বিরল প্যানক্রিয়াটাইটিস নিয়ে উদ্বেগ, কী রোগ হচ্ছে ছোটদের? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
হঠাৎ করেই একদিন অসম্ভব পেটের যন্ত্রণায় কাতরাতে শুরু করে কিশোরী। যন্ত্রণার তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, তার হাত-পা সব ঠান্ডা হয়ে আসছিল। বমিও হচ্ছিল। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরে যাবতীয় পরীক্ষা করানো হয়। জানা যায়, কোনও সাধারণ কারণে এই পেটে ব্যথা হয়নি। রোগটি প্যানক্রিয়াটাইটিস। তা-ও সাধারণ অগ্ন্যাশয়ের রোগ নয়। এ এক ধরনের বিরল প্যানক্রিয়াটাইটিস, যা অতিরিক্ত মদ্যপান বা তামাক সেবনের কারণে প্রাপ্তবয়স্কদের হয়ে থাকে। বছর দশেকের মেয়ের কী কারণে এমন রোগ হল, তা নিয়ে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে চিকিৎসকদের কপালে।
প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয়ের রোগ খুবই ভয়াবহ। কারণ অগ্ন্যাশয়ে ক্ষত তৈরি হলে তা প্রাণসংশয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। অগ্ন্যাশয়ের কাজ হল দু’টি। যার মধ্যে একটি হল, পাচক রস বা এনজ়াইম তৈরি করা। যা খাবার হজম করতে সাহায্য করে। অন্যটি হল, ইনসুলিন বা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন তৈরি করা। একে এন্ডোক্রিন প্যানক্রিয়াস বলে। অগ্ন্যাশয়ে যদি রোগ হয়, তা হলে দু’টি কাজই বিগড়ে যায়। এক দিকে যেমন খাবার হজমের প্রক্রিয়াটি ব্যাহত হয়, এবং তার ফলে পাচক রস উঠে আসে খাদ্যনালি দিয়ে, এতে অম্বল, বদহজম, অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা দেখা দেয়। ঘন ঘন বমি হতে থাকে। আর অন্য দিকে ইনসুলিনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে শুরু করে। খাওয়াদাওয়ায় অনিয়ম, অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড বা প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার প্রবণতা, অত্যধিক মদ্যপান ও তামাকজাত দ্রব্য সেবনের কারণে অগ্ন্যাশয়ের কার্যক্ষমতা কমে যায়, তখন প্যানক্রিয়াটাইটিস রোগটি হতে পারে। এই রোগ ছড়িয়ে পড়লে তা অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের কারণও হয়ে উঠতে পারে।
বিরল প্যানক্রিয়াটাইটিসের কারণ কী?
দিল্লির কিশোরীর যে ধরনের প্যানক্রিয়াটাইটিস হয়েছে, তার সঙ্গে মদ্যপান, তামাক সেবনের কোনও সম্পর্ক নেই। চিকিৎসকেরা অনুমান করছেন, এর কারণ জিনগত ত্রুটি। বাবা-মায়ের থেকে আসা কিছু জিনে মিউটেশন বা রাসায়নিক বদল হয়ে রোগটি হতে পারে, আবার জন্মের পরে অগ্ন্যাশয়ের গঠনগত ত্রুটি এবং জিনের বদলের কারণেও রোগটি হতে পারে। এ বিষয়ে লেখা হয়েছে ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ কনটেম্পোরারি পেডিয়াট্রিক্স’-এও। সেখানে গবেষকেরা জানিয়েছেন, ছোটদের মধ্যে জেনেটিক প্যানক্রিয়াটাইটিসের আশঙ্কা বাড়ছে। এর জন্য দায়ী কিছু জিন— সিস্টিক ফাইব্রোসিস জিন (সিটিএফআর) এবং এসপিআইএনকে১। এই দুই জিনে রাসায়নিক বদল হতে থাকলে, অগ্ন্যাশয়ের সুস্থ কোষগুলি নষ্ট হতে থাকবে। ক্ষত তৈরি হবে অগ্ন্যাশয়ের অভ্যন্তরে। ফলে আরও এক জিন সিটিআরসি-এর মধ্যেও রাসায়নিক বদলের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। এই জিনটি আবার অগ্ন্যাশয়ের সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। তাই সেটিতে বদল এলে, অগ্ন্যাশয়ের কার্যক্ষমতা কমতে শুরু করবে। পিত্তথলিতে পাথর জমতে থাকবে। পাশাপাশি ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া জমতে শুরু করবে অগ্ন্যাশয়ের ভিতরে।
ছোটদের যে যে লক্ষণ খেয়াল করতে হবে
শিশুদের ক্ষেত্রে প্যানক্রিয়াটাইটসের লক্ষণ সাধারণ পেটের সমস্যার মতো মনে হতে পারে। তাই বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। যে যে লক্ষণগুলি খেয়াল করতে হবে—
পেটের উপরের দিকে অসহ্য ব্যথা, যা পিঠের দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কিছু খেলেই বমি হবে, খালি পেটেও বমি হতে পারে।
হালকা জ্বর থাকবে গায়ে, গাঁটে গাঁটে যন্ত্রণা হবে, শরীর খুব দুর্বল হয়ে পড়বে।
অম্বস, বদহজমের সমস্যা বাড়বে, ছোট থেকেই অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা দেখা দেবে।
চোখে হলদেটে ছোপ পড়বে, প্রস্রাব হলুদ বর্ণের হয়ে যাবে, জন্ডিসের লক্ষণ দেখা দেবে।