তপসিয়ায় অগ্নিকাণ্ডের পর সংশ্লিষ্ট বহুতল ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
তপসিয়ার চামড়ার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পর কলকাতায় বুলডোজ়ার চলেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওই কারখানার সামনে পৌঁছে যায় জেসিবি। সমগ্র বহুতলটি ভেঙে ফেলার কাজ চলছে। শুভেন্দু জানিয়েছেন, বহুতলটি অবৈধ ভাবে নির্মিত। তাই তা ভেঙে ফেলা হবে। সেই সঙ্গে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে এই ধরনের অবৈধ নির্মাণ চিহ্নিত করার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। আলাদা করে উল্লেখ করেছেন কসবা, তিলজলা, মোমিনপুর, একবালপুরের মতো এলাকার কথা। অবৈধ নির্মাণগুলিতে বিদ্যুৎ সংযোগ এবং জলের লাইন কেটে দিতে বলেছেন তিনি। শুভেন্দু জানিয়েছেন, অবৈধ নির্মাণ নিয়ে তাঁর সরকার ‘জ়িরো টলারেন্স’ নীতি নিচ্ছে। যাঁদের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন, তাঁরা যেন এখনই সতর্ক হয়ে যান।
তপসিয়ার ঘটনায় মঙ্গলবার দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর জখম অবস্থায় হাসপাতালে আরও কয়েক জন চিকিৎসাধীন। অগ্নিদগ্ধ সেই চামড়ার কারখানার মালিক জাফর নিশার-সহ দু’জনকে বুধবার সকালেই গ্রেফতার করেছে পুলিশ। দুপুরে নবান্ন থেকে এ বিষয়ে একটি সাংবাদিক বৈঠক করেন শুভেন্দু। সেখানেই কারখানাটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন। মূল ঘটনার ৩০ ঘণ্টার মধ্যে বুলডোজ়ার চালিয়ে কারখানা ভাঙার কাজ শুরু হয়ে যায়। সেই প্রক্রিয়া এখনও চলছে। শুভেন্দু জানিয়েছেন, তিলজলার ঘটনা নিয়ে চারটি দফতরের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মুখ্যমন্ত্রীকে রিপোর্ট দিয়েছে। সেখানেই দেখা গিয়েছে, কারখানার বহুতলটির কোনও বিল্ডিং প্ল্যান ছিল না। অগ্নিনির্বাপনের বন্দোবস্তও ছিল না। অবৈধ ভাবে কারখানা চলছিল। একে ‘অশনিসঙ্কেত’ বলে উল্লেখ করেছেন শুভেন্দু। তবে তড়িঘড়ি বুলডোজ়ার চালিয়ে দেওয়ার নির্দেশের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন বিরোধীরা। ভাঙড়ের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি এ ভাবে বহুতল ভেঙে দেওয়াকে ‘অসাংবিধানিক’ বলে উল্লেখ করেছেন। ওই বহুতলের ভাড়াটেদের পুনর্বাসনের দাবি এবং বেআইনি কাজে আরও কেউ যুক্ত কি না, খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
শহরের সমস্ত অবৈধ কারখানায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার এবং জলের লাইন কেটে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন শুভেন্দু। তিলজলার ওই কারখানাতেও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে বলেছেন সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থাকে। তাঁর কথায়, ‘‘বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থাকে স্থায়ী ভাবে ওই কারখানার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দিয়েছি। এ ছাড়া, সিইএসসি-কে বিদ্যুৎসচিবের মাধ্যমে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এই ধরনের অবৈধ কারখানা যত আছে, বিশেষ করে কসবা, তিলজলা, মোমিনপুর, একবালপুর এলাকায় অবিলম্বে অভ্যন্তরীণ অডিট করে সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘পুর ও নগরোন্নয়ন সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এক দিনের মধ্যে ওই অবৈধ পরিকাঠামো ভেঙে দিতে হবে। পুরসভার উদ্যোগে কলকাতা পুলিশের সাহায্য নিয়ে তা করতে হবে। এ ছাড়া, পুরসভাকে বলা হয়েছে, এমন অবৈধ বিপজ্জনক কারখানাগুলিতে জলের লাইন কেটে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে, আমাদের নীতি জ়িরো টলারেন্স। ’’
