WB Elections 2026

কাজ না ভাতা, উত্তর দেবেন পরিযায়ী শিশুপালেরা

পুরুলিয়া শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে জয়পুর বিধানসভা কেন্দ্রের চেকা গ্রাম। জেলায় কাজের সুযোগ ক্রমেই সঙ্কুচিত।

আর্যভট্ট খান
শেষ আপডেট: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৪৪
বেঙ্গালুরুতে কাজ করতে গিয়ে মৃত পরিযায়ী শ্রমিক প্রসন্ন কুমারের বাড়িতে তাঁর স্ত্রী কুন্তি কুমার ও মা সনকা কুমার (পিছনে)।

বেঙ্গালুরুতে কাজ করতে গিয়ে মৃত পরিযায়ী শ্রমিক প্রসন্ন কুমারের বাড়িতে তাঁর স্ত্রী কুন্তি কুমার ও মা সনকা কুমার (পিছনে)। ছবি: সুজিত মাহাতো।

বিমানবন্দরের রানওয়ের মতো ঝকঝকে, মসৃণ রাস্তা থেকে গলিতে ঢুকলেই কাদামাখা, এবড়ো-খেবড়ো গ্রামীণ আধা মেঠো পথ। গ্রামের বাড়িগুলোর উঠোন বলতে প্রায় কিছুই নেই। কর্দমাক্ত সরু পথের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন পরিযায়ী শ্রমিক শিশুপাল কুমার। ছুটিতে গ্রামে এসেছেন।

পুরুলিয়া শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে জয়পুর বিধানসভা কেন্দ্রের চেকা গ্রাম। জেলায় কাজের সুযোগ ক্রমেই সঙ্কুচিত। গ্রামে যেখানে দৈনিক মজুরি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, সেখানে ভিন্ রাজ্যে দৈনিক মজুরি ৯০০ থেকে ১০০০টাকা। তাই শিশুপালের মতো অনেকেই পরিযায়ী শ্রমিক। চেকা গ্রামের আশপাশের গ্রাম বিলারি, ডুরগু, বড়হোনকলের মানুষরাও জানাচ্ছেন, হাতের কাছে রাঁচী গিয়ে শ্রমিকের কাজ করলেও লাভ। সেখানেও তো দৈনিক মজুরি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। চেন্নাইয়ে কাজ করতে গিয়ে অস্বাভাবিকমৃত্যু হয়েছে চেকা গ্রামের বাসিন্দা কুন্তি কুমারের স্বামী প্রসন্ন কুমারের। কুন্তি বলেন, “গ্রামে কাজ নেই বলেই স্বামী গিয়েছিল চেন্নাইয়ে। ভিন্ রাজ্যে কাজে গিয়ে আমার স্বামীর মতো অনেকে মারা গিয়েছে। তবু নিরুপায় হয়েই যাচ্ছে।”

ভোট এসেছে দুয়ারে। গ্রামের বাড়ির কাঁচা দেওয়ালে ফুটে উঠছে তুলির রঙিন টান। সেই দিকে তাকিয়ে বড়হোনকলের বাসিন্দাবিড়ি শ্রমিক শঙ্করী কুমার বলেন, “এক হাজার বিড়ি বাঁধলে ২০০ টাকা পাই। এ ভাবে কি দিন চলে?রাজনৈতিক দাদারা দৈনিক কাজের মজুরি বাড়ানোর কথা বলছেন না। বিড়ি বাঁধা ছেড়ে হয়তো আমাকেও ভিন্ রাজ্যে যেতে হবে।’’ এক সময়ে এলাকায় এত বেশি বিড়ি শ্রমিক ছিলেন যে, শুধু তাঁদের জন্যই বড়হোনকলের কাছে তৈরি হয়েছিল হাসপাতাল। এখন সেইহাসপাতাল বলতে শুধু বিড়ি শ্রমিকদের জন্য ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা পরিষেবা কেন্দ্র।

