West Bengal Politics

এসআইআর থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি মোড় নিল রাষ্ট্রপতির ‘অসম্মান’ বিতর্কে, যুযুধান দু’পক্ষ এগিয়ে দিচ্ছে আদিবাসী নেতৃত্বকে

রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর ‘অসম্মান’ নিয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে ময়দানে নেমেছে বিজেপি। পাল্টা তৃণমূলও রাষ্ট্রপতিকে ‘রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার’ করার অভিযোগ তুলে আক্রমণ শানাচ্ছে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৬ ১৮:০১
SIR to President, politics of West Bengal taken a new turn

(বাঁ দিক থেকে) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু এবং মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

গত চার মাস রাজ্য রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছিল এসআইআর কেন্দ্র করে। কিন্তু শনিবার থেকে আচমকাই তা মোড় নিয়েছে ভিন্ন খাতে। যে রাজনীতির সঙ্গে জুড়ে গিয়েছেন দেশের সাংবিধানিক প্রধান তথা রাষ্ট্রপতি।

Advertisement

রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর ‘অসম্মান’ নিয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে ময়দানে নেমেছে বিজেপি। পাল্টা তৃণমূলও রাষ্ট্রপতিকে ‘রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার’ করার অভিযোগ তুলে আক্রমণ শানাচ্ছে। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, উভয় পক্ষই এই প্রশ্নে সামনে এগিয়ে দিচ্ছে দলের আদিবাসী নেতৃত্বকে। তৃণমূল যেমন বিরবাহা হাঁসদাকে ময়দানে নামিয়েছে, তেমনই বিজেপি নামিয়েছে খগেন মুর্মুকে।

তৃণমূলের হয়ে শনিবার সন্ধ্যায় শুরু অবশ্য করেছিলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যেমন বিজেপির হয়ে প্রথম সরব হন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। মমতার পরে মাঠে নামেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তেমনই মোদীর পরে অমিত শাহ। শনিবার রাত থেকেই বিজেপির এক ঝাঁক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সমাজমাধ্যমে আক্রমণ শুরু করেন তৃণমূলের বিরুদ্ধে। সেই হামলার যোগ দেন কার্যনির্বাহী সভাপতি নিতিন নবীন এবং উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথও।

শনিবার বিরবাহার পরে রবিবার তৃণমূল ময়দানে নামিয়েছে প্রকাশ চিক বরাইক, বুলুচিক বরাইকদের। বিজেপি নামিয়েছে মালদহ উত্তরের সাংসদ খগেন এবং মহিলা নেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায়কে। অর্থাৎ, শুধু আদিবাসী নয়, পাশাপাশি এক মহিলার ‘অসম্মান’ নিয়েও সরব হচ্ছে বিজেপি।

এই বিরামহীন চাপানউতর একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে। এসআইআর থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আপাতত মোড় নিয়েছে আদিবাসী ভোটের দিকে।

শুধু রাষ্ট্রপতির ‘অপমান’ নয়, দ্রৌপদীর সঙ্গে যে আচরণ রাজ্য সরকার করেছে, তা গোটা আদিবাসী সমাজের অপমান বলে দাবি করতে শুরু করেছে বিজেপি। দলের জনজাতি মোর্চাকেও রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে পদ্মশিবির। একাধিক জেলায় আদিবাসী প্রধান এলাকাগুলিতে রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে এবং অবরোধ করে বিক্ষোভ চলেছে রবিবার। বিজেপির দাবি, ‘স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে’ জনজাতি সমাজ ওই বিক্ষোভ শুরু করেছে। তবে বিজেপি সূত্রে জানা যাচ্ছে, জনজাতি মোর্চা শনিবার রাত থেকেই সক্রিয় হয়েছে। সংগঠনের রাজ্য সভাপতি তথা সাংসদ খগেন প্রত্যেকটি আদিবাসী প্রধান এলাকায় যোগাযোগ করেছেন। অবিলম্বে বিক্ষোভ দেখাতে পথে নামতে নির্দেশও দিয়েছেন।

আবার ধর্মতলায় মমতার ধর্নামঞ্চ থেকে রায়দিঘিতে অভিষেকের সভামঞ্চে পুরনো ছবি দেখিয়ে তৃণমূলের তরফে দাবি করা হয়েছে, রাষ্ট্রপতিকে অসম্মান করেছেন মোদী স্বয়ং। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তাঁর সামনে একটি চেয়ারে বসে রয়েছেন মোদী। পাশাপাশিই তৃণমূলের নেতারা বক্তৃতায় জুড়ে দিচ্ছেন রামমন্দির উদ্বোধনে রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ না-জানানোর প্রসঙ্গও।

