SIR in West Bengal

রাত পোহালেই এসআইআরের তালিকা, ১১৬ দিন আন্দোলনে লাভ-ক্ষতির হিসাবে কোন দিকে ঝুঁকে আছে তৃণমূলের দাঁড়িপাল্লা?

আনুষ্ঠানিক ভাবে তৃণমূল শুধু লাভের কথাই বলেছে। আবার প্রকাশ্য মন্তব্যে বিজেপি কিছুটা সাবধানী। পদ্মশিবির দেখতে চাইছে, তালিকা প্রকাশের পরে বাস্তব ছবি কী হয়। তবে একান্ত আলোচনায় দু’পক্ষই ব্যাখ্যা দিচ্ছে লাভ-ক্ষতির।

Advertisement
শোভন চক্রবর্তী
শেষ আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৯:৫৯
TMC calculates profit and loss in SIR phase

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

নির্বাচন কমিশন নিযুক্ত বুথ লেভেল এজেন্টরা (বিএলও) বাড়ি বাড়ি পৌঁছে এনুমারেশন ফর্ম দেওয়া শুরু করেছিলেন গত বছর ৪ নভেম্বর। তার পরে নানা প্রক্রিয়া, ঘাত-প্রতিঘাত, মামলা-মোকদ্দমা, রাজনৈতিক আকচাআকচি, নিয়মের ওলটপালট পেরিয়ে শনিবার প্রকাশিত হতে চলেছে এসআইআরের চূড়ান্ত তবে অসম্পূর্ণ তালিকা। তালিকা অসম্পূর্ণ থাকলেও শনিবারই অনেকটা স্পষ্ট হবে, কাদের নাম ভোটার তালিকায় থাকছে আর কাদের নাম বাদ যাচ্ছে। তার আগে ১১৬ দিন (৩ মাস ২৩ দিন) ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে আন্দোলন করেছে শাসক তৃণমূল। তালিকা প্রকাশের আগে তারা কোথায় দাঁড়িয়ে? টানা আন্দোলনে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদলের লাভ কতটা হল? ক্ষতিই বা হল কতটা?

Advertisement

যে দিন আনুষ্ঠানিক ভাবে এসআইআর শুরু হয়েছিল, সেই ৪ নভেম্বর দুপুরেই রেড রোডে বিআর অম্বেডকরের মূর্তির পাদদেশ থেকে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি পর্যন্ত মিছিল করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সূচনাতেই সংবিধানপ্রণেতার পাশাপাশি জুড়ে নিয়েছিলেন বাঙালি গরিমার সঙ্গে সম্পৃক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। গত ১১৬ দিন ধরে তৃণমূল যে ধারায় এসআইআর আন্দোলনকে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে, তাতে সংবিধানরক্ষার বৃহত্তর বার্তা এবং বাংলা-বাঙালির ‘লাইন’ স্পষ্ট। তৃণমূলের নবীন-প্রবীণ সব নেতাই একান্ত আলোচনায় মানছেন, ভোটার তালিকায় দলীয় ভোটের কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা স্পষ্ট হবে তালিকা প্রকাশের পরে। কিন্তু এই পর্বে লাভও কম হয়নি। পাশাপাশিই অনেকে মানছেন, তালিকা প্রকাশের আগে বেশ কিছু ক্ষতিও হয়ে গিয়েছে।

আনুষ্ঠানিক ভাবে অবশ্য তৃণমূল শুধু লাভের কথাই বলেছে। দলের রাজ্য সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার বলেন, ‘‘গত সাড়ে তিন মাস ধরে যা হয়েছে, তা সবই গিয়েছে তণমূলের লাভের খাতায়। আমাদের ১৫ লক্ষ কর্মী মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়েছেন। বুথস্তর পর্যন্ত সাংগঠনিক নড়াচড়া হয়েছে। যা লাভ, আমাদেরই হয়েছে।’’ বিজেপি অবশ্য সাবধানী। তারা আনুষ্ঠানিক ভাবে তালিকা প্রকাশের আগে কোনও হিসাবই কষতে রাজি নয়। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘আগে তালিকা প্রকাশ হোক। তার পর লাভ-ক্ষতির অঙ্ক কষা যাবে। তার আগে নয়।’’

কিন্তু এ সব আনুষ্ঠানিক বক্তব্য। তার বাইরে লাভ-ক্ষতির অঙ্ক কষা শুরু হয়ে গিয়েছে শাসক শিবিরের অন্দরে। তারই হদিস দিচ্ছে আনন্দবাজার ডট কম।

লাভ: সাংগঠনিক মহড়া

এসআইআর প্রক্রিয়ায় তৃণমূল যে ভাবে সংগঠনকে ময়দানে নামিয়েছিল, তাতে ভোটের একপ্রস্ত মহড়া হয়ে গিয়েছে। দলের এক সাংসদের কথায়, ‘‘ভোটের জন্য আমরা যে কাজটা জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে শুরু করতাম, সেটা শুরু করে দিয়েছি নভেম্বর-ডিসেম্বরে। ক্যাডাররা রাস্তায় নেমে পড়েছে। নেতা-নেত্রীরা রাস্তায় নেমে পড়েছেন।’’ তৃণমূলের অন্দরে নানা শিবির মনে করছে, এ ব্যাপারে ষোলআনা কৃতিত্ব অভিষেকের। তিনিই এসআইআর সংক্রান্ত সাংগঠনিক কাজ তদারকি করছেন। নেতাদের জেলায় জেলায় পাঠিয়ে দেখভাল করিয়েছেন। এসআইআর প্রক্রিয়াকে হয়ে দাঁড়িয়েছে বিধানসভা নির্বাচনের ‘টেস্ট পরীক্ষা’। সাধারণ ভাবে অবামপন্থী দল সারা বছর রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে থাকে না। ভোট ঘোষণা হওয়ার মুখে গা ঝাড়া দিয়ে মাঠে নামে। অভিষেক তৃণমূলের সংগঠন দেখভাল শুরু করার পর থেকে সেই প্রবণতা কাটানোর চেষ্টায় ধারাবাহিকতা দেখিয়েছেন। এসআইআর পর্বের মহড়াকে ভোট প্রস্তুতির ভিত হিসাবে তুলে ধরে বুথ থেকে রাজ্যস্তর পর্যন্ত নেতাদের মাঠে নামাতে পেরেছেন তিনি। একান্ত আলোচনায় বিজেপি এবং সিপিএমের নেতারাও মানছেন, সাংগঠনিক ভাবে তৃণমূল অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে। তবে বিজেপির নেতারা এ-ও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, সবসময় সংগঠন দিয়ে সব ক্ষত মেরামত করা যায় না। তা হলে সিপিএম কোনও দিন সরকার থেকে যেত না।

ক্ষতি: কম ব্যবধানের আসনে উদ্বেগ

লাভের সঙ্গে ক্ষতিও আছে। তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে তৃণমূলে। অনেকের বক্তব্য, লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের নিরিখে এমন গোটা ৫০ আসন রয়েছে, যেখানে তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান ছিল সামান্যই। এসআইআরের পরে সেই সমস্ত কেন্দ্রে ভোটের হিসাব ঘেঁটে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও তৃণমূলের ‘আশাবাদী’ অংশের বক্তব্য, কার কত নাম বাদ গেল, তা তালিকা প্রকাশ না-হলে বোঝা মুশকিল। তা-ই আগে থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করার কিছু নেই। তাঁদের পাল্টা এ-ও যুক্তি যে, এমন অনেক বিধানসভা রয়েছে, যেখানে বিজেপি গত লোকসভা ভোটে কম ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। এমন তো নয় যে, ভোটার তালিকা থেকে শুধু তৃণমূলের ভোটারদেরই নাম বাদ যাবে।

