বেপরোয়া সেই গাড়ি। শুক্রবার, উল্টোডাঙায়। ছবি: সুদীপ্ত ভৌমিক।
কলকাতা শহরে ফের বেপরোয়া গাড়ির দৌরাত্ম্য। যার জেরে শুক্রবার, সরস্বতী পুজোর দিন দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল এক পথচারীর। জখম হলেন দু’জন।
এ দিন সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ কাঁকুড়গাছির দিক থেকে উল্টোডাঙার দিকে তীব্র গতিতে ছুটে যাচ্ছিল গাড়িটি। গাড়ির সামনে এবং পিছনে লাগানো ছিল ‘অ্যাডভোকেট’ লেখা স্টিকার। মানিকতলা থানা এলাকার সিআইটি রোডে বেপরোয়া গাড়িটি প্রথমে দুই পথচারীকে ধাক্কা মারে। তাঁদের মধ্যে এক জন একটি স্কুটারের পাশে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কথা বলছিলেন। গাড়িটি স্কুটারেও ধাক্কা মারে। তার পরে ফুটপাতে উঠে একটি গাছে ধাক্কা খায়। এর পরে গাড়িটি ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তিকে পিষে দেয়। তাঁকে হিঁচড়ে কিছু দূর নিয়ে গিয়ে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে পড়ে গাড়িটি। গাড়ির সামনে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় পড়েছিলেন ওই পথচারী।
পুলিশ জানিয়েছে, পিষে যাওয়া পথচারীকে উদ্ধার করে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। মৃতের নাম মহম্মদ মইদুল ইসলাম (২২)। মৃত এই কলেজপড়ুয়ার বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনার হাড়োয়ায়। জখম দুই পথচারীর নাম জামালউদ্দিন মোল্লা এবং সৌমিত্রশঙ্কর দাস। তাঁদের বাড়ি যথাক্রমে উত্তর ২৪ পরগনার হাড়োয়ায় এবং মানিকতলা মেন রোডে। তাঁদেরও প্রথমে আর জি করে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে জামালউদ্দিনকে নিয়ে যাওয়া হয় এসএসকেএমে। এখন তিনি সেখানেই ভর্তি রয়েছেন। প্রৌঢ় সৌমিত্রশঙ্করকে আর জি কর থেকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আপাতত সেখানেই চিকিৎসাধীন।
দুর্ঘটনার পরেই ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন স্থানীয় লোকজন। আসে মানিকতলা থানার পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গাড়িটি বেপরোয়া গতিতে ছুটে আসছিল। ওই গাড়িতে চালক ছাড়াও পিছনের আসনে এক ব্যক্তি ছিলেন, সঙ্গে ছিল একটি বাচ্চা মেয়ে। চালক-সহ গাড়িটি হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে, চালক বেপরোয়া গতির কারণেই গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টোডাঙা মোড়ের কিছু আগে এই মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটান। তবে, এর পিছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। পুলিশ সূত্রের খবর, ওই গাড়িটি ২০২১ সালে নথিভুক্ত করা হয়েছিল। বর্তমানে গাড়িটির বিরুদ্ধে কোনও মামলা ঝুলে নেই। তবে অতীতে গাড়িটির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে।
এর আগেও শহরে বেপরোয়া গাড়ি বহু দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। ঘটেছে প্রাণহানিও। সম্প্রতি তপসিয়া মোড়ে সরকারি বাস উল্টে যাওয়ায় জখম হয়েছিলেন বহু যাত্রী। গত বছর বি টি রোডে বেপরোয়া বাসের ধাক্কায় এবং মানিকতলায় বেপরোয়া লরির ধাক্কায় প্রাণ গিয়েছে দুই স্কুলছাত্রের। এ বার সরস্বতী পুজোর দিন সকালে বেপরোয়া গাড়ির ধাক্কায় সিআইটি রোডে প্রাণ গেল এক পথচারীর। গাড়িটি বেপরোয়া গতিতে চললেও আগেই সেটি কেন পুলিশের নজরে পড়েনি, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
এ দিন ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, রাস্তায় পড়ে রয়েছে গাড়ি ও স্কুটারের ভাঙা অংশ, জুতো। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মইদুল বাস ধরার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। ঘটনাস্থলের কাছেই জুতো সারানোর কাজ করেন জয় দাস। তিনি বলেন, ‘‘আমি তখন সকালের খাবার খেয়ে হাত ধুচ্ছিলাম। আচমকা একটা বিকট আওয়াজ। যেন গোটা এলাকা কেঁপে উঠল। ছুটে গিয়ে দেখি, কয়েক জন রাস্তায় পড়ে রয়েছেন। একটি গাড়ি ফুটপাতে উঠে গিয়েছে। গাড়ির সামনে পড়ে রয়েছেন রক্তাক্ত এক ব্যক্তি। তাঁর অর্ধেক শরীর গাড়ির তলায়।’’ জয় আরও জানান, দুর্ঘটনার পরে গাড়িতে থাকা বাচ্চা মেয়েটি ভয়ে কাঁদতে শুরু করে। কাঁদতে কাঁদতে সে বলে, বাবা বার বার চালককে আস্তে গাড়ি চালাতে বললেও চালক শোনেননি।
ওই গাড়ি ও স্কুটারটি নিয়ে যাওয়া হয় মানিকতলা থানায়। গাড়ির সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাচও। স্কুটারের পিছনের অংশ ভেঙে গিয়েছে।
মইদুলের পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, তিনি ভাঙড় কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ঘটনার খবরে হাড়োয়ার গোয়ালপোতা গ্রামে তাঁর বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে আসে। দরিদ্র পরিবারের সন্তান মইদুল প্রায়ই কলকাতায় আসতেন নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করতে। তাঁর বাবা নজরুল মোল্লা গোয়ালপোতা গ্রামে একটি চায়ের দোকান চালান। দুই ছেলে ও এক মেয়ে তাঁদের। এ দিন দিশাহারা বাবা বলেন, ‘‘পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের অভাব মেটাতে আমাকে সাহায্য করার জন্য কলকাতায় একটি বেসরকারি সংস্থায় নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করত মইদুল। এমন দিন যে কখনও দেখতে হবে, দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি।’’