রবিবার সকালে খগেন রাজ্য বিজেপির বিধাননগর দফতরে সাংবাদিক বৈঠক করেন। তিনি দাবি করেন, শনিবার থেকেই বিভিন্ন জেলায় আদিবাসীদের বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। রবিবার আরও বেশি করে আদিবাসী সমাজ পথে নামবে বলে সকালে তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর ঘোষণামতোই ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বীরভূম এবং হুগলি জেলার নানা অংশ থেকে বিক্ষোভের খবর আসতে শুরু করে। অধিকাংশ জায়গাতেই বিক্ষোভের ধরন একই— টায়ার জ্বালানো এবং রাস্তা অবরোধ করা। তা থেকেই স্পষ্ট, বিজেপি সংগঠিত ভাবেই ওই বিক্ষোভের কর্মসূচি নিয়েছে। খগেন রবিবার মুখ্যমন্ত্রী মমতার পদত্যাগ দাবি করেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে যে ভাবে অপমান করা হয়েছে, তাতে শুধু পশ্চিমবঙ্গের নয়, গোটা দেশেরই আদিবাসী সমাজকে অপমান করা হয়েছে। দেশের ১২ কোটি আদিবাসী মানুষ অপমানিত বোধ করেছেন। ক্ষমা চাইলেও হবে না, মুখ্যমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। আমরা মুখ্যমন্ত্রী এবং তৃণমূলকে ধিক্কার জানাচ্ছি।’’ যার পাল্টা রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদ প্রকাশ বলেন, ‘‘রাষ্ট্রপতির চেয়ার রাজনীতির ঊর্ধ্বে। কিন্তু বিজেপি সেই পদকেও রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহার করছে। এ থেকেই বোঝা যায় আদিবাসীদের মধ্যে তাদের ভিত কতটা আলগা।’’

শুক্রবার মমতা বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে বিজেপি তাদের রাজনীতি বিক্রি করতে পাঠিয়েছে। মণিপুর যখন জ্বলছিল, তখন কেন দ্রৌপদী চুপ ছিলেন, সেই প্রশ্নও তুলেছিলেন মমতা। তৃণমূলের সর্বময় নেত্রীর মন্তব্য নিয়ে দলের অন্দরেই আলোচনা রয়েছে। একাংশের বক্তব্য, বিজেপি বিষয় ঘুরিয়ে দিতে চেয়েছিল। তারা সেটা করতে পেরেছে। অন্তত আপাতত। এসআইআর হোক বা রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি— পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আর সে সব নিয়ে আলোচনা করছেন না। তাঁরা আলোচনা করছেন ‘রাষ্ট্রপতির অসম্মান’ নিয়ে। সে আোচনা বিজেপির পক্ষে হোক বা বিপক্ষে। মোদ্দা কথায়, এসআইআর বা এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্যবৃদ্ধি নয়। জনতার আলোচ্য এখন রাষ্ট্রপতি। শাসকদলের একাংশের অভিমত, রাষ্ট্রপতি যে ভাবে অব্যবস্থা বা সরকারি পরিষেবা প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, তাতে মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া অনিবার্যই ছিল। তবে সেই প্রতিক্রিয়া একটু ‘নরম’ হতে পারত। এই বিতর্ক রাজ্যের আদিবাসী এবং জনজাতি মানুষের মনে ছাপ ফেলবে বলে মনে করছে শাসকদলের একাংশ।

বিজেপি যে আদিবাসী অধ্যুষিত আসন জয়ের লক্ষ্যে এই ময়দানে নেমেছে, তাতে কারও সন্দেহ নেই। ঘটনাপ্রবাহ বলছে, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে জনজাতি অধ্যুষিত জঙ্গলমহলের সবক’টি আসন জিতেছিল বিজেপি। কিন্তু ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে সেই ক্ষত অনেকটা মেরামত করে তৃণমূল। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে পশ্চিমাঞ্চলের তিনটি লোকসভা বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম এবং মেদিনীপুর আসন দখল করে নেয় তৃণমূল। অনেকের অভিমত, রাষ্ট্রপতিকে কেন্দ্র করে এই বিতর্ক সেই জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব তৈরি করতে পারে। আবার অনেকের বক্তব্য, আদিবাসী সমাজ ছাড়িয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরেও এই বিতর্ক ছাপ ফেলতে পারে।

পরিসংখ্যান বলছে, রাজ্যের মোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে ১৬টি আসন জনজাতিদের জন্য সংরক্ষিত। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, রাজ্যের অন্তত ৫২টি আসনে উল্লেখযোগ্য হারে আদিবাসী ভোট রয়েছে। যেমন বীরভূম, হুগলি, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমানের অনেক আসনে জনজাতি অংশের ভোট বিপুল। কিন্তু সেই আসনগুলি সংরক্ষিত নয়। ফলে এই বিতর্কের ব্যাপ্তি শুধু সংরক্ষিত আসনেই সীমাবদ্ধ না-ও থাকতে পারে।

খগেন তাঁর সাংবাদিক বৈঠকে বেশ কিছু বক্তব্য সাঁওতালি ভাষাতেও বলেন। সাঁওতালি সংবাদমাধ্যমের কোনও প্রতিনিধি না-থাকা সত্ত্বেও খগেন কেন সাঁওতালিতে কথা বলছিলেন, তা প্রথমে অনেকের কাছে স্পষ্ট হয়নি। পরে জানা যায়, খগেনের সাংবাদিক বৈঠকের উপর দিল্লি সরাসরি নজর রেখেছিল। ঘটানাচক্রে, দ্রৌপদীকে জবাব দিতে গিয়ে মমতার ধর্নামঞ্চে রবিবার বিরবাহাও বক্তৃতা করেন সাঁওতালি ভাষায়। উদ্দেশ্য এক, যাতে ওই ভিডিয়ো কেটে সমাজমাধ্যম ও হোয়াটসঅ্যাপ মাধ্যমে সরাসরি রাজ্যের জনজাতি প্রধান এলাকাগুলিতে ছড়িয়ে দেওয়া যায়।

শনিবার মুখ্যমন্ত্রী এবং তৃণমূলের তরফে জানানো হয়েছিল, রাষ্ট্রপতির কর্মসূচির স্থান নির্ধারণ বা বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানানো সংক্রান্ত বিষয়ে সব কিছু রাষ্ট্রপতির সচিবালয়কে জানিয়েই করা হয়েছিল। তাই রাষ্ট্রপতি যে সে সব বিষয়ে অবহিত ছিলেন না, এ অভিযোগ ঠিক নয়। বিজেপি রবিবার সে প্রসঙ্গে জানায়, কর্মসূচির স্থান যে বদল করা হচ্ছে, তা জানানো হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু স্থান বদলের যে কারণ দেখানো হয়েছিল, তা সত্য নয়। আন্তর্জাতিক আদিবাসী সম্মেলনের জন্য যে স্থান প্রথমে বাছা হয়েছিল (যেখানে কর্মসূচির অনুমতি মেলেনি), পরে সেখানে গিয়ে রাষ্ট্রপতি নিজেও বুঝতে পারেন, অকারণে অনুমতি আটকানো হয়েছিল। খগেনের কথায়, ‘‘প্রথমে যেখানে সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল, সেখানে পরে গিয়ে রাষ্ট্রপতি নিজেই বলেছেন, এখানে কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া হল না কেন, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। কারণ, ওই জায়গায় চার-পাঁচটা সম্মেলন একসঙ্গে চলতে পারে। এত বড় এলাকা! রাষ্ট্রপতি নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছেন।’’ পরে রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক লকেট আরও এক দফা আক্রমণ করেন তৃণমূলকে। তিনি বলেন, ‘‘নারী দিবসের প্রাক্কালে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে অপমান করা হল! যে মুখ্যমন্ত্রী আদিবাসী মহিলা রাষ্ট্রপতিকে এ ভাবে অপমান করতে পারেন, তিনি সাধারণ আদিবাসী মহিলাদের, জঙ্গলমহলের আদিবাসীদের, উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের কী ভাবে অপমান করতে পারেন ভেবে দেখুন।’’

পাল্টা বিরবাহা দাবি করেন, একমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই আদিবাসী অংশের মানুষ নিরাপদে রয়েছেন। বিজেপিশাসিত সব রাজ্যে তাঁরা ‘আক্রান্ত’।

পরিস্থিতি যা, তাতে এই বিতর্ক চলবে বলেই মনে করছেন যুযুধান দু’পক্ষের কুশীলবেরা। যত দিন এই বিতর্কে ইতি না পড়বে, ততদিন বিজেপি-কে নতুন নতুন অভিযোগ আনতে হবে। আর তৃণমূলকে দিতে হবে নতুন নতুন ব্যাখ্যা। ক্রমশ আড়ালে চলে যাবে এসআইআর এবং গ্যাসের মুল্যবৃদ্ধির প্রসঙ্গ।

Advertisement
আরও পড়ুন