কার রাজা। যে ‘লঙ্কা’ রাজ্য আধুনিক যুগের শ্রীলঙ্কা বলে মনে করেন বিশ্বাসীদের অনেকেই। তা ছাড়া তাঁরা একা নন, শ্রীলঙ্কার সরকারও রামায়ণ সম্পর্কিত দেশের ৫০টির বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক দর্শনীয় স্থানকে সগর্বে পর্যটনক্ষেত্র হিসাবে প্রচার করে। ভারত যদি অযোধ্যাপতি রামের দেশ হয়, তবে শ্রীলঙ্কাকেও রাবণের দেশ বলতে আপত্তি হওয়ার কথা নয়। আর পর্যটনক্ষেত্রের নতুন খবর বলছে, রাবণের দেশে যেতে রামের দেশের মানুষদের ভিসার দরকার পড়বে না।
এত দিন যদিও তা ছিল না। শ্রীলঙ্কায় যেতে হলে ভিসার প্রয়োজন পড়ত ভারতীয়দের। কিন্তু সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার সরকার দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশে একটি নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিদেশি পর্যটকদের কাছে শ্রীলঙ্কাকে অবারিত করতে চেয়ে বদল এনেছে পর্যটন নীতিতে। মোট ৪০টি দেশের পর্যটকদের জন্য ভিসা ছাড়াই শ্রীলঙ্কা ভ্রমণের সুযোগ দিচ্ছে সরকার। আর সেই ৪০টি দেশের তালিকায় ইংল্যান্ড, আমেরিকা, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়ার মতো ভারতও রয়েছে।
সিগিরিয়া পাহাড়।
এই ৪০টি দেশের পর্যটকদের জন্য বিনামূল্যে শ্রীলঙ্কা ভ্রমণের ইলেকট্রনিক ট্র্যাভেল অথরাইজ়েশন (ইটিএ) দেওয়া হবে সে দেশের সরকারের কাছে। সেই ইটিএ-র সাহায্যেই ৩০ দিন শ্রীলঙ্কায় থাকার অনুমতি মিলবে। এর আগে শ্রীলঙ্কা ভ্রমণের জন্য ৩০ দিনের ডবল এন্ট্রি ট্যুরিস্ট ভিসা পেতে সার্কের দেশগুলিকে মাথাপিছু ২০ ডলার অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় ১৯০০ টাকা খরচ করতে হত। এখন ভ্রমণেচ্ছুরা ইটিএ-র জন্য আবেদন করেই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ওই একই সুবিধা পাবেন।
কোথায় কোথায় ঘুরবেন?
রামের দেশের মানুষ রাবণের দেশে গেলে রামায়ণ সম্পর্কিত দর্শনীয় স্থানগুলি না দেখে ফিরে আসা উচিত হবে না।
রাবণ জলপ্রপাত।
১. সীতা আম্মান মন্দির ও অশোকবটিকা: রামায়ণ অনুসারে, সীতাহরণের পর লঙ্কাপতি অশোকবটিকাতেই নজরবন্দি করে রেখেছিলেন সীতাকে। শ্রীলঙ্কার নুয়ারা এলিয়ার কাছে অবস্থিত এই জায়গাটিই সেই অশোকবটিকা বলে বিশ্বাস। এই জায়গায় একটি সীতা মন্দির রয়েছে। কাছেই পাথরের উপর হনুমানের পায়ের ছাপও দেখা যায়।
২. রাবণ জলপ্রপাত ও গুহা: এল্লা নামক পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত এই গুহা ও জলপ্রপাতটি অত্যন্ত মনোরম। স্থানীয়দের বিশ্বাস, সীতাকে লুকিয়ে রাখার সময় নিজের যাত্রাপথ গোপন রাখার জন্য রাবণ ওই জটিল সুড়ঙ্গপথ ও গুহা ব্যবহার করেছিলেন।
রাবণ গুহা সংলগ্ন মন্দির।
৩. দিভুরুমপোলা মন্দির: লঙ্কার যুদ্ধ শেষে রাবণের কবল থেকে মুক্ত হওয়ার পর, সীতা তাঁর পবিত্রতা ও সতীত্ব প্রমাণ করতে অগ্নিপরীক্ষা দিয়েছিলেন। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই মন্দিরটি সেই স্থানেই, যেখানে সীতা তাঁর অগ্নিপরীক্ষা দিয়েছিলেন।
৪. মুন্নেশ্বরম ও মনভারী মন্দির: চিলাও অঞ্চলে অবস্থিত। রাবণবধের পর ব্রহ্মহত্যার পাপ থেকে মুক্তি পেতে রাম এই স্থানে শিবের আরাধনা করেছিলেন বলে মনে করা হয়। মনভারী মন্দিরের শিবলিঙ্গটি রামের নিজের হাতে প্রতিষ্ঠিত বলে মনে করেন ভক্তেরা।
রুমাসলা পাহাড়।
৫. তিরুকোনেশ্বরম মন্দির: ত্রিঙ্কোমালির এই প্রাচীন শিবমন্দিরটি রাবণের প্রিয় মন্দির নামে খ্যাত। রাবণ শিবের ভক্ত ছিলেন। কথিত আছে, লঙ্কেশ্বর এই স্থানেই নিয়মিত শিবের উপাসনা করতেন।
৬. দুনুভিলা হ্রদ: প্রতি বিজয় দশমীতে ভারতে রাবণবধের উদ্যাপন হয়। তবে শ্রীলঙ্কার মানুষ মনে করেন, আসল রাবণবধের ক্ষেত্র এই দুনুভিলা হ্রদ। এই হ্রদের পাড় থেকেই রামচন্দ্র ক্ষেপণ করেছিলেন রাবণের মৃত্যুবাণ।
রাবণ গুহার ভিতরের সুড়ঙ্গপথ।
৭. রুমাসলা পাহাড়: লক্ষ্মণের প্রাণ বাঁচাতে সঞ্জীবনীর খোঁজে গন্ধমাদন পাহাড়টিকেই তুলে নিয়ে এসেছিলেন হনুমান। সেই গন্ধমাদন পর্বত রয়েছে দক্ষিণ ভারতের রামেশ্বরমে বা মতান্তরে ওড়িশায়। রুমাসলা সেই গন্ধমাদন পর্বতের ভেঙে পড়া অংশ বলে বিশ্বাস।
৮. কেলানিয়া মন্দির: কলম্বোর কাছে অবস্থিত এই মন্দির। বিশ্বাস, রাবণের মৃত্যুর পর যখন লঙ্কার রাজা হিসাবে বিভীষণের অভিষেক করেছিলেন রাম, তখন এখানেই সেই অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল। সেই স্থানেই পরে মন্দির তৈরি হয়।