Pratik ur Rahman

লোকসভা ভোটে লড়েছিলেন যাঁর বিরুদ্ধে, সেই অভিষেকের হাত ধরে তৃণমূলে প্রতীক-উর! দ্রুত বহিষ্কার করল সিপিএম

প্রতীক-উর রহমান আমতলায় অভিষেকের কার্যালয়ে পৌঁছোতেই এসএফআই দফতরে তাঁর নামে বরাদ্দ লকার থেকে নাম সরিয়ে দেওয়া হয়। এসএফআইয়ের দফতরে তিন নম্বর লকার ছিল প্রতীক-উরের। সেখান থেকে মুছে দেওয়া হয় তাঁর নাম।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৭:০৪
শনিবার আমতলার কার্যালয়ের সামনে রাস্তায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে তৃণমূলের ঝান্ডা তুলে নিলেন প্রতীক-উর রহমান।

শনিবার আমতলার কার্যালয়ের সামনে রাস্তায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে তৃণমূলের ঝান্ডা তুলে নিলেন প্রতীক-উর রহমান। — নিজস্ব চিত্র।

দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে শনিবার বিকেলে তৃণমূলের ঝান্ডা তুলে নিলেন প্রতীক-উর রহমান। গত লোকসভা নির্বাচনে অভিষেকের বিরুদ্ধেই ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্রে সিপিএমের প্রতীকে লড়েছিলেন তিনি। শনিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার আমতলায় ডায়মন্ড হারবারের সাংসদের কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় আনুষ্ঠানিক ভাবে তৃণমূলে যোগ দিলেন সিপিএমের ‘বিদ্রোহী’ নেতা প্রতীক-উর। অভিষেক জানান, প্রতীক-উর ভোটে লড়ার টিকিট চাননি। সংগঠনের কাজ করতে চেয়েছেন। এর আগে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কোনও নেতা তৃণমূলে যোগদান করেননি। কেন পথে দাঁড়িয়ে তৃণমূলে যোগদান করলেন প্রতীক-উর? অভিষেক বলেন, ‘‘প্রতীক-উর পথ দেখাল, সিপিএম যেন পথে নামে!’’ আর প্রতীক-উরের কথায়, ‘‘এই রাস্তাতে যোগদান করে আসলে রাস্তা দেখানো হল।’’

Advertisement

অন্য দিকে, অভিষেকের সঙ্গে তাঁকে দেখা যাওয়ামাত্রই প্রতীক-উরকে বহিষ্কার করে সিপিএম। পার্টি গঠনতন্ত্রের ১৯ নম্বর ধারা, ১৩ নম্বর উপধারার কথা উল্লেখ করে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে দলীয় ভাবে।

প্রতীক-উর রহমানের বহিষ্কারপত্র।

প্রতীক-উর রহমানের বহিষ্কারপত্র। — নিজস্ব চিত্র।

শনিবার আমতলার কার্যালয়ে অভ্যন্তরীণ দলীয় বৈঠক করেন অভিষেক। তার পরে বিকেল ৪টে নাগাদ সেখানে পৌঁছোন প্রতীক-উর। ঘটনাচক্রে, তিনি সেখানে পৌঁছোতেই এসএফআই দফতরে তাঁর নামে বরাদ্দ লকার থেকে প্রতীক-উরের নামফলক সরিয়ে দেওয়া হয়। এসএফআইয়ের দফতরে তিন নম্বর লকার ছিল প্রতীক-উরের। সেখান থেকেই সরিয়ে দেওয়া হয় তাঁর নাম। তার কিছু ক্ষণের মধ্যেই তড়িঘড়ি তাঁকে দল থেকে বহিষ্কারও করে সিপিএম। যে দলের দিকে একযোগে এর পর আঙুল তোলেন অভিষেক এবং প্রতীক-উর। অভিষেক বলেন, ‘‘প্রতীক-উরকে বলা হচ্ছে, তৃণমূলের সঙ্গে ডিল করেছেন। ডিল কী? টিকিট পাচ্ছেন। প্রতীক-উর নিজে এসে আমায় বলছেন, দাদা, দল টিকিট দিলেও আমি নেব না।’’ এর পরেই অভিষেক সিপিএমকে খোঁচা দিয়ে বলেন, ‘‘একটা ছেলেকে জানেন না, যে এত দিন দল করল, তাকে চেনেন না। তাকে আগেই ঘোষণা করে দিলেন, সে বেইমান!’’ তাঁর কথায়, ‘‘সে আপনার বশ্যতা স্বীকার করেনি। স্তাবকে পরিণত হয়নি। খুব গায়ে জ্বালা সেলিমবাবুদের। সংবাদমাধ্যমে স্নোপাউডার মেখে ঘুরে বেড়ানো নেতা বলছে ডিল হয়েছে।’’ অভিষেক জানান, নিজের ‘বিবেকের তাগিদে’ই প্রতীক-উরের কথা প্রকাশ্যে বললেন তিনি।

শনিবার অভিষেক প্রশ্ন তুলেছেন সিপিএমের আদর্শ নিয়েও। তিনি জানান, এসআইআর নিয়ে তৃণমূল একাই লড়াই করছে। কেরলে এসআইআর হচ্ছে, সে রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও সিপিএম প্রতিবাদ করেনি। তাঁর কথায়, ‘‘কেরলে সিপিএমের ভূমিকা কী? বামপন্থার আদর্শ নিয়ে কথা বলে, ওদের আদর্শ কী? আপনার কোন আদর্শ বলে, হুমায়ুন কবীরের মতো লোকের সঙ্গে বসে জোট করতে হবে? ২০২১ সালে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লড়েছে কেরলে, একই সময়ে, একই দিনে বাংলায় কংগ্রেসকে সঙ্গে নিয়ে লড়েছে। এটা কোন আদর্শ?’’

এর পরেই লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্প নিয়ে সিপিএমের মন্তব্যকে পাল্টা কটাক্ষ করেন অভিষেক। তিনি বলেন, ‘‘লক্ষ্মীর ভান্ডারের মতো সহায়তাকে ওরা ভিক্ষা বলে। কোন আদর্শে ভিক্ষা বলেন? প্রান্তিক মানুষকে সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে (রাজ্য সরকার), তাদের খাটো করে দেখেন। কোন আদর্শে? ’’ তাঁর কটাক্ষ, ৩৪ বছর ক্ষমতায় থেকে সিপিএম রাজ্যকে দেউলিয়া করেছে। ঋণের বোঝা হয়েছে ২ লক্ষ ৪ হাজার কোটি টাকা। অথচ কাউকে ভাতাও দেয়নি তারা।

ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, কানহাইয়া কুমারের বামদল ত্যাগের কথাও তুলেছেন অভিষেক। তিনি বলেন, ‘‘ঋতব্রত যখন এসেছিলেন, চাওয়া-পাওয়ার জন্য আসেননি। কানহাইয়া কুমারের মতো ছেলে চলে গিয়েছে কংগ্রেসে। সব ধান্দাবাজ? যাদের অঙ্গুলিহেলনে ৩৫ শতাংশ ভোট বিজেপিতে গিয়েছে, তারা ধোয়া তুলসিপাতা! তারা যবে থেকে দল চালাচ্ছে, সিপিএমের ৪০ শতাংশ ভোট ৪-৫ শতাংশে নেমে গেল ২০১৯ সালে?’’ অভিষেক আরও বলেন, ‘‘যাদের কারণে সিপিএম আজ শূন্য, তারা ব্যক্তি আক্রমণে নেমেছে। আয়নায় নিজের মুখ দেখা উচিত। কার সঙ্গে লড়বেন ঠিক করুন। যারা বিজেপির কথায় উঠছে বসছে, বিজেপির টাকায় বাংলায় আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করছে, কখনও আব্বাস সিদ্দিকি, কখনও নওশাদ সিদ্দিকি, কখনও হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে দেখা করছে, তাদের বলব আয়নায় মুখ দেখুন।’’

এর পরেই অভিষেক তরুণ প্রজন্মকে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার ডাক দিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘তরুণ প্রজন্মকে বলব, তৃণমূলে আসুন। দলে ঊর্ধ্বসীমার কথা বলেছি। আমাকেও সেটা মানতে হবে। তবে কালই রাজনীতি ছাড়ছি না। আমি যত দিন আছি, সুযোগ করে দেব।’’ তার পরেই তিনি প্রতীক-উরকে ধন্যবাদ দেন। বলেন, ‘‘সাহস দেখিয়ে সিপিএমের বেড়াজাল ভেঙে আমার সঙ্গে কথা বলার সাহস দেখিয়েছেন, ধন্যবাদ জানাব। আমার ক্রেডিট চাই না।’’

সম্প্রতি প্রতীক-উর সিপিএমের রাজ্য কমিটি, জেলা কমিটি এমনকি, দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও আব্যাহতি নেওয়ার কথা উল্লেখ করে চিঠি লিখেছিলেন। সিপিএমের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতীক-উরকে দল বহিষ্কার করতে পারত। কিন্তু সেই পথে হাঁটেনি রাজ্য কমিটি। প্রতীক-উরের চিঠির পরে দলের একাংশ তাঁকে রাখবার জন্য সক্রিয় হয়েছিলেন। যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলেন প্রবীণ নেতা বিমান বসুও। দলের কর্মী-সমর্থকদেরও প্রতীক-উরের পক্ষে প্রকাশ্যে সওয়াল করতে দেখা গিয়েছিল। আলিমুদ্দিন চেয়েছে বহিষ্কার না-করে ধরে রাখার চেষ্টা জারি রাখার বার্তা দিতে। যদিও শেষ পর্যন্ত সেই চেষ্টা কার্যকর হল না।

এই পর্বে গত বুধবার প্রতীক-উর প্রথম বিস্তারিত সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন আনন্দবাজার ডট কম-কে। তার পর ধারাবাহিক ভাবে সংবাদমাধ্যমে মুখ খুলে নিশানা করেছেন রাজ্য সম্পাদক সেলিমকে। এমনকি, সেলিমকে ‘সিপিএমের গব্বর সিং’ বলেও আক্রমণ করেছেন ডায়মন্ড হারবারের এই তরুণ নেতা। শুক্রবার আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, ‘‘সূর্যকান্ত মিশ্রের সময়ে সিপিএমের মধ্যে কথা বলা যেত। প্রশ্ন করা যেত। কিন্তু সেলিম সিপিএমে কর্পোরেট সংস্কৃতি চালু করেছেন।’’ সেলিম অবশ্য বলেছেন, ‘‘মমতা-শুভেন্দু ল্যান্ডমাইন বসিয়েও সিপিএমকে শেষ করতে পারেনি। মিডিয়ায় বসে স্ক্রিপ্ট আউড়ে সিপিএমকে শেষ করা যাবে না!’’ সেলিম তাঁকে সন্তান বলেও উল্লেখ করেন।

শনিবার সেই নিয়ে সেলিমকে কটাক্ষ করেন প্রতীক-উর। তিনি বলেন, ‘‘রাজনৈতিক ভাবে লড়াই হবে, ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়। আমার সো কল্ড পিতাকে অনেক বার বলেছি, কথা বলুন, বলেননি।’’ তিনি এ-ও জানিয়েছেন, ‘দমবন্ধ পরিস্থিতিতে’ অনেকেই মুখ খুলতে শুরু করেছেন।

Advertisement
আরও পড়ুন