শুভেন্দুর নির্দেশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তিলজলা থানা এলাকার তপসিয়ায় ওই কারখানার সামনে বুলডোজ়ার পৌঁছে যায়। পুলিশের সঙ্গে সেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনীর আধিকারিকেরাও ছিলেন। বহুতলটি খালি করে বুলডোজ়ার দিয়ে তা ভেঙে ফেলা শুরু হয়। এলাকার বাসিন্দারা তা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। কারখানা ভাঙার সময়ে যাতে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না-হয়, তা নিশ্চিত করতে এলাকায় বিশাল পুলিশবাহিনী মোতায়েন করা হয়। রাত পর্যন্ত বহুতল ভাঙার কাজ চলেছে।
রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল জানান, যে অবৈধ ভবনগুলির ফায়ার লাইসেন্স বা এনওসি নেই, সেগুলিকে নোটিস পাঠানো শুরু হচ্ছে। ওই ভবনের মালিকদের প্রথমে শুধরে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। তার পরেও নিয়ম না মানলে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ মোতাবেক পদক্ষেপ করা হবে। তিনি আরও জানান, তপসিয়ার ওই ভবনটিতে সিঁড়ি এতটাই সরু ছিল যে, সেখান থেকে লোকজন নামতে পারেননি। পিছন দিকে লোহার ঘোরানো সিঁড়ি থাকা উচিত ছিল বলেও মনে করেন তিনি।
তপসিয়াকাণ্ডের আবহে রাজ্যের পুরসভা এলাকা এবং শিল্পাঞ্চলগুলিতে নজরদারি বৃদ্ধি করছে সরকার। বুধবার বিধানসভায় অগ্নিমিত্রা জানিয়েছেন, রাজ্যে সাতটি পুরনিগম, ১২১টি পুরসভা এবং তিন শিল্পাঞ্চলকে মুড়ে ফেলা হবে সিসি ক্যামেরায়। এই সিসি ক্যামেরাগুলিতে কেন্দ্রীয় ভাবে নজরদারি চলবে পুর দফতর থেকে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর সঙ্গেও এ বিষয়ে অগ্নিমিত্রার কথা হয়েছে। এই পদ্ধতির মাধ্যমে রাজ্যে কোন পুরসভা এলাকায় কেমন কাজ চলছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে বলে মনে করছে প্রশাসন। বস্তুত, রাজ্যে বিজেপির সরকার গঠিত হলেও পুরসভা এবং পুরনিগমগুলি এখনও রয়েছে তৃণমূলের হাতে। এ অবস্থায় পুর এলাকাগুলিতে কাজকর্ম কেমন চলছে, তার উপর নজর রাখতে তৎপর হয়েছে অগ্নিমিত্রার পুর দফতর।
ভাঙড়ের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি বিবৃতি দিয়ে তিলজলায় বুলডোজ়ার চালানোর ঘটনার নিন্দা করেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘চামড়ার কারখানা ছাড়াও ওই বহুতলে অন্য ভাড়াটেরা ছিলেন। তাঁরা পুরসভাকে কর দেন। তাই বুলডোজ়ার চালিয়ে এ ভাবে ভেঙে ফেলা অসাংবিধানিক, এটা সমীচীন নয়। কলকাতায় যে সমস্ত অবৈধ বাড়ি আছে, তাদের নোটিস পাঠিয়ে কিছুটা সময় দেওয়া প্রয়োজন। কারণ ওই সমস্ত বাড়িতে অনেক ভাড়াটে পরিবার নিয়ে থাকেন। তাঁদেরও পুনর্বাসন দেওয়া প্রয়োজন।’’ নওশাদ আরও বলেছেন, ‘‘এই বেআইনি ভাবে চলা কারখানাটি চালু রাখতে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না, স্থানীয় পুর কাউন্সিলর থেকে সরকারি আধিকারিক পর্যন্ত, সকলকে তদন্তের আওতায় আনা দরকার। তবে সব কিছুই আইন মেনে করতে হবে। স্বেচ্ছাচারিতা করে হুটহাট বুলডোজ়ার চালিয়ে কাজ করা মোটেই উচিত নয়।’’