Guptipara Day Trip

টেরাকোটার মন্দিরে প্রাচীন শিল্পীর নকশা! দোলে অন্য রঙের খেলা দেখতে চলুন হুগলির বৃন্দাবনক্ষেত্রে

দোলের ছুটিতে অনেকেই গাড়ি নিয়ে বেড়াতে বেরিয়ে পড়েন। তেমন বেড়ানোর ঠিকানা হতে পারে হুগলির এই বৃন্দাবনক্ষেত্র। যেখানে রং ছাড়াই হোলি খেলছে মন্দিরের নকশা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০১ মার্চ ২০২৬ ১৮:৫৩

গ্রাফিক— আনন্দবাজার ডট কম।

যেথা কৃষ্ণ বিরাজে, সেথা বৃন্দাবন রাজে— বিশ্বাস করেন ভক্তেরা। সেই হিসাবে বাড়ির পাশের মন্দিরচত্বরও শ্রীকৃষ্ণের লীলাক্ষেত্র হতে পারে। তবে এ বৃন্দাবন তেমন বৃন্দাবন নয়। কৃষ্ণ এখানে নিজেই বৃন্দাবন আর জায়গাটি তাঁর জমিদারি। যার নাম বৃন্দাবনচন্দ্র জিউ অ্যান্ড এস্টেট। সাকিন পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার এক ‘গুপ্ত’পল্লীতে।

Advertisement

মথুরার যে জনপদ নন্দদুলালের শৈশব-কৈশোরের লীলাখেলায় ধন্য, সেখান থেকে এর দূরত্ব ১৩০৫ কিলোমিটার। তবে স্থানমাহাত্ম্যে হুগলির এই বৃন্দাবনও কম যায় না। কথিত আছে, বাংলার সুলতানের যে কুখ্যাত সেনাপতি কালাপাহাড় ওরফে রাজু হিন্দুদের মন্দির ধ্বংস করতে বেরিয়েছিলেন, পুরীর জগন্নাথ মন্দিরও যিনি আক্রমণ করতে ছাড়েননি, তিনিও নাকি এই মন্দিরে এসে নতমস্তক হয়েছিলেন। বৃন্দাবনের মন্দিরের চৌকাঠ পেরোতে পারেননি।

বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দির।

বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দির। — নিজস্ব চিত্র।

জায়গাটি হুগলি আর নদিয়ার সীমানায়। গঙ্গার কাছাকাছি সবুজে ঢাকা অঞ্চলটির অস্তিত্ব এক সময়ে বাইরে থেকে বোঝা যেত না। তাই বলা হত লুকনো বা ‘গুপ্ত’ পল্লী। সেই থেকেই এলাকার নাম হয় গুপ্তিপাড়া। বঙ্গের প্রথম বারোয়ারি পুজোয় হয়েছিল এখানেই। মাহেশের পরে খ্যাতিতে এগিয়ে গুপ্তিপাড়ারই রথ। কিন্তু এ অঞ্চলের বারোয়ারি সংস্কৃতি আর রথযাত্রা নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, বৃন্দাবনচন্দ্রের গল্প ততটা মুখে মুখে ফেরে না। অথচ তাঁর নামের ওই জমিদারি শুধু ইতিহাস আর আধ্যাত্মিকতায় নয়, কারুশিল্পেও ঋদ্ধ। মোট চারটি মন্দির আর অনেকখানি আমবাগান নিয়ে পাঁচিলে ঘেরা এস্টেট। তার মধ্যে বাংলার তিন খিলানের আটচালা শৈলীর মন্দির আছে, আছে জোড়বাংলা স্থাপত্য, রয়েছে একরত্ন টেরাকোটা মন্দিরও। আর যা আছে, সেটি সচরাচর বাংলার টেরাকোটা মন্দিরের দেওয়ালে দেখা যায় না। সূক্ষ্ম এবং রঙিন ফ্রেস্কোর কাজ।

মন্দিরের ভিতরে রঙিন ফ্রেস্কো।

মন্দিরের ভিতরে রঙিন ফ্রেস্কো। — নিজস্ব চিত্র।

ফ্রেস্কো এক ধরনের দেওয়ালচিত্র। ইউরোপীয় দেশগুলিতে প্রায়শই ওই ধরনের দেওয়ালচিত্র দেখা যায়। বিশেষ করে ইটালি, ফ্রান্সের বিভিন্ন গির্জার দেওয়ালে দেওয়ালে আঁকা রঙিন ছবির আকাশছোঁয়া কদর শিল্পের দুনিয়ায়। ভাটিক্যান সিটির সিস্টিন চ্যাপেলের সিলিংয়ে মাইকেলেঞ্জেলোর আঁকা ক্রিয়েশন অফ অ্যাডাম যার মধ্যে একটি। একটু অন্য ধরনের ফ্রেস্কোর নকশা দেখা যায় পুরনো বৌদ্ধ মনস্ট্রিতেও। ড্রাগন, বুদ্ধ, সামাজিক ঘটনাবলি, সবই ফুটে ওঠে তার দেওয়ালে দেওয়ালে। কিন্তু টেরাকোটার নকশা করা মন্দির আর ফ্রেস্কোর যুগলবন্দি দেখা যায় না সচরাচর। গুপ্তিপাড়ায় মন্দিরে সেই দুর্লভ মেলবন্ধনটি ঘটেছে।

বাংলার পটচিত্র আর ইউরোপীয় ধাঁচের ফুলের ছবি পাশাপাশি।

বাংলার পটচিত্র আর ইউরোপীয় ধাঁচের ফুলের ছবি পাশাপাশি। — নিজস্ব চিত্র।

২০০ বছরেরও আগে গ্রামবাংলার এই মন্দিরে ওই ফ্রেস্কোর নকশা কারা করেছিলেন, জানা নেই। তবে যাঁরা তুলি চালিয়েছিলেন, তাঁরা ইউরোপীয়, বৌদ্ধ এমনকি মোগলদের আর্টের ব্যাপারেও ভাল রকম অবগত ছিলেন। তাই টেরাকোটার শৈলীর চৌখুপি নকশায় সেকালের নিতাই-গৌরের ভক্তিভাব, বাংলার সমাজজীবনের পটচিত্রের সঙ্গে ফুটে উঠেছে শিল্পী ভ্যান গঘের স্টাইলের রোদলাগা ফুলের গোছা, ইউরোপীয় ধাঁচের ফল-ফুলের স্টিললাইফের মতো ছবি। আবার মোগলদের জাল নকশা, ড্রাগনের মতো মাছ, ফ্রান্সের রাজপ্রতীক ফ্লার দে লিও-ও আছে। আছের কৃষ্ণ-রাধা আর গোপীদের সঙ্গলাভের দৃশ্য। বাংলার লোকজ কলার সঙ্গে মিলেজুলে মন্দিরের ভিতরে এক অদ্ভূত মায়াময় পরিবেশ তৈরি করেছে সেই সব ছবি। হোলি ছাড়াই রঙের উৎসব তৈরি হয়েছে প্রিয় নাথ বৃন্দাবনচন্দ্রের জন্য।

গথিক নির্মাণের আদল, ঘড়ি, ভিক্টোরিয়ান নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। রয়েছে চিনের ড্রাগনের আদলের হাঙড়ের নকশা আবার সরস্বতীর পটচিত্রও।

গথিক নির্মাণের আদল, ঘড়ি, ভিক্টোরিয়ান নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। রয়েছে চিনের ড্রাগনের আদলের হাঙড়ের নকশা আবার সরস্বতীর পটচিত্রও। — নিজস্ব চিত্র।

বৃন্দাবনচন্দ্রের মূর্তিটি প্রায় চারশো বছরের পুরনো। তবে মন্দিরটি তুলনায় নব্য। ১৮০৭ সালে সম্ভবত পুরনো মন্দিরের জায়গায় এটি তৈরি করা হয়েছিল। আর তারই ভিতরের দেওয়ালে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক রঙে আঁকা হয়েছিল ওই নকশা। তাতে কোথাও কোথাও সময়ের প্রলেপ পড়েছে। তবে উজ্জ্বল হয়ে টিকে রয়েছে বেশির ভাগই।

দোলের ছুটিতে অনেকেই গাড়ি নিয়ে বেড়াতে বেরিয়ে পড়েন। তেমন বেড়ানোর ঠিকানা হতে পারে হুগলির এই বৃন্দাবনক্ষেত্র। যেখানে এলে জানতে পারবেন এক সাধুর কথা। যাঁর নাম সত্যানন্দ সরস্বতী। যিনি ওই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। শান্তিপুরের এক বিধবার কাছ থেকে নিয়ে এসেছিলেন বৃন্দাবনচন্দ্রের মূর্তি। শুনবেন সেই ঘটনার সঙ্গে জুড়ে থাকা অলৌকিক নানা কাহিনিও। আর চোখ ভরে দেখবেন টেরাকোটার সুক্ষ্ম কারুকাজ, যা বিষ্ণুপুরের বিখ্যাত নকশার থেকে কোনও অংশ কম যায় না।

রামচন্দ্রের একরত্ন টেরাকোটার মন্দির।

রামচন্দ্রের একরত্ন টেরাকোটার মন্দির। — নিজস্ব চিত্র।

কী কী দেখবেন?

বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দির: ফ্রেস্কোর কাজ ছাড়া এ মন্দিরের টেরাকোটার নকশাও ছিমছাম, সুন্দর। দেখার মতো প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো বৃন্দাবনচন্দ্রের বিগ্রহটিও। তিনি ছাড়া এ মন্দিরে রয়েছেন শ্রীরাধিকা। রয়েছেন জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা। তবে তিন ভাইবোনের মূর্তির একটি বৈশিষ্ট্য আছে। তিন বিগ্রহেরই হাত আছে। যা পুরীর মন্দির বা মাহেশের জগন্নাথের মন্দিরে নেই। মূর্তির চোখ, মুখ, মাথার সাজও একটু ভিন্ন ধরনের, যা দেখতে ভাল লাগবে।

সামলে রাধিকার সঙ্গে বৃন্দাবনচন্দ্র। নেপথ্যে জগন্নাথ-বলরাম ও সুভদ্রা। যাঁদের হাত আছে।

সামলে রাধিকার সঙ্গে বৃন্দাবনচন্দ্র। নেপথ্যে জগন্নাথ-বলরাম ও সুভদ্রা। যাঁদের হাত আছে। — নিজস্ব চিত্র।

রামচন্দ্রের মন্দির: বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দিরের পাশেই রয়েছে টেরাকোটার একরত্ন মন্দির। গোটা মন্দিরটি সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম টেরাকোটার নকশায় পূর্ণ থাকায় শুধু এই মন্দিরের নকশা দেখে দেখেই কয়েক ঘণ্টা কেটে যেতে পারে। ভিতরে রাম-সীতা-লক্ষ্মণ আর ভক্ত হনুমানের মূর্তিটিও দেখার মতো।

কৃষ্ণচন্দ্রের মন্দির: রামচন্দ্রের মন্দিরের ঠিক উল্টো দিকে বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দিরের ডান পাশে রয়েছে কৃষ্ণচন্দ্রের মন্দির। এই মন্দিরেরও একটি গল্প আছে। কৃষ্ণচন্দ্র আসলে বৃন্দাবনচন্দ্রেরই আরেক রূপ। তাঁকে বানানো হয়েছিল, নবাবের দরবারে নিয়ে যাওয়ার জন্য। বাংলার মসনদে তখন আলিবর্দী খান। জমিদার বৃন্দাবনচন্দ্রের জমিদারি থেকে খাজনা আসেনি দেখে তিনি তলব করলেন জমিদারকে। জমিদার যে আসলে বিগ্রহ, তা জানা ছিল না তাঁর। নবাবের দরবারে তো আর বিগ্রহকে নিয়ে যাওয়া যায় না, তাই তৈরি করা হল নকল জমিদার কৃষ্ণচন্দ্র। নবাব যখন দেখলেন জমিদার আসলে দেবতার বিগ্রহ, তখন মকুব করে দিলেন খাজনা। রেপ্লিকা মূর্তিটির পুজো শুরু হল অন্য একটি মন্দির তৈরি করে।

কৃষ্ণন্দ্রের মন্দির (বাঁ পাশে), একটু দূরে দেখা যাচ্ছে জোড়বাংলা স্থাপত্যের নিতাই গৌরের মন্দিরটিও।

কৃষ্ণন্দ্রের মন্দির (বাঁ পাশে), একটু দূরে দেখা যাচ্ছে জোড়বাংলা স্থাপত্যের নিতাই গৌরের মন্দিরটিও। — নিজস্ব চিত্র।

চৈতন্যদেবের মন্দির: একই ঘেরাটোপে থাকা চতুর্থ মন্দিরটি নিতাই-গৌরের। আর এই মন্দিরটিই সবচেয়ে পুরনো। জোড়বাংলা স্থাপত্যের এই মন্দিরে পূজিত নিতাই-গৌরের মূর্তির বিশেষত্ব হল এঁরা উদ্বাহু নন। হাত নামানো থাকে নীচে।

দেশকালীর মন্দির: দেশকালীর মন্দিরটি অবশ্য ওই মন্দির চত্বরের বাইরে। তবে মন্দিরটির নকশা নজরকাড়া। এই মন্দিরটি একটি সিদ্ধ পীঠ হিসেবে কথিত। ভিতরে রয়েছে পঞ্চমুণ্ডির আসন। কথিত আছে, কালীপুজোর দিন কালীঘাটের দেবী এখান থেকে পুজো নিয়ে তার পরে কালীঘাটে যান।

দেশকালীর মন্দির।

দেশকালীর মন্দির। — নিজস্ব চিত্র।

সেনবাড়ি: সেনেদের জমিদারি ছিল এখানে। পথেই পড়বে তাঁদের বাড়ি, জোড়া শিবমন্দির, দুর্গাদালান।

বারোয়ারিতলা: বাংলার প্রথম বারোয়ারি পুজো হয়েছিল বিন্ধ্যবাসিনী জগদ্ধাত্রীর। সেখানে রয়েছে দেবীর মন্দির। সেনবাড়ি ঘুরে বৃন্দাবন এস্টেটে যাওয়ার পথে সেখানেও এক বার ঘুরে আসতে পারেন।

সেন বাড়ির দুর্গা দালান।

সেন বাড়ির দুর্গা দালান। — নিজস্ব চিত্র।

কী খাবেন?

গুপো সন্দেশ: গুপ্তিপাড়ার গুপো সন্দেশ বিখ্যাত। গুড় দিয়ে তৈরি কড়াপাকের জোড়া সন্দেশ। তার স্বাদ নিতে চাইলে আসতে হবে মাসির বাড়ির কাছে। সেখানই এক পুরনো মিষ্টির দোকানে ভাল গুপো সন্দেশ পাওয়া যায়। চেখে দেখার পাশাপাশি বাক্স ভরে নিয়েও আসতে পারেন বাড়িতে।

মন্দিরর ভোগ: বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দিরে প্রতি দিন ভোগ প্রসাদ খাওয়ানো হয়। মন্দিরে গেলে সেই ভোগ খাওয়ার সুযোগ ছাড়বেন না। সাধারণ ভাত-ডাল-পোস্ত-ভাজা-নিরামিষ তরকারি-চাটনি-পায়েস-মিষ্টি। তারই স্বাদ অমৃতের মতো। তবে তার জন্য আগে থেকে কুপন কাটতে হবে। মন্দিরে ফোন করে ভোগের কুপনের টাকা দিয়ে দিলেও ওঁরা ব্যবস্থা করে রাখেন।

গুঁপো সন্দেশ।

গুঁপো সন্দেশ। ছবি: সংগৃহীত।

কী ভাবে যাবেন?

ট্রেনে: হাওড়া থেকে কাটোয়া শাখার ট্রেন ধরে নামতে হবে গুপ্তিপাড়ায় অথবা বেহুলা স্টেশনে। সখানে টোটো বা রিক্সাকে বললেই তারা নিয়ে যাবে মন্দির চত্বরে।

গাড়িতে: কলকাতা থেকে গুপ্তিপাড়া গাড়িতে আসার সহজ রাস্তা হল কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে ধরে বাঁশবেড়িয়া বা কল্যাণী মোড় থেকে ঈশ্বর গুপ্ত সেতু পার হয়ে ব্যান্ডেল অথবা মগরায় পৌঁছোন। সেখান এসটিকেকে রোড ধরে এগোলেই জিরাট এবং বলাগড় পেরিয়ে গুপ্তিপাড়া।

Advertisement
আরও পড়ুন