মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
গুজরাত, উত্তরপ্রদেশের অনুসরণে সংগঠিত সমাজবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কড়া আইন তৈরি করছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিজ় বিল, ২০২৬’ নামাঙ্কিত এই বিলের গেজেট নোটিফিকেশন হয়েছে গত বুধবার। সোমবার বিধানসভায় বিলটি পেশ করা হতে পারে।
এই বিলের সঙ্গেই পেশ হতে চলেছে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেন্য়ান্স অফ পাবলিক অর্ডার ১৯৭২’ আইনের সংশোধনী বিল।
এই সংশোধনী বিলকেই আইনে পরিনত করে যে কোনও সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর এবং ধ্বংসের ঘটনায় অভিযুক্তদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের রাস্তা তৈরি করছে সরকার।
রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরেই মুখ্যমন্ত্রী আভাস দিয়েছিলেন সংগঠিত সমাজবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কঠোর আইন আনা হবে। বিধানসভায় রাজ্যপালের ভাষণের ধন্যবাদসূচক বক্তব্যে তিনি জানিয়ে দেন, চলতি অধিবেশনেই এই আইন আনা হচ্ছে। কলকাতা গেজেটের বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত বিলটিতে বলা হয়েছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সংগঠিত সমাজবিরোধী কার্যকলাপের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই এই আইনের লক্ষ্য।
ভারতীয় ন্যায়সংহিতার সমাজবিরোধী কার্যকলাপ বিরোধী বিভিন্ন ধারার থেকে এই আইনকে আলাদা করেছে মূলত দু’টি অংশ।
এক, কোনও ব্যক্তি জনসাধারণের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত হলে এই আইনবলে তাঁকে এক বছর পর্যন্ত প্রতিরোধমূলক আটক (প্রিভেনটিভ অ্যারেস্ট) করে রাখা যাবে।
দুই, এই আইনের সঙ্গে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার উপযুক্ত ধারা প্রয়োগ করে এই ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সংস্থান থাকছে সরকারের হাতে।
কী কী অপরাধকে সংগঠিত সমাজবিরোধী কার্যকলাপ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে?
১। যে কার্যকলাপ সাধারণ মানুষের জীবনে বিপদ ডেকে আনতে পারে; জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করে এবং বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য ও পেশাগত কার্যকলাপে বাধা সৃষ্টি করে।
২। প্রাকৃতিক সম্পদের অবৈধ খনন, বনজ সম্পদের লুট বা সরকারি সম্পদের ক্ষতি করাও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ।
বিলে ‘গুন্ডা’ হিসেবে কাদের গণ্য করার কথা বলা হয়েছে?
ক) সমাজবিরোধী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, বা এই ধরনের কোনও গোষ্ঠীর সদস্য বা নেতা।
খ) যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১১১ এবং ১১২ ধারায় সংগঠিত অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগে চার্জশিট জমা পড়েছে।
গ) অস্ত্র আইন, মাদক আইন, মানবপাচার প্রতিরোধ আইন এবং বিস্ফোরক আইন মোতাবেক অপরাধে যুক্ত ব্যক্তি বা অপরাধীকে সাহায্যকারী ব্যক্তি।
ঘ) সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক বলে পরিচিত ব্যক্তি।
এই আইনে কী ভাবে কোনও ব্যক্তিকে আটক করা হবে?
পুলিশ সুপার বা তাঁর উপরের পদমর্যাদার কোনও পুলিশ আধিকারিকের দেওয়া রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে রাজ্য সরকার কোনও ব্যক্তিকে এই আইনে আটকের নির্দেশ দিতে পারে।
পুলিশ কমিশনার বা জেলাশাসক এই আইনে আটকের নির্দেশ দিলে, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে থাকা তথ্যপ্রমাণ দিয়ে অবিলম্বে রাজ্যের ডিজিপি-কে জানাতে হবে।
তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে কোনও ব্যক্তিকে আটক করলে, ১৫ দিনের মধ্যে সরকারের অনুমোদন নিতে হবে।
কোনও ব্যক্তিকে আটকের জন্য চিহ্নিত করার পরে তিনি ফেরার হয়ে গেলে, তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে যাবে পুলিশ। আদালত অভিযুক্তকে হাজিরা দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেবে। তার পরেও তিনি হাজিরা না-দিলে আদালত পরোয়ানা জারি করতে পারে। সেই পরোয়ানার উপর ভিত্তি করে অভিযুক্তের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সংস্থান থাকছে এই আইনে।
অ্যাডভাইসরি বোর্ড
এই আইন কার্যকর করতে অ্যাডভাইসরি বোর্ড তৈরি করবে সরকার।
আটক করা কতটা যুক্তিযুক্ত এই বোর্ড তা বিচার করবে। সেখানে আটক ব্যক্তি আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য প্রতিনিধি নিয়োগ করতে পারবন। অ্যাডভাইসরি বোর্ডের প্রধান হবেন হাই কোর্টের বর্তমান বা প্রাক্তন বিচারপতি। পাশাপাশি আরও দু’জন সদস্য থাকবেন, যাঁরা উচ্চ আদালতের বিচারপতি হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন।
বহিষ্কারের ক্ষমতা
অশান্তি পাকাতে পারেন, এমন আশঙ্কা থেকে কোনও ব্যক্তিকে কোনও এলাকায় থেকে বহিষ্কার করার বা সেখানে তাঁর প্রবেশ নিষিদ্ধ করার ক্ষমতাও পুলিশকে এই আইনে দেওয়া হচ্ছে। এই আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে পুলিশ এবং সরকারি কর্মীদের রক্ষাকবচের উল্লেখও রয়েছে এই আইনে।
সংশোধনী বিলে ক্লেমস কমিশন তৈরির কথা বলা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলাশাসক বা তার উপরের কোনও সরকারি আধিকারিক হবেন ক্লেমস কমিশনার। বিক্ষোভ, প্রতিবাদ আন্দোলনের নামে সরকারি বা বেসরকরি সম্পত্তি ধ্বংস করলে ক্লেমস কমিশনের কাছে আবেদন করা যাবে ক্ষতিপূরণের জন্য। কমিশন জেলা বিচারক পদমর্যাদার বিচারবিভাগীয় আধিকারিকের নেতৃত্বে খতিয়ে দেখবে সেই দাবি। এর পর নির্ধারিত হবে ক্ষতিপূরণ। ঘটনায় অভিযুক্তদের কাছ থেকে সেই ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় করবে সরকার।
সংগঠিত অপরাধ রোখার সঙ্গে সঙ্গে অশান্তি রুখতে আদিত্যনাথের মডেলে ক্ষতিপূরণ আদায়ের মডেল হাতিয়ার করে রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলার রাশ কড়া হাতে ধরতে চাইছে সরকার।
সংগঠিত অপরাধ রুখতে উত্তরপ্রদেশে ইতিমধ্যেই চালু হয়েছে ‘উত্তরপ্রদেশ গ্যাংস্টার আইন’ এবং ‘উত্তরপ্রদেশ সংগঠিত অপরাধ দমন আইন’। ২০১৫ সালে ‘গুজরাত সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ এবং সংগঠিত আপরাধ দমন আইন’ চালু হয়েছে ১৯৮৫ সালের আইনে আরও পরিবর্তন এনে। এই দু’টি আইনকেই গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধের সরকারি হাতিয়ার আখ্যা দিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলি।