পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শুভেন্দু অধিকারীর নাম ঘোষণা করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শুক্রবার। ছবি: ভিডিয়ো থেকে।
জল্পনা ছিলই। শুক্রবার বিজেপির ২০৭ জন জয়ী প্রার্থীর সঙ্গে বৈঠক করে শুভেন্দু অধিকারীকেই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার পরিষদীয় দলনেতা বেছে নিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শাসকদলের পরিষদীয় দলনেতা হিসাবে শুভেন্দুই হচ্ছেন রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী। শনিবার কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে নতুন সরকার শপথ নেবে। বিধায়কদলের বৈঠকের পর শাহ বলেন, ‘‘পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আটটি প্রস্তাব এসেছিল। সব প্রস্তাবে একটিই নাম ছিল। দ্বিতীয় নামের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনও দ্বিতীয় নাম আসেনি। তাই শুভেন্দু অধিকারীকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে ঘোষণা করছি।’’
যে কোনও রাজ্যে নির্বাচনের পর বিধানসভার পরিষদীয় দলনেতা বাছাইয়ের সময় কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের সেই রাজ্যে পাঠান বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। এ বার পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে প্রধান পর্যবেক্ষক করা হয়েছিল শাহকে। তাঁর সঙ্গে সহকারী পর্যবেক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন পড়শি রাজ্য ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি। তাঁদের তত্ত্বাবধানে শুক্রবার বিকেলে নিউ টাউনের বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে হবু বিধায়কদের বৈঠক হয়। সেখানেই সর্বসম্মতিক্রমে পরিষদীয় দলনেতা তথা মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শুভেন্দুর নাম স্থির হয়েছে। বৈঠকের পর নতুন মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করেন বিজেপি নেতৃত্ব। বিধায়কদের সমর্থন নিয়ে শুভেন্দু এ বার লোক ভবনে যাবেন এবং রাজ্যপাল আরএন রবির কাছে সরকার গঠনের আর্জি জানাবেন। শুভেন্দুর নাম ঘোষণার পর শাহ বলেন, ‘‘গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত সর্বত্র বিজেপি-র সরকার গঠিত হল। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মভূমিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আদর্শের অনুসারী সরকার তৈরি হয়েছে।’’
মুখ্যমন্ত্রী যে শুভেন্দুই হচ্ছেন, তা নিয়ে কৌতূহল থাকলেও খুব একটা সংশয় ছিল না পদ্মশিবিরে। ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকে মুখ্যমন্ত্রীর পদে তাঁকেই সবচেয়ে জোরালো দাবিদার বলে মনে করা হচ্ছিল। কারণ, তিনি পর পর দু’বার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে ভোটের লড়াইয়ে পরাস্ত করেছেন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু নিজের কেন্দ্র নন্দীগ্রাম থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েন। জিতেছিলেন ১৯৫৬ ভোটে। নিজের ঘরের মাঠে মমতাকে হারানোর পর এ বার মমতার পাড়ায় এসে তাঁকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন শুভেন্দু। নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর, দু’টি কেন্দ্র থেকে তিনি ভোটে লড়েছেন। মমতার বিরুদ্ধে শুধু জয়ই পাননি, আগের চেয়ে সেই জয়ের ব্যবধানও অনেক বাড়িয়েছেন। ভবানীপুরে মমতাকে তিনি হারিয়েছেন ১৫ হাজারের বেশি ভোটে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরোধী দলনেতা এবং মুখ্যমন্ত্রীর এমন ‘সম্মুখসমর’ বেশ বিরল। আগে এমন কেউ দেখেছেন বলে মনে করতে পারছেন না। তা ছাড়া, মুখ্যমন্ত্রীকে ভোটে হারিয়ে দিচ্ছেন বিরোধী দলনেতা স্বয়ং— এমনটাও বড় একটা দেখা যায়নি। ভবানীপুরের পাশাপাশি নন্দীগ্রামেও শুভেন্দু জিতেছেন। সেখানে তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র করকে তিনি হারিয়েছেন প্রায় ১০ হাজার ভোটে। এর পর বিজেপির অন্দরেই কেউ কেউ বলতে শুরু করেছিলেন, মুখ্যমন্ত্রীপদের যোগ্য দাবিদার শুভেন্দু। অন্য কাউকে এই দায়িত্ব দেওয়া সঙ্গত হবে না।
