সোমবার রায়দিঘির জনসভায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ছবি: সংগৃহীত।
বিজেপির ‘পরিবর্তন যাত্রা’র আনুষ্ঠানিক সূচনা রবিবারই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই সূচনাপর্বের দ্বিতীয় তথা শেষ দিনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বুঝিয়ে দিলেন, ‘যাত্রা’র আসল সূচনা তিনিই করলেন। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের জন্য বিজেপির ‘সঙ্কল্পপত্র’ (ইস্তাহার) এখনও ঘোষিত হয়নি। কিন্তু সোমবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুর সাংগঠনিক জেলায় রায়দিঘির জনসভা থেকে শাহ যা প্রতিশ্রুতি দিলেন, তা নির্বাচনী ইস্তাহারের চেয়ে কম কিছু নয়। সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকর করা, আট মাসের মধ্যে সমস্ত শূন্য সরকারি পদ পূরণ করা এবং যুবসমাজের জন্য চাকরি পাওয়ার সময়সীমা বাড়িয়ে দেওয়া— ‘যাত্রা’ উদ্বোধনের মঞ্চ থেকে এমন একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি দিলেন শাহ।
রাজ্যের সরকারি কর্মীদের উদ্দেশে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সোমবার প্রশ্ন করেছেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কর্মীরা মমতাদিদির ১৫ বছরের সরকারকে অনেক সাহায্য করেছেন। কিন্তু যাঁরা সাহায্য করলেন, তাঁদের জন্য মমতাদিদি কী করলেন?’’ শাহের কথায়, ‘‘সারা দেশে সরকারি কর্মীরা সপ্তম বেতন কমিশন পেয়ে গিয়েছেন। এ বার অষ্টম বেতন কমিশন পেতে চলেছেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কর্মীরা এখনও ষষ্ঠ কমিশনের বেতন পাচ্ছেন।’’ এর পরেই তাঁর ঘোষণা, ‘‘রাজ্যে বিজেপির সরকার গড়ে দিন। ৪৫ দিনের মধ্যে আমরা সপ্তম বেতন কমিশনের বেতন দেব।’’
সরকারি কর্মী হতে যাঁরা ইচ্ছুক, তাঁদের জন্যও উল্লেখযোগ্য ঘোষণা করেছেন শাহ। তিনি বলেন, ‘‘যুবকদের জন্য বিজেপি ভাল খবর এনেছে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সকল শূন্য সরকারি পদে নিয়োগ হবে, যুব সমাজ চাকরি পাবেন ঘুষ না-দিয়ে।’’ সরকারি পদ তথা চাকরির সংখ্যাও বাড়ানো হবে বলে শাহ ঘোষণা করেছেন। তাঁর আশ্বাস, ‘‘অনেক স্থায়ী পদ তুলে দেওয়া হয়েছে। বিজেপির সরকার গড়ে দিন। দু’মাসে আমরা সব লুপ্ত পদ ফিরিয়ে আনার কাজ করব।’’
দীর্ঘ দিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ না-হওয়ায় যুবসমাজ চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে শাহ অভিযোগ করেন। চাকরির পরীক্ষায় বসার সুযোগ না-পেয়েই যাঁদের চাকরির বয়স পেরিয়ে গিয়েছে, তাঁদের উদ্দেশেও ঘোষণা শোনা গিয়েছে শাহের ভাষণে। তিনি বলেন, ‘‘বসে থেকে থেকে যাঁদের চাকরির বয়স চলে গিয়েছে, বিজেপির সরকার হলে, তাঁদেরকে বয়সসীমায় পাঁচ বছরের ছাড় দেওয়া হবে।’’
