পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।
রাজ্যের সাত আধিকারিককে সাসপেন্ড (নিলম্বিত) করেছে নির্বাচন কমিশন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেই সাত আধিকারিককে নিয়ে মুখ খুললেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি স্পষ্ট জানান, তাঁরা চাকরিচ্যুত হচ্ছেন না। তবে থাকবেন না নির্বাচনের কাজে। একই সঙ্গে মমতার অভিযোগ, ওই সাত আধিকারিককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। তিনি এ-ও জানান, রাজ্য সরকার তাঁদের পাশে রয়েছে এবং প্রয়োজনে পদোন্নতিও দেওয়া হবে।
মঙ্গলবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে প্রথম থেকেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরব হন মমতা। কমিশনকে ‘তুঘলকি কমিশন’ বলেও কটাক্ষ করেন তিনি। তার পরেই সাসপেন্ড হওয়া সাত আধিকারিককে নিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে দেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘তাঁরা কাজ করবেন। নির্বাচনের কাজের বাইরে অন্য কাজ করবেন। জেলায় ভাল কাজই করবেন। তাঁরা চাকরিচ্যুত হচ্ছেন না।’’
কমিশনের উদ্দেশে মমতার প্রশ্ন, ‘‘ইআরও-দের সাসপেন্ড করার কারণ কী? যে ইআরও-দের সাসপেন্ড করলেন, তাঁদের কাছে জানতে চেয়েছেন, আপনাদের অপরাধটা কী, দোষটা কী?’’ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “যদি কেউ অন্যায় করে থাকে, তা রাজ্যকে জানানো যেত। আমরা ভদ্রতা করে কমিশনের নির্দেশ মেনেছি। কিন্তু শাস্তি দেওয়ার আগে তাঁদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি।” তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট কয়েক জন আধিকারিককে তিনি ব্যক্তিগত ভাবে চেনেন এবং তাঁরা দিনরাত পরিশ্রম করে কাজ করেছেন।
দলীয় শৃঙ্খলা ব্যবস্থার কথা মনে করিয়ে দেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘দলীয় শৃঙ্খলা ব্যবস্থায় কাউকে সাসপেন্ড করার আগে শো কজ় করা হয়। শো কজ়ের জবাব পর্যালোচনা করে শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সুপারিশে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ‘সাসপেন্ড উইথ পেন্ডিং ইনভেস্টিগেশন’—এই প্রক্রিয়াই আমাদের নিয়ম। এখানে তদন্ত না-করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’’ তার পরেই তিনি আশ্বাস দেন, নির্বাচনী কাজের বাইরে অন্য কাজ করবেন সাসপেন্ড হওয়া ওই সাত আধিকারিক। মমতা এ-ও জানান, যাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাঁদের পাশে থাকবে সরকার।
যে সাত আধিকারিককে সাসপেন্ড করা হয়, তাঁরা সকলেই রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এর কাজে এইআরও হিসাবে কাজ করছিলেন। তবে এসআইআরের কাজে তাঁদের বিরুদ্ধে অসদাচরণ, কর্তব্যে গাফিলতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তোলে কমিশন। সেই বিষয় উল্লেখ করে ওই সাত আধিকারিককে সাসপেন্ড করার নির্দেশ দিয়ে রবিবার মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীকে চিঠি পাঠায় কমিশন। কিন্তু রাজ্য সরকার কোনও পদক্ষেপ করার আগেই ওই আধিকারিকদের সাসপেন্ড করে দেয় খোদ কমিশন। পাশাপাশি, এইআরও দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁদের।
উল্লেখ্য, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং পূর্বের দুই এইআরও সত্যজিৎ দাস এবং জয়দীপ কুন্ডু, জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়ির এইআরও ডালিয়া রায়চৌধুরী, মুর্শিদাবাদের শমসেরগঞ্জের এইআরও শেফাউর রহমান, ফরাক্কার এইআরও নীতীশ দাস, সুতির এইআরও শেখ মুর্শিদ আলম এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের ডেবরার এইআরও দেবাশিস বিশ্বাসকে সাসপেন্ড করার নির্দেশ দিয়েছিল কমিশন। শুধু সাসপেন্ড নয়, তাঁদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে পদক্ষেপ করার কথা জানানো হয়েছিল। তবে সোমবার সরাসরি কমিশনই সাসপেন্ড করে দেয় তাঁদের। তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে মুখ খুললেন মমতা।
পাশাপাশি, কমিশন এবং এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মমতা। কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কড়া সমালোচনা শোনা যায় তাঁর বক্তব্যে। মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, ইআরও, ডিএম এবং পুলিশ প্রশাসনকে ভয় দেখানো হচ্ছে। তাঁর কথায়, “ভোট ঘোষণা হওয়ার পরই নির্বাচন বিধি কার্যকর হয়। তার আগে কেন এই পদক্ষেপ? জনগণের টাকা খরচ করে প্রচার করছেন, আবার গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিচ্ছেন— এটা রাবণের সীতা হরণের মতো।’’ মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র নামে সংখ্যালঘু, তফসিলি ও গরিব মানুষদের টার্গেট করা হচ্ছে এবং যুব প্রজন্মের অধিকার খর্ব করা হচ্ছে।
এসআইআর নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন, “২৪ বছর সময় ছিল। আগে থেকে শুরু করলেন না কেন? পুজো-বড়দিনের সময়ে এই সব করা হল কেন?” কমিশনকে ‘তুঘলকি’ মনোভাবের অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বলেন, “ভাবছেন চেয়ারটা স্থায়ী। ডোন্ট কেয়ার মনোভাব দেখাচ্ছেন।” এক বিএলও-র মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “মৃত্যুর আগে সুইসাইড নোট লিখে গিয়েছেন। যদি ইআরও-র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তবে কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।” মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, তাঁর দল সংবিধান মেনেই চলে এবং গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। মমতার হুঁশিয়ারি, “কেউ যদি মানুষের অধিকার কেড়ে নিতে চায়, নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আগেই শেষ করতে চায়, আমরা চুপ করে থাকব না। আমাকে আঘাত করলে আমি প্রত্যাঘাত করব।’’