ছুটি বাতিল সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করেছে কলকাতা হাই কোর্ট। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) শেষ পর্যায়ের কাজে একটা বড় অংশের ভার বিচার বিভাগের উপর দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবারের শুনানিতে দেশের শীর্ষ আদালত জানায়, এসআইআরের কাজে তথ্যগত অসঙ্গতির যে সমস্ত ঘটনা ঘটেছে, সেগুলির নিষ্পত্তি করবেন কলকাতা হাই কোর্ট নিযুক্ত আধিকারিকেরা! সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেই শনিবার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে রাজ্যের সকল বিচারকের ছুটি বাতিল করল উচ্চ আদালত। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট জানানো হয়, অসুস্থতা ছাড়া আগামী ৯ মার্চ পর্যন্ত কোনও বিচারক ছুটি নিতে পারবেন না। অন্য দিকে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে শনিবার এসআইআর নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে বসেছিলেন কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল। সেই বৈঠকে একাধিক প্রস্তাব দেয় নির্বাচন কমিশন।
শনিবার বিকেলে কলকাতা হাই কোর্টে প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের নেতৃত্বে বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী, মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়াল। ছিলেন ডিজিপি, অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল এবং অ্যাডভোকেট জেনারেলও। সূত্রের খবর, সেই বৈঠকে কমিশনের তরফে প্রস্তাব দেওয়া হয়, প্রতি বিধানসভার জন্য এক জন করে বিচার বিভাগীয় (জুডিশিয়াল) অফিসার নিয়োগের জন্য।
কমিশন বৈঠকে আরও জানিয়েছে, বিধানসভা, জেলাভিত্তিক তথ্যগত অসঙ্গতির (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) তালিকা বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের দেবে তারা। সোমবার থেকে আবার নথি যাচাই এবং নিষ্পত্তির কাজ শুরু হবে। শনিবার দেড় ঘণ্টার বেশি বৈঠক হয় হাই কোর্টে।
এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন এনডিপিএস, পকসো আইন এবং অন্যান্য বিশেষ আইনের ধারায় দায়ের হওয়া মামলার শুনানির জন্য বিভিন্ন জেলায় বিচারকদের দায়িত্ব দিল কলকাতা হাই কোর্ট। সেই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। কোন বিচারককে কোন জেলায় কোন আদালতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তার তালিকাও দিয়েছে হাই কোর্ট।
উদ্বেগপ্রকাশ প্রধান বিচারপতির
বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের প্রায় ৪৫-৫০ লক্ষ ভোটারের নথি যাচাই এবং নিষ্পত্তি করতে হবে। এত কম সময়ের মধ্যে সেই কাজ শেষ করা যাবে কি না, তা নিয়ে বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করেন কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি! সূত্রের খবর, আপাতত ২৫০ জন জুডিশিয়াল অফিসার দেওয়া সম্ভব বলে তিনি জানিয়েছেন। রবিবার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে একটি ভার্চুয়াল বৈঠক করতে পারেন হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি। সেখানে যাবতীয় কাজ নিয়ে আলোচনা হবে।
ছুটি বাতিল
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর শনিবার বিজ্ঞপ্তি জারি করে সকল বিচারকের ছুটি বাতিলের কথা জানায় হাই কোর্ট। বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়েছে, যাঁদের বদলি হয়েছে, তাঁদের নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে নতুন জায়গায় যোগ দিতে হবে। তাঁরা ‘ট্রানজিট লিভ’ নিতে পারবেন না। শুধু তা-ই নয়, আগামী ৯ মার্চ পর্যন্ত বিচার বিভাগীয় আধিকারিক এবং বিচারকদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি স্থগিত থাকবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। রাজ্যের বাইরে কোনও প্রশিক্ষণ বা সেমিনারে অংশগ্রহণের অনুমতিও বাতিল করা হয়েছে।
ছুটি বাতিলের তালিকায় কারা?
