(বাঁ দিকে) কলকাতা প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (ডান দিকে)। — নিজস্ব চিত্র।
তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ ভেঙে পড়ে বিপর্যয়ের জন্য পূর্বতন তৃণমূল সরকারকেই দায়ী করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার দুপুরের এই দুর্ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত ২০ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তৃণমূলকে বিঁধে বৃহস্পতিবার বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘সব জায়গায় টাকা নিতে নিতে সিটি অফ জয়কে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছে। এটা (এই দুর্ঘটনা) আপনাদের পাপের ফল।’’ ভেঙে পড়া গুদামের নকশায় কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমেরও সই রয়েছে বলে জানিয়েছেন শুভেন্দু। তাঁর মন্তব্য, ‘‘কাউকে ছাড়া হবে না।’’
তৃণমূল আমলে ছাড় পাওয়া সমস্ত নির্মাণকাজের নকশা খতিয়ে দেখতে কলকাতা পুরসভা এলাকায় সমস্ত বাড়ি তৈরির কাজ আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত রাখা হবে বলে বুধবারই জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বৃহস্পতিবার তিনি জানান, কলকাতা পুরসভা ছাড়াও রাজারহাট, পূজালি, বজবজ, সোনারপুর, মহেশতলা-সহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় আগামী ৪ সপ্তাহ সমস্ত নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা হচ্ছে। সব রিপোর্ট অডিট হওয়ার পরে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলে এ দিন বিধানসভায় ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সকালেই শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলির প্রতি সমবেদনা ব্যক্ত করে পরিবারপিছু দু’লক্ষ টাকা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মুখ্যমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, আহতদের ১ লক্ষ টাকা করে দেবে রাজ্য সরকার। কেন্দ্রের তরফে তাঁদের ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
তারাতলার ভেঙে পড়া গুদামের নকশার ছাড়পত্র গত ১৭ জানুয়ারি কলকাতা পুরসভা দিয়েছিল বলে বুধবার জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বৃহস্পতিবার বিধানসভায় তিনি এই সংক্রান্ত নথি দেখিয়ে তিনি দাবি করেন, তাতে কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের স্বাক্ষর রয়েছে। তাঁর মন্তব্য, “এই দেখুন মাননীয় ফিরহাদ হাকিমের সই। দেখুন আপনারা কী ভাবে, স্ট্রাকচারে ডিফেক্ট থাকা অবস্থায় ফল্টি প্ল্যান অ্যাপ্রুভ করেছেন। ফল্টি ডিজ়াইন। এই রকম কত কাণ্ড করে রেখেছেন, তার ঠিক নেই।” মুখ্যমন্ত্রী যখন এই অভিযোগ করছেন, ফিরহাদ হাকিম তখন বিধানসভায় উপস্থিত ছিলেন না। পরে বিধানসভায় এলেও এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
তৃণমূলের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে মুখ্যমন্ত্রী এ দিন আরও বলেন, “কী করেছেন আপনারা! একটাকেও তো ছাড়ার কোনও সিন নেই। আমরা পুরো ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং বের করেছি। কোনও ছাড়াছাড়ির সিন নেই।”
কলকাতা পুরসভা থেকে বিল্ডিং প্ল্যান পাশ করানোর প্রসঙ্গে
মুখ্যমন্ত্রী এ দিন ‘কালী’ নামে এক ব্যক্তির কথা বলেছেন। সূত্রের খবর, কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় নামে রাজ্য সরকারি ওই কর্মচারী মেয়র