মুখ্যমন্ত্রী এবং অভিষেককে আক্রমণের সুর আগের তুলনায় আরও চড়িয়েছেন শাহ। তাঁর কথায়, ‘‘মমতাদিদি আমাদের পরিবর্তন যাত্রা সম্পর্কে বলছিলেন, এটা তো ক্ষমতা দখলের যাত্রা। আমি বলতে চাই, মমতাদিদি, পরিবর্তনের অর্থ আমাদের কাছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রিত্ব নয়। আমাদের কাছে পরিবর্তনের অর্থ হল অনুপ্রবেশকারীদের হাত থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুক্তি, দুর্নীতি থেকে মুক্তি, সীমান্তকে সুরক্ষিত করা, মা-বোনেদের সুরক্ষিত করা, আইনের শাসন আনা।’’ শাহের কথায়, ‘‘এ বার সময় এসেছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কল্পনার সোনার বাংলা বানানোর। সোনার বাংলার নির্মাণ মমতাদিদি আর ভাইপো করতে পারবেন কি?’’ রায়দিঘির জমায়েতের উদ্দেশে শাহের সতর্কবার্তা, ‘‘এ বার যদি তৃণমূলকে ভোট দেওয়ার ভুল আপনারা করেন, তা হলে এখানে ভাইপোর শাসন হবে, মমতাদিদির শাসন থাকবে না।’’
এসআইআর আবহে শরণার্থী তথা উদ্বাস্তুদের জন্য বার্তা দিতে ভোলেননি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘পুরো পশ্চিমবঙ্গকে তিনি (মমতা) অনুপ্রবেশকারীদের স্বর্গ বানিয়েছেন। তিনি সিএএ-র বিরোধিতা করেছিলেন। যদি বিরোধিতা না-করতেন, তা হলে সকল শরণার্থী এত দিনে নাগরিকত্ব পেয়ে যেতেন।’’ তার পরেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ্বাস, ‘‘আমি সকল হিন্দু শরণার্থীকে বলতে এসেছি, চিন্তা করবেন না। উপরে বিজেপি সরকার রয়েছে। আপনার নাগরিকত্ব নিয়ে চিন্তা করার কোনও দরকার নেই।’’
রাজ্য পুলিশের প্রাক্তন ডিজি রাজীব কুমারকে তৃণমূল রাজ্যসভা নির্বাচনে প্রার্থী করছে। সে প্রসঙ্গ টেনে শাহ বলেন, ‘‘শিক্ষক নিয়োগ, এসএসসি, পুর নিয়োগ, গরু পাচার, রেশন, ১০০ দিনের কাজ, আবাস যোজনা— প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে দুর্নীতিকে আড়াল করেছেন যে ডিজিপি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে এখান থেকে রাজ্যসভায় পাঠাচ্ছেন।’’ রাজ্যে মমতা যে সব মন্দির বানাচ্ছেন, তা-ও তোষণের রাজনীতি বলে শাহ মন্তব্য করেছেন। বলেছেন, ‘‘মন্দির যে উদ্দেশ্য নিয়েই বানান, আমি স্বাগত জানাচ্ছি। কিন্তু মমতাদিদি, আপনার রাজ্যে বাবরি মসজিদ তৈরি হচ্ছে। কার দায়?’’ শাহের কথায়, ‘‘হুমায়ুন কবিরকে পরিকল্পনা করে দলের বাইরে পাঠিয়ে বাবরি মসজিদ বানানোর কাজ তিনি করছেন, যাতে হিন্দুরা রেগে না-যান। মমতাদিদি, এ রাজ্যের হিন্দু আর মুসলমান, দু’জনেই আপনাকে চিনে গিয়েছেন। আপনার বিদায় নিশ্চিত।’’
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষণে উঠে এসেছে পঞ্চায়েত নির্বাচনে ‘সন্ত্রাস’-এর প্রসঙ্গ। হুঁশিয়ারির সুরে তিনি বলেছেন, ‘‘মথুরাপুরের সভা থেকে বলে যাচ্ছি, পদ্মফুলের সরকার এনে দিন। মমতাদিদির গুন্ডাদের উল্টো করে ঝুলিয়ে সোজা করার কাজ আমরা করব। খুঁজে বার করে জেলে পাঠাব।’’
সোমবার হাওড়ার আমতা, উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালি, বীরভূমের হাসন এবং উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুরেও ‘পরিবর্তন যাত্রা’র উদ্বোধন হয়েছে। ইসলামপুরে উদ্বোধন করেছেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন। আমতায় ছিলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিংহ, সন্দেশখালিতে ছিলেন কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিংহ চৌহান এবং হাসনে ছিলেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীস।