RG Kar Case

শৌচাগার কোথায়? ভাত ফেলে দিয়ে সেই কৌটোয় শৌচকর্ম

আর জি কর কোনও ব্যতিক্রম নয়। অনেকেই বলছেন, শৌচাগারের কারণে মৃত্যুর ঘটনা এত দিন যে সে ভাবে সামনে আসেনি, সেটাই আশ্চর্যের। সোমবার দিনভর ঘুরে দেখা গেল, শহরের কোনও মেডিক্যাল কলেজেই জরুরি বিভাগে কোনও শৌচাগার নেই!

নীলোৎপল বিশ্বাস
শেষ আপডেট: ২৪ মার্চ ২০২৬ ০৯:৫৩
এসএসকেএম হাসপাতালে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা করাতে এসে মেলে না শৌচাগার। ভরসা সুলভ শৌচালয়। সোমবার।

এসএসকেএম হাসপাতালে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা করাতে এসে মেলে না শৌচাগার। ভরসা সুলভ শৌচালয়। সোমবার। ছবি: রণজিৎ নন্দী।

দৃশ্য এক: স্ট্রেচারে শোয়া রোগীছটফট করছেন এসএসকেএম হাসপাতালের সুলভ শৌচাগারের সামনে। হাসপাতালের জরুরিবিভাগ থেকে বলে দেওয়া হয়েছে, ভিতরে কোনও শৌচাগার নেই।যেতে হবে বাইরের সুলভ শৌচালয়ে! কিন্তু স্ট্রেচারে থাকা রোগী সুলভ শৌচাগারে যাবেন কী করে? হাসপাতাল-কর্মীর পরামর্শে রোগীর পরিজনেরা এর পরে ছুটলেন কৌটো কিনে আনতে।

দৃশ্য দুই: মাথা ফেটে গিয়েছে, নাকের কাছে রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে। ভাঙা পায়ে দাঁড়ানোরও ক্ষমতা নেই। হুইলচেয়ারে বসা রোগী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে অনুনয় করে চলেছেন জরুরি বিভাগেই কোনও শৌচাগারে তাঁকে যেতে দেওয়ার জন্য। তাঁকেও দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে, বাইরের সুলভ শৌচাগার। রোগী বলছেন, ‘‘হুইলচেয়ারে সুলভে যাব কী করে?’’ কানে হেডফোন গুঁজে সরে যাওয়ার আগে নিরাপত্তারক্ষী বললেন, ‘‘বেড পেয়েছেন? ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে বেড পেলে তবে শৌচাগার পাবেন। নয়তো সুলভই ভরসা।’’

দৃশ্য তিন: দীর্ঘ অপেক্ষার সময়ে এনআরএস হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কোনও শৌচাগারপাননি ঋতুস্রাবের সমস্যা নিয়ে যাওয়া এক মহিলা। বাধ্য হয়ে হাসপাতালের একটি বন্ধ দরজার আড়ালেকিছুটা পরিসর দেখে সেখানেই গিয়েছিলেন, পোশাকের অবস্থা দেখতে। এই ‘অপরাধে’ তাঁকে ধাক্কা দিয়ে বার করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে কয়েক জন মহিলা পুলিশকর্মীর সঙ্গে মহিলার পরিবারের তর্ক হাতাহাতির পর্যায়ে পৌঁছয়। ওই পুলিশকর্মীরাই মহিলাকে বলেন, ‘‘হাত ভাঙুক, পা ভাঙুক, রক্তে ভেসে যাক। সুলভেই যেতে হবে।’’

দৃশ্য চার: কলকাতা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেহাজির কসবার বাসিন্দা এক ব্যক্তির ছেলে বললেন, ‘‘হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়া বাবাকে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে এসেছি। এখন জ্ঞান থাকলেও শৌচাগারে নিয়ে যেতে পারছি না। মা যে বাটিতে খাবার পাঠিয়েছিলেন, ভাত ফেলে সেই বাটিতেই বাবাকে বসিয়ে কাজ সারাতে হয়েছে।’’

এটাই রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলির চিত্র। আর জি কর কোনও ব্যতিক্রম নয়। অনেকেই বলছেন, শৌচাগারের কারণে মৃত্যুর ঘটনা এত দিন যে সে ভাবে সামনে আসেনি, সেটাই আশ্চর্যের। সোমবার দিনভর ঘুরে দেখা গেল, শহরের কোনও মেডিক্যাল কলেজেই জরুরি বিভাগে কোনও শৌচাগার নেই! সেখানে চিকিৎসা করাতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার সময়ে শৌচাগারে যাওয়ার প্রয়োজন হলে ভরসা বেসরকারি সুলভ শৌচালয়! জরুরি বিভাগ থেকে কোথাও কয়েকশো মিটার, কোথাও আবার হাসপাতাল চত্বরের বাইরে গিয়ে সুলভ শৌচালয়ে যেতে হয়।

অসহায়: সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা করাতে এসে মেলে না শৌচাগার। এসএসকেএমে স্ট্রেচারে শোয়া অবস্থায় সুলভ শৌচালয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এক ব্যক্তিকে। সোমবার।

অসহায়: সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা করাতে এসে মেলে না শৌচাগার। এসএসকেএমে স্ট্রেচারে শোয়া অবস্থায় সুলভ শৌচালয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এক ব্যক্তিকে। সোমবার। ছবি: রণজিৎ নন্দী।

গুরুতর জখম বা প্রচণ্ড অসুস্থ অবস্থায় নিয়ে আসা রোগীকে কিসুলভ শৌচাগারে নিয়ে যাওয়াসম্ভব? রোগীর পরিজনেরা জানাচ্ছেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তখনভরসা কৌটো বা বাটি। কেউ এইসময়ে হুইলচেয়ার বা স্ট্রেচারে পরিজনকে ফেলে ছোটেন বাটি কিনে আনতে, কাউকে চিকিৎসকেরাই ডায়াপার কিনে এনে পরিয়ে রাখার পরামর্শ দেন। তবু বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীদের হয়রানির চিত্র বদলায় না।

এ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে স্বাস্থ্য প্রশাসনের তরফে দাবি করা হয়, ‘‘এত রোগী আসেন, ইমার্জেন্সিতে শৌচাগার থাকলে নোংরা হবে।’’ সাফ করানোর দায়িত্ব কার? জরুরি বিভাগের মতো জায়গায় শৌচাগার না থাকার ক্ষেত্রে কি এই যুক্তি চলে?

এ দিন রাজ্যের সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল এসএসকেএমে গিয়ে দেখা গেল, জরুরি বিভাগেডাক্তারদের বসার জায়গা, পুলিশের বসার ঘর, শারীরিক পরীক্ষার জন্য নানা ঘর বরাদ্দ রয়েছে। নেই শুধু শৌচাগার। শয্যাশায়ী বা দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম হয়ে এলে— সকলকেই দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে সুলভ শৌচাগার। হাসপাতালচত্বরে যে দু’টি সুলভ শৌচাগার রয়েছে, তার একটিতে আবারপুরুষের ব্যবহারের জায়গা দোতলায়। সিঁড়ি বেয়ে সেই পর্যন্ত ওঠা তো কোনও রোগীর পক্ষেই সম্ভব নয়। সেখানে হাজির বেহালারবাসিন্দা রাজা গঙ্গোপাধ্যায় বললেন, ‘‘কোমরে অস্ত্রোপচার হয়েছে। এখন যাব কোথায়? কেউই কি দেখেননা?’’ ট্রমা কেয়ার বিল্ডিংয়েরতেতলায় আবার শৌচাগার থাকলেও সেখানে ভর্তি না হলে কোনও রোগীকেই যেতে দেওয়া হয় না বলে জানাচ্ছেন রোগীর পরিজনেরা।ওই শৌচাগার হুইলচেয়ার বা স্ট্রেচারে থাকা রোগীর ব্যবহারের উপযোগীও নয় বলে তাঁদের দাবি। তা হলে প্রয়োজনের সময়ে রোগী যাবেন কোথায়? সেখানে আসা সাঁকরাইলের প্রীতম পাল বললেন, ‘‘ডায়াপার পরতে বলা হয়েছে।’’

ঋতুস্রাবের সমস্যা নিয়ে এনআরএসের জরুরি বিভাগে গিয়ে সমস্যায় পড়া সেইমহিলার জামাই বলছিলেন, ‘‘এক জনমহিলা অনেক ক্ষণ ধরে শৌচাগার খুঁজছেন দেখেও কেউ সাহায্য করতে আসেননি। অথচ, ইমার্জেন্সিতেই মহিলা ওয়ার্ডে শৌচাগার রয়েছে। সেখানে যেতে গেলে বলে দেওয়া হয়েছে, আগে ভর্তি হতে পারেনকিনা, দেখুন!’’

প্রতিক্রিয়া পেতে রাজ্যের স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগমকে বার বার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। উত্তর দেননি মেসেজেরও।

আরও পড়ুন