ফিরহাদ হাকিমের ওএসডি (অফিসার অন স্পেশ্যাল ডিউটি) ছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “পুরসভায় কী হয়েছে আমরা
জানি না? কালীকে
তুললে সব বেরিয়ে যাবে। কলকাতা পুরসভায়
কালী না-বললে কোনও প্ল্যান হয় না। সবাই জানে কালীকে নিয়োগ করেছে ক্যামাক স্ট্রিট।
এই কালী বাইপাসের পাশে আপনাদের তৃণমূল ভবন বানাচ্ছে ২০০ কোটি টাকা দিয়ে। এখান থেকে
টাকা তুলে ওখানে পাঠায়। আমরা সব জানি, সব বার করেছি।”
কলকাতা পুরসভা এলাকায় তৃণমূল জমানায় পাশ হওয়া সমস্ত বাড়ি, বিশেষ করে বাণিজ্যিক নির্মাণের কাজ ৩১ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত রাখা হবে বলে বুধবারই জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। এ দিন সেই পরিসর আরও বাড়িয়ে তিনি বলেন, ‘‘কলকাতা পুরসভা, রাজারহাট-নিউটাউন, মহেশতলা, বজবজ, পূজালি, বিষ্ণুপুর গ্রামীণ এলাকা, সোনারপুর, বারুইপুর পুর এলাকায় জরুরি পরিষেবা ছাড়া সমস্ত নির্মাণকাজ চার সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখলাম। সমস্ত অনুমোদিত প্ল্যান অডিট হবে। এর জন্য কমিটি তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। এই কমিটির নেতৃত্ব দেবেন অতিরিক্ত মুখ্যসচিব রাজেশ পাণ্ডে। কমিটিতে থাকবেন অতিরিক্ত মুখ্যসচিব খলিল আহমেদ, বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের প্রধানসচিব রাজেশ কুমার সিংহ, কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ, কলকাতার পুর কমিশনার ও পুর প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডে, শ্রম দফতরের সচিব রচনা ভগত। এ ছাড়া পূর্ত দফতরের প্রধান ইঞ্জিনিয়ার, ডিজি বিল্ডিং (কেএমসি), ডিজি দমকলের একজন করে প্রতিনিধি থাকবেন। খড়্গপুর আইআইটি-র একজন প্রতিনিধি এবং রাইটস ও ইরকমের এক জন করে প্রতিনিধিও থাকবেন কমিটিতে।’’
বিপর্যয় মোকাবিলা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়েও এ দিন তৃণমূল জমানার দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তারাতলার গুদামটিতে ভারী ভারী লোহার বিমের উপরে ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছিল। ভার নিতে না-পেরে সবসুদ্ধ ভেঙে পড়ে। ছাদের নীচে চাপা পড়েন শ্রমিকেরা। কিন্তু লোহার বিম কাটার মতো কোনও যন্ত্রই রাজ্য সরকারের ভাঁড়ারে ছিল না বলে অভিযোগ শুভেন্দুর। তৃণমূলের পরিষদীয় দলের মুখ্য সচেতক আখরুজ্জামানের উদ্দেশে তিনি বলেন, “ভারী বিম কাটার কোনও মেশিন রাখেননি আপনারা। আপনাদের সরকার ১৫ বছরে অনেক কাণ্ড করেছে। লোহা কাটার মেশিনটা পর্যন্ত কেনেননি। কেন এই ক্ষতিটা করে দিয়ে গিয়েছেন বাংলার? কোনও আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। কোনও পেশাদার টিম নেই।”
এই অবস্থায় ভারতীয় সেনাই ত্রাতা হয়ে আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে হাজির হয় বলে জানান তিনি। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ভারতীয় সেনা ২১৫ জন জওয়ানকে পাঠায় উদ্ধারকাজে সাহায্যের জন্য। তিনি বলেন, “ওই লোহা পড়লে কেউ বাঁচে না। বিহার রেজিমেন্ট সমস্ত আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে এসেছে বলে ২০টা লোককে জীবিত বার করতে পেরেছি।” মুখ্যমন্ত্রী জানান, বুধবারের দুর্ঘটনার পর ৩০ মিনিটের মধ্যে উদ্ধারকাজ শুরু হয়। কলকাতা পুলিশ, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, সেনা এবং সিভিল ডিফেন্স একযোগে উদ্ধারকাজে হাত লাগায়। সেই উদ্ধারকাজ এখনও চলছে।