কাদের ছুটি বাতিল হবে বিজ্ঞপ্তিতে সে বিষয়েও জানানো হয়েছে। জেলা ও দায়রা বিচারক, মুখ্য বিচারক, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক, বিশেষ সিবিআই আদালতের বিচারক, বাণিজ্যিক আদালতের বিচারক, বিশেষ আদালত (এমপি ও এমএলএ-দের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা), এক্সক্লুসিভ পকসো আদালত, সিটি সিভিল কোর্ট ও সিটি সেশনস কোর্টের বেঞ্চে কর্মরত বিচারক এবং যাঁরা ডেপুটেশনে রয়েছেন, তাঁদের সকলের ছুটি বাতিল থাকবে। ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের বিচারকদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। হাই কোর্ট আরও জানিয়েছে, চিকিৎসাজনিত কারণ ছাড়া যাঁরা ছুটিতে রয়েছেন আগামী সোমবারের মধ্যে তাঁদের কাজে যোগ দিতে হবে। নির্দেশ অমান্য হলে, তা কঠোর ভাবে দেখা হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
কী নির্দেশ শীর্ষ আদালতের?
এসআইআর মামলায় শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টে প্রশ্নের মুখে পড়ে রাজ্য। শুনানিতে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, রাজ্য এবং নির্বাচন কমিশনের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে! এই বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশও করে শীর্ষ আদালত। তার পরেই আদালত এক বেনজির নির্দেশ দেয়। আদালত জানায়, এসআইআরের কাজে তথ্যগত অসঙ্গতির যে সমস্ত ঘটনা ঘটেছে, সেগুলির নিষ্পত্তি করবেন কলকাতা হাই কোর্ট নিযুক্ত আধিকারিকেরা। কমিশন এবং রাজ্য সরকারের আধিকারিকেরা কেবল বিচারবিভাগীয় ওই আধিকারিকদের সহায়তা করবেন। সুপ্রিম কোর্ট এ-ও জানিয়েছিল, এসআইআরের কাজে বর্তমান বিচারক এবং অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত জেলা বিচারকদের নিয়োগ করবে হাই কোর্ট। প্রতি জেলায় কয়েক জন করে বিচার বিভাগীয় আধিকারিক নিয়োগ করা হবে। তাঁরা ২৮ ফেব্রুয়ারি, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ পর্যন্ত কাজ করবেন। আগামী ১০ মার্চ আবার এই মামলার পরবর্তী শুনানি। হাই কোর্টের নির্দেশ মোতাবেক তার আগের দিন পর্যন্ত সকল বিচারকের ছুটি বাতিল থাকবে।
অভিষেকের অভিযোগ
শনিবারও কমিশনের উপরে ক্ষোভ উগরে দেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, কমিশন পরিকল্পিত ভাবে আইন এবং আদালতের নির্দেশ লঙ্ঘন করছে। সমাজমাধ্যমের এক পোস্টে এমনই তিন লঙ্ঘনের কথা তুলে ধরেন অভিষেক। তাঁর দাবি, এসআইআরের কাজে কমিশনের পোর্টালে বদল আনা হয়েছে। এখন থেকে ইআরও-রা আর এইআরও-দের কাজের উপর নজরদারি চালাতে পারছেন না। অভিষেকের আরও দাবি, এ হেন বদল এনে কমিশন জনপ্রতিনিধি আইনের ১৩বি এবং ১৩সি ধারা লঙ্ঘন করেছে। অভিষেকের মতে, এই সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরিপন্থী। কমিশন গত বছর একটি নির্দেশিকা জারি করে জানিয়েছিল, যোগ্য ভোটারের নাম বাদ না-পড়া নিশ্চিত করা হবে। কিন্তু কমিশনের বর্তমান ব্যবস্থায় সেই নির্দেশও লঙ্ঘন হচ্ছে। তৃণমূল সাংসদের অভিযোগ, কমিশনের পোর্টালে ইআরও-দের ক্ষমতা খর্ব করে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে।