তারাতলায় ভেঙে পড়া নির্মীয়মাণ গুদামের ঘটনায় ধৃত কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদাম ভেঙে পড়ার ঘটনায় ধৃত কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে শুক্রবার আলিপুর আদালতে হাজির করানো হয়। সরকারপক্ষের অভিযোগ, ওই গুদামের নকশা ছিল ত্রুটিপূর্ণ। আর সেই নকশায় অনুমোদন ছিল কালীর! আদালতে পুলিশ সেই সূত্রের কথা উল্লেখ করে জানিয়েছে, ‘টিমওয়ার্ক’ করতেন কালী। আর সেই ‘টিমের’ খোঁজ করছেন তদন্তকারীরা। ধৃতের মাথায় কার হাত রয়েছে? তাঁর রক্ষাকর্তা কে? এই সব প্রশ্নই ভাবাচ্ছে পুলিশকে। আদালতে তাদের আর্জি, হেফাজতে নিয়ে সেই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চায় তারা। আদালত ৪ জুলাই পর্যন্ত কালীচরণকে পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
তারাতলার দুর্ঘটনার পরেই পূর্বতন তৃণমূল সরকারের গাফিলতির দিকে আঙুল তুলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৃহস্পতিবার বিধানসভায় একটি নথি দেখিয়ে তিনি দাবি করেন, ত্রুটিপূর্ণ নকশায় ছাড়পত্র দিয়েছিলেন প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম নিজেই। আর বৃহস্পতিবার রাতেই ফিরহাদের তৎকালীন ওএসডি (অফিসার অন স্পেশ্যাল ডিউটি) কালীচরণকে গ্রেফতার করে পুলিশ। শুক্রবার তাঁকে আদালতে হাজির করিয়ে পুলিশ দাবি করে, তারাতলার ঘটনায় যে অনিয়ম হয়েছে, তার নেপথ্যে ধৃতের ‘টিমওয়ার্ক’!
আদালতে সরকারি আইনজীবী সৌরীন ঘোষাল জানান, ধৃত কী কী কাজ করতেন, তার কিছুটা আভাস পাওয়া যাবে কেস ডায়েরিতে। ইতিমধ্যেই তাঁর বয়ান নেওয়া হয়েছে। পুলিশের দাবি, কোনও নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন থাকলে, সেটা করিয়ে দিতেন কালীচরণ। অর্থাৎ, হবে না এমন কাজও করিয়ে দেওয়ার ‘ক্ষমতা’ ছিল তাঁর। আদালতে ধৃতকে ‘প্রভাবশালী’ও বলেও উল্লেখ করেছে পুলিশ।
শুক্রবারের শুনানিতে বার বার ‘টিমওয়ার্কের’ বিষয়ে জোর দিয়েছে পুলিশ। তাদের দাবি, শুধু একা কালীচরণ নন, অনিয়মের নেপথ্যে আরও অনেকে রয়েছেন। তাঁদের ‘মাথার’ খোঁজ চলছে। এই ‘টিমে’ আর কারা রয়েছেন, তা জানার প্রয়োজন আছে। সৌরীনের প্রশ্ন, ‘‘কালীচরণের রক্ষাকর্তা কে? তাঁর মাথায় কার হাতে রয়েছে?’’ সেই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য ধৃতকে হেফাজতে নেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে আদালতে জানায় পুলিশ। সরকারি আইনজীবীর কথায়, ‘‘ধৃতকে পুরোপুরি হেফাজতে না-পাওয়া গেলে, অনেক প্রশ্নের উত্তর জানা যাবে না।’’
যদিও আদালতে কারীচরণের তরফে দাবি করা হয়, তারাতলার ঘটনার এফআইআরে তাঁর নাম নেই। তাঁর আইনজীবীর কথায়, ‘‘আমার মক্কেলকে বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরবর্তী তদন্তের জন্য হেফাজতে নেওয়ার আবেদন করেছে পুলিশ, যা পুরোপুরি ভিত্তিহীন।’’ কালীর দাবি, তিনি পুরসভায় কাজ করতেন। যে নথির কথা বলা হচ্ছে, তা পাবলিক ডোমেনে রয়েছে। তার জন্য হেফাজতে নেওয়ার প্রয়োজন কোথায়? যদিও আদালত পুলিশের আবেদন মেনে কালীচরণকে তাদের হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে।
পরে আদালতের বাইরে সৌরীন বলেন, ‘‘(তারাতলার দুর্ঘটনাগ্রস্ত) লাইসেন্স প্রক্রিয়া কার্যকর করতে কালীচরণের সরাসরি যোগাযোগ ছিল। এমন ঘটনা আগেও ঘটিয়েছেন। উনি যে নথি দিয়েছিলেন, সেখানে পরিকল্পনায় অনুমোদন দেওয়াটা সঠিক ছিল না। যদি সঠিক অনুসন্ধান করে কাজ হত, তবে ওই পরিকল্পনা অনুমোদন পেত না।’’ সৌরীনের দাবি, ‘‘তারাতলার ঘটনায় টাকার বিনিময়ে প্রভাব খাটানোর বিষয় উঠে আসছে।’’
বুধবার বেলা ১২টা ৭ মিনিটে তারাতলায় আচমকাই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে নির্মীয়মাণ একটি গুদামের ছাদ। লোহার কাঠামো, কংক্রিটের স্তূপের নীচে চাপা পড়ে যান অনেকে। এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ১৪ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। বেশ কয়েক জন এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ঘটনার পর থেকেই ওই গুদামের নির্মাণ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। তৎকালীন মেয়র ফিরহাদ বা তাঁর ওএসডি কালীচরণের ভূমিকাও আতশকাচের নীচে। রাজ্যের মন্ত্রী থেকে কালীঘাট-তৃণমূলের নেতারা একই সঙ্গে এই সব প্রশ্ন তুলছেন। শুক্রবার আদালতে সেই ‘রক্ষাকর্তা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলল পুলিশও।