মিন্টো পার্কের হাসপাতালে হুইলচেয়ারে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। হাসপাতালের সিইও-কে শাসাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ভিডিয়ো থেকে।
সোনারপুরে আক্রান্ত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে চেষ্টা করেও শনিবার শহরের কোনও হাসপাতালে ভর্তি করাতে পারেননি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বাইপাসের ধারের একটি হাসপাতালে। পরে সেখানে চিকিৎসা হচ্ছে না অভিযোগ করে মমতারা অভিষেককে নিয়ে যান মিন্টো পার্কের কাছে অন্য এক হাসপাতালে। সেখানে পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছে, কিন্তু অভিষেককে ভর্তি করানো হয়নি। চিকিৎসকেরা ভর্তি করানোর মতো আঘাত রয়েছে বলে মনে করেননি। এর পর হাসপাতালেই ক্ষোভ উগরে দেন মমতা। হাসপাতালের সিইও-র দিকে আঙুল উঁচিয়ে ধমক দিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। প্রকাশ্যে হুমকিও দিয়েছেন। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সূত্র বলছে, ভর্তি করানোর মতো কোনও আঘাত ছিল না বলেই অভিষেককে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়।
মিন্টো পার্কের কাছের সেই হাসপাতালের ভিতরে সিইও-কে মমতার শাসানির ভিডিয়ো প্রকাশ্যে এসেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, চিৎকার করে সিইও-কে ভর্ৎসনা করছেন মমতা। বলছেন, ‘‘সরি মিস্টার ট্যান্ডন। আপনি ভুল করেছেন। মনে রাখবেন, আমরা আপনার জন্য কী কী করেছি, কী সাহায্য করেছি। ভগবান আপনাকে ক্ষমা করবে না।’’ সে সময় অভিষেককে স্ট্রেচারে শুইয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। সামনে ছিলেন তাঁর পরিবারের লোকজন এবং হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মীরা। সিইও-র দিকে আঙুল তুলে মমতা বলেন, ‘‘পুলিশ-প্রশাসনের কাছে মাথা নত করে আপনি একটা রোগীর চিকিৎসা করলেন না! লজ্জা হওয়া উচিত। ছি! এই অহংকার সকলে মনে রাখবে।’’
অভিষেকের স্ট্রেচারের সঙ্গে মমতার পিছনে সিইও-ও এগোচ্ছিলেন। ফের ধমক দিয়ে ওঠেন তৃণমূলনেত্রী। বলেন, ‘‘আসবেন না আমাদের সঙ্গে। আপনি হাসপাতাল চালাচ্ছেন? ডাক্তারদের ভয় দেখাচ্ছেন! কারণ এখন বিজেপি ক্ষমতায় আছে!’’ হুমকির সুরে এর পরেই মমতাকে বলতে শোনা যায়, ‘‘কাল যখন কেন্দ্রীয় সরকার থাকবে না, আমরা ব্যাপারটা দেখে নেব।’’ ভাইরাল এই ভিডিয়োর সত্যতা অবশ্য যাচাই করে দেখেনি আনন্দবাজার ডট কম।
হাসপাতাল সূত্রে খবর, শনিবার রাতে ৫৭ মিনিট সেখানে অভিষেকেরা ছিলেন। একটি বিশেষ সুইটে অভিষেককে ভর্তি করাতে চেয়েছিলেন মমতা। কিন্তু সেই সুইট তখন ফাঁকা ছিল না। তাই তাঁকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। প্রাথমিক পরীক্ষার পর দেখা যায়, তাঁর শরীরে কোনও গুরুতর আঘাত নেই। এর পর পরিবারের তরফে স্ক্যান-সহ অন্যান্য পরীক্ষা করতে বলা হয়। তা-ও করেন চিকিৎসকেরা। কিন্তু সেখানেও তেমন কিছু ধরা পড়েনি। এর পরেই মমতা জরুরি বিভাগে গিয়ে হম্বিতম্বি করেন বলে অভিযোগ। সিইও এবং চিকিৎসকদের শাসান। তাতেও কাজ না-হওয়ায় ঠিক ৫৭ মিনিটের মাথায় তাঁরা হাসপাতাল চত্বর ছাড়েন। বেরিয়ে চিকিৎসকদের উপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগ তোলেন মমতা। সংবাদমাধ্যমকে জানান, বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পারিবারিক চিকিৎসককে দিয়ে অভিষেকের চিকিৎসা করাবেন।
হাসপাতালে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি। —নিজস্ব চিত্র।
হাসপাতালের নথিতে লেখা হয়েছে, বুকে কালশিটে দাগ ছাড়া অভিষেকের দেহে শারীরিক আঘাতের আর কোনও চিহ্ন ছিল না। তিনি কথা বলছিলেন এবং সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন। তাই তাঁকে ভর্তি করানোর প্রয়োজন নেই। সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসাবে তাঁকে সাধারণ স্যালাইন এবং কিছু ওষুধও দেওয়া হয়।
হাসপাতালে অভিষেককে ভর্তি করাতে মমতার জোরাজুরি এবং সিইও-কে ধমকের ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়ার পরই আলোচনায় আসতে শুরু করেছে পাঁচ বছর আগের ঘটনা। ২০২১ সালে নন্দীগ্রামের ভিড়ে ধাক্কাধাক্কিতে পায়ে চোট পেয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী। প্রথমেই গিয়েছিলেন এসএসকেএম হাসপাতালে। সেখান থেকে পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দীর্ঘ দিন তিনি হুইলচেয়ারে কাটিয়েছেন। সেই অবস্থায় জেলায় জেলায় ঘুরে ভোটের প্রচারও চালিয়েছিলেন। তখন অনেকেই বলেছিলেন, মমতার চোট তেমন গুরুতর নয় যে হুইলচেয়ারের প্রয়োজন পড়বে। বিজেপি নেত্রী তথা চিকিৎসক অর্চনা মজুমদারের কথায়, ‘‘গতকাল যে ভাবে তিনি (মমতা) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উপরে চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছিলেন, তিনি সেটাতেই আসলে অভ্যস্ত। নন্দীগ্রামে পায়ে চোট লেগেছে বলে দাবি করে জোর করে প্লাস্টার করালেন, হুইলচেয়ার নিলেন।’’ এ ক্ষেত্রে চলে আসছে ক্ষমতায় থাকা এবং না-থাকার তুলনা। উল্লেখ্য, শনিবার অভিষেককে নিয়ে মমতারা এসএসকেএমে যাননি। অর্চনার মতে, ‘‘ডাক্তাররা কারও চাপে কাজ করবেন না, তাঁরা নিজেদের জ্ঞান অনুযায়ী কাজ করবেন— এটাই আদর্শ পরিস্থিতি হওয়া উচিত। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সে পরিস্থিতি ছিল না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সে পরিস্থিতি থাকতে দেননি। পিজি হাসপাতালকে তো নিজের দলের লোকেদের বিশ্রামাগার তথা আইনের হাত থেকে বাঁচার আশ্রয়স্থল বানিয়ে ফেলেছিলেন। যে রোগীর সত্যিই বেড প্রয়োজন, তিনি পেতেন না। তৃণমূলের লোকজন ভুয়ো অসুস্থতা দেখিয়ে মাসের পর মাস উডবার্ন ব্লক দখল করে রাখতেন। বিজেপি সরকার মমতার সেই বন্দোবস্ত ভেঙে দিয়েছে। ফলে যাঁর হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন নেই, হাসপাতাল তাঁর জন্য একটা বেড অপচয় করতে রাজি হচ্ছে না। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো চাপ দিয়ে এ সব করাতে অভ্যস্ত। তাই এখনও সেটাই করার চেষ্টা করছেন।’’