এর পরেও বিজেপি সরকারের নতুন মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন, তা নিয়ে জল্পনা ছিল। তার একটা কারণ অবশ্যই দলের ইতিহাস। অতীতে দেশের অনেক রাজ্যেই সরকার গঠন করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণায় চমকে দিয়েছেন বিজেপি নেতৃত্ব। এমন কাউকে শাসকদলের পরিষদীয় দলনেতা নির্বাচন করা হয়েছে, যাঁর কথা কেউ ভাবেননি। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও তেমন কিছু করা হবে কি না, জল্পনা ছিল। তবে একাংশের মতে, অন্য রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীপদে খুব বেশি চমক দেওয়ার সুযোগ ছিল না। মমতাকে ভবানীপুরে হারিয়ে শুভেন্দু মুখ্যমন্ত্রীপদে নিজের দাবি অনেক জোরদার করে ফেলেছিলেন। তা উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। করলে দলের অন্দরেই একটি অংশে ক্ষোভ তৈরি হতে পারত। নির্বাচনে এত বড় জয়ের পর সেই ঝুঁকি আর নেননি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২৯৩টির ভোটের ফল জানা গিয়েছে গত ৪ মে। ২০৭টিতেই জয়ী হয়েছেন বিজেপি প্রার্থীরা। তৃণমূল ৮০টি আসনে জিতেছে এবং ছ’টি আসন পেয়েছে বাম, কংগ্রেস ও অন্য দলগুলি। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা কেন্দ্রে আগামী ২১ তারিখ পুনর্নির্বাচন হবে। তার আগে শনিবার বিজেপির শপথগ্রহণ উপলক্ষে কলকাতায় আসবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। শাহ শুক্রবার সকালেই শহরে চলে আসেন। দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে পুজোও দেন তিনি। তাঁদের উপস্থিতিতে নতুন সরকারের শপথগ্রহণ নিয়ে এখন সাজোসাজো রব রাজ্য বিজেপির অন্দরে।
পশ্চিমবঙ্গের সপ্তদশ বিধানসভার মেয়াদ ছিল বুধবার, ৭ মে পর্যন্ত। সে দিনই লোক ভবন থেকে বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি জারি করেন রাজ্যপাল। বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার অর্থ হল, সরকার আর নেই। সাধারণত, ক্ষমতার পালাবদলের ক্ষেত্রে নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিয়ে যে কোনও বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। নতুন সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত তাঁকেই তদারকি মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালনের জন্য রাজ্যপাল অনুরোধ করেন। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে তা হয়নি। বিজেপি-ঝড়ে উড়ে গিয়েও হার স্বীকার করেননি তৃণমূলনেত্রী মমতা। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রীপদ থেকে ইস্তফা দেবেন না। কারণ, তাঁর দল হারেনি। জোর করে ভোট লুট করে তাঁদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন মমতা। আইনি লড়াইয়ের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ভোটে হেরে যাওয়ার পরেও মুখ্যমন্ত্রী ইস্তফা না-দেওয়ায় অভূতপূর্ব পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। রাজ্যপাল চাইলে বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মুখ্যমন্ত্রীপদ থেকে মমতাকে বরখাস্ত করতে পারতেন। কিন্তু তা করেননি। আবার তাঁকে নতুন সরকারের শপথ পর্যন্ত ‘তদারকি মুখ্যমন্ত্রী’ হিসাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথাও বলেননি। ফলে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শনিবার পর্যন্ত রাজ্যের শাসনভার আপাতত সরাসরি রাজ্যপালের হাতে। অনেকের মতে, তিনি চাইলে দেড় দিনের জন্য পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে পারতেন। তবে তা করা হয়নি। এই পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের গঠন নিয়ে যাবতীয় জল্পনার অবসান হল শুক্রবার। শুভেন্দুর নেতৃত্বেই আগামী পাঁচ বছর রাজ্য চালাবে নির্বাচিত বিজেপি সরকার।