Teenagers working in Firecrackers factory

রোজগারের নেশায় বাজির বিষে ঝাঁপ দিচ্ছে বহু কিশোর

শনিবার হারালে এক কারখানায় তীব্র বিস্ফোরণ হয়। সেখানে নিষিদ্ধ বাজি তৈরি হচ্ছিল বলেই অভিযোগ। ঘটনায় কর্মরত চার জন আহত হন।

সমীরণ দাস 
শেষ আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:০৩
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

ষোলো-সতেরোতেই পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে ফেলছে বহু কিশোর। তার পরে যোগ দিচ্ছে বাড়ির ‘কাছে’ বাজি কারখানায়। বাড়ির কাছাকাছি হওয়ায় যাতায়াতে সুবিধা। তার উপরে বাজি কারখানায় তেমন ‘ভারি’ কাজ করতে হয় না। পারিশ্রমিকও মন্দ না। ফলে বহু ছেলেই রোজগারের আশায় ঢুকে পড়ছে কাজে। এ ভাবেই চম্পাহাটি, বেগমপুর, সাউথ গড়িয়া পঞ্চায়েত এলাকার বহু ছেলে হারাল-সহ আশপাশের বাজি কারখানায় কাজ করছে। অভিযোগ, প্রায় সব কারখানাতেই বেআইনি নিষিদ্ধ বাজি তৈরি হয়। ঝুঁকি নিয়ে সেই সব কাজই করছে তারা। বার বার দুর্ঘটনা, বিস্ফোরণে প্রাণহানির ঘটনার পরেও পরিস্থিতি বদলাচ্ছে না।

শনিবার হারালে এক কারখানায় তীব্র বিস্ফোরণ হয়। সেখানে নিষিদ্ধ বাজি তৈরি হচ্ছিল বলেই অভিযোগ। ঘটনায় কর্মরত চার জন আহত হন। তাঁদের মধ্যে গৌরহরি গঙ্গোপাধ্যায় নামে সাউথ গড়িয়া পঞ্চায়েত এলাকার বাসিন্দা বছর আটান্নের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয় গভীর রাতে। আরও তিন জন রাহুল পুঁই, কিষাণ মণ্ডল ও বিশ্বজিৎ মণ্ডল আশঙ্কাজনক অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পুলিশ সূত্রের খবর, তিন জনেরই বয়স কুড়ির আশপাশে। এবং তিন জনেরই বাড়ি পিয়ালির খোলাঘাটা এলাকায়, একই গ্রামে।

রবিবার সেই গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, থমথমে পরিবেশ। জানা গেল, গ্রামের বহু ছেলেই কাজ করে ওই সব কারখানায়। এমনকি বহু নাবালকও কাজ করছে। সকলেই জানেন, কারখানায় নিষিদ্ধ বাজি তৈরি হয়, প্রতি পদে ঝুঁকি, তবু কিশোর-যুবকেরা কাজে যান। দুর্ঘটনায় আহত রাহুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, বাড়িতে রয়েছেন বৃদ্ধা ঠাকুরমা লক্ষ্মী পুঁই। বছর সত্তরের ওই বৃদ্ধা বলেন, “ওর বাবা-মা নেই। আমার কাছেই মানুষ। বাড়িতেই থাকত। পাড়ার অনেকেই কাজে যায়। তাদের সঙ্গে ক’দিন হল কাজে যাচ্ছিল। এমনটা হবে ভাবতে পারিনি।”

গ্রামের বাসিন্দা বৃদ্ধ রবি সাঁফুই বলেন, “গ্রামের বহু ছেলেই কাজে যায়। অন্য কোনও কাজ তো তেমন নেই। বাজি কারখানায় কয়েক ঘণ্টা কাজ করলে ভাল মজুরি মেলে। কারখানার মালিকদের উচিত সতর্ক হওয়া। অন্তত বিমার ব্যবস্থা করা। সরকারেরও দায়িত্ব রয়েছে।” গ্রামের বাসিন্দারাই জানালেন, অনেকেই স্কুল-কলেজের পড়াশোনা সামলে বাজি কারখানায় কাজ করে। অনেকে আবার পড়া ছেড়ে কাজে ঢুকে পড়েছে। কাজের ভিত্তিতে দৈনিক ২৫০ টাকা থেকে ১০০০ টাকাও আয় হয়।

গ্রামে ঘুরতে ঘুরতেই দেখা হল বিউটি গায়েন নামে মধ্যবয়সি এক মহিলার সঙ্গে। জানা গেল, তাঁর সতেরো বছরের ছেলে কাজ করছে একটি কারখানায়। কিন্তু শনিবারের ঘটনার পর আতঙ্কে রয়েছেন। তাঁর কথায়, “আমি ও আমার স্বামী দু’জনেই অসুস্থ। তাই সংসার চালাতে পড়াশোনা সামলে ছেলেটা কারখানায় কাজে যায়। কিন্তু যা শুনছি, আর কাজে যেতে দেব না।”

কী ভাবে এত এত মানুষের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রমরমিয়ে দিনের পর দিন কারখানাগুলি চলছে, সেই প্রশ্ন উঠছে। প্রশাসনের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ বাসিন্দাদের একাংশ থেকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। এ দিন বিস্ফোরণস্থলে যায় কংগ্রেসের প্রতিনিধিদল। প্রদেশ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক আশুতোষ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “প্রশাসন সম্পূর্ণ উদাসীন। কার্যত খোলা জায়গায় বারুদের চাষ হচ্ছে। নিরাপত্তার বালাই নেই। ক্লাস্টার তৈরি অথৈ জলে। এই ভাবে একটা কুটির শিল্পকে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে।”

অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টা পরেও এই ঘটনায় কারখানার মালিক বা কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি দুর্ঘটনার পরে ওই এলাকায় প্রচুর নিষিদ্ধ বাজি চোখে পড়লেও, সেই সবও উদ্ধার করেনি পুলিশ। স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগ, প্রকৃত ঘটনা ধামা চাপা দিতে তৎপর ব্যবসায়ী সমিতি। মৃত গৌরহরির পরিবারের লোকজনের দাবি, জখম হওয়ার পরে কয়েক ঘণ্টা বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে অবশেষে এম আর বাঙুর হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়। ব্যবসায়ী সমিতি বা মালিক পক্ষ কেউই পাশে দাঁড়ায়নি। এ ব্যাপারে কার্যত মুখে কুলুপ এঁটেছেন ব্যবসায়ী সমিতির লোকজন। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত চলছে।

আরও পড়ুন