বলরামপুর বিধানসভা কেন্দ্রের বিভিন্ন গ্রাম ঘিরে এক সময়ে বেড়ে উঠেছিল ছিল লাক্ষা শিল্প। স্থানীয় বাসিন্দারা জানালেন,এক সময়ে এখানে প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার শ্রমিক লাক্ষা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখানে এখন রয়েছেন মাত্র হাজার দুয়েক শ্রমিক। লাক্ষা শ্রমিক শান্তি টুডু, ফুলমণি টুডুরাকাজ সেরে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বলেন, ‘‘কাজ এখন অনেক কম। দৈনিক মজুরিমাত্র ২৫০ টাকা। এখানে কাজ করে পোষায় না।’’

বিজেপির ভোট প্রচারে এবং দেওয়াল লিখনে হাতিয়ার তাই পরিযায়ী শ্রমিক এবং অনুন্নয়ন। পুরুলিয়া বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী সুদীপ মুখোপাধ্যায়েরপ্রশ্ন, “গ্রাম ছেড়ে দিন, পুরুলিয়া শহরে কোন পরিষেবাটা আছে বলতে পারেন? পরিষেবা নেই বলেই তো পুরুলিয়ার পুরসভার বোর্ড ভেঙে গিয়েছে। ভাতা আমরাও দেব। কিন্তু মানুষের মাথা উঁচু করে বাঁচার জন্য দরকার শিল্প।’’ কর্মসংস্থান, শিল্পে গুরুত্ব দিয়ে প্রচারে নেমেছে কংগ্রেস, সিপিএমও। পুরুলিয়ার সিপিএম জেলা সম্পাদক প্রদীপ রায়, বলরামপুর বিধানসভা কেন্দ্রে কংগ্রেস প্রার্থী সুকান্ত মাহাতোর মতে, জেলা জুড়ে অনুন্নয়নের ছাপ স্পষ্ট। গ্রামে গ্রামে গিয়ে তাঁরা বোঝাচ্ছেন, কর্মসংস্থান না হলে জেলা থেকে স্থানীয় মানুষদের আরও বেশি পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে চলে যেতে হবে।

সেখানে তৃণমূলের জবাব মূলত ভাতা-নির্ভর। বলরামপুর এলাকার তৃণমূল নেতা মৃত্যুঞ্জয় মাঝির দাবি, গ্রামের মানুষকে আগে দুপুরে ভুট্টা খেতে হত। এখন ভাত খাচ্ছেন সকলে। তাঁর মতে, বাড়ি থেকে কাজে না বেরিয়েও মুখ্যমন্ত্রীর নানা প্রকল্পে এক-একটি পরিবারে ঢুকছে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। এটাই সবার মুখে হাসি ফোটাচ্ছে। তৃণমূল প্রার্থী শান্তিরাম মাহাতোরও এক দাবি, ‘‘কোনও রাজনৈতিক রং না দেখে প্রতিটি বাড়ি মুখ্যমন্ত্রীর প্রকল্পের সুবিধা পায়।“ লাক্ষা শিল্প, বিড়ি শিল্প ম্লান হয়ে এলেও এখানে পর্যটন শিল্পের উপরে ভর করে প্রচুর মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন। বাঘমুন্ডি বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী সুশান্ত মাহাতো সেই দাবিই করছেন। চড়িদা গ্রামের মুখোশ শিল্পী ফাল্গুনী সূত্রধরও বলেন, “মুখোশ শিল্প আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে।“

গত বিধানসভা নির্বাচনে পুরুলিয়ায় ন’টি বিধানসভা আসনের মধ্যে বিজেপি ছ’টি এবং তৃণমূল তিনটি আসন পেয়েছিল। তৃণমূল প্রার্থীদের দাবি, এ বার হিসাব উল্টোবে। গত বার বিধানসভা ভোটের আগে বিজেপির হাওয়া ছিল। এ বার তা উধাও। বিজেপির পাল্টা দাবি, এ বার ঝড়ে ওলটপালট হবে।

বাঘমুন্ডি, জয়পুর, বলরামপুরে অবশ্য এখন চৈত্রের গরম হাওয়া। ৪ মে ওই হাওয়া কালবৈশাখী হবে কিনা, তা জানেন ফুলমণি, শিশুপালরাই।

আরও পড়ুন