লাভ: সরকার-সংগঠনের তালমিল

গোড়া থেকেই নির্বাচন কমিশনকে তাদের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ হিসাবে উপস্থাপিত করেছে তৃণমূল। সে ক্ষেত্রে সংগঠনের পাশাপাশি রাজ্য সরকারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সংগঠন এবং সরকার চলেছে সমান্তরাল ভাবে। তালমিল রেখে। তৃণমূলের অনেকের ব্যাখ্যা, ভোটের আগে দিদি এবং অভিষেকের যুগলবন্দি দেখা গিয়েছে এসআইআর পর্বেই। যা দলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তবে সংগঠন, সরকারের পাশাপাশি পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ থেকেছে। তৃণমূলের নেতারাও মেনে নিচ্ছেন, আইপ্যাকের প্রশিক্ষণ, তাদের কর্মীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছাড়া এসআইআর প্রক্রিয়া এই রকম ‘সুসংহত’ ভাবে পার করা শুধু দলীয় সংগঠনের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

ক্ষতি: মননে মেরুকরণ

এসআইআর পর্বে বিজেপি গোড়া থেকে একটি বিষয় প্রচার করেছে। তা হল, যে ভাবে অনুপ্রবেশের কারণে পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাস বদলে গিয়েছে, তা ঠিক করতে না-পারলে পশ্চিমবাংলার কোনও ভবিষ্যৎই নেই। এই জনবিন্যাস বদলের প্রশ্নে কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে মুসলিম অনুপ্রবেশের তত্ত্বকে। তৃণমূলের একাংশের বক্তব্য, এই প্রচার ভোটারদের মননে ‘মেরুকরণ’ তৈরি করে দিয়েছে। বিশেষত, উদ্বাস্তু অধ্যুষিত এলাকা এবং যে এলাকায় হিন্দু-মুসলিমের মিশ্র বসতি, সেখানে এই মেরুকরণের আবহ তীব্রতর হয়েছে। অন্যদিকে, নানা সূচকে সংখ্যালঘু ভোট ভাগ করারও প্রয়াস জারি রয়েছে। সেই প্রেক্ষিতেই মেরুকরণের আবহ নিয়ে কিঞ্চিৎ উদ্বেগে শাসকদলের অনেকে। বিজেপির এক প্রবীণ নেতা এই আবহকে ‘দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ’ হিসাবে অভিহিত করেছেন।

লাভ: চেনা মেজাজে মমতা

এসআইআর পর্বে চেনা মেজাজে দেখা গিয়েছে মমতাকে। শাসকের চেয়ারে থেকেও তিনি অবতীর্ণ হয়েছিলেন বিরোধী নেত্রীর ভূমিকায়। শুধু কলকাতায় মিছিল বা নবান্নের সাংবাদিক বৈঠকে তা সীমাবদ্ধ থাকেনি। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির এজলাস পর্যন্ত পৌঁছে সওয়াল করেছিলেন তিনি। শাসকদলের একাধিক নেতার বক্তব্য, রাজনীতিতে ধারণাই (পারসেপশন) সবচেয়ে বড় কথা। এসআইআর প্রক্রিয়ার জন্য মানুষ যখন হয়রানির মধ্যে, তখন মমতা নিজেকে ‘আমি তোমাদেরই লোক’ হিসাবে তুলে ধরতে পেরেছেন। এক প্রবীণ সাংসদের ব্যাখ্যা, রাজ্য সরকারের কাঁধে ১৫ বছরের স্থিতাবস্থা বিরোধিতার বোঝাকে হাল্কা করে দিয়েছে এসআইআর। তাঁর কথায়, ‘‘এসআইআর হল সেই কার্পেট, যার নীচে বাকি সমস্ত সমস্যা বা খামতি চাপা পড়ে গিয়েছে।’’

ক্ষতি: শহরাঞ্চলে সাফাই অভিযান

গত লোকসভা নির্বাচনে শহর এবং মফস্সলে তৃণমূলের তুলনায় ভাল ফল করেছিল বিজেপি। ষাটেরও বেশি পুরসভা এলাকায় এগিয়ে ছিল পদ্মশিবির। তৃণমূলের অনেকের বক্তব্য, শহর এলাকায় তাদের মূল শক্তি বস্তিবাসী, গরিব মানুষ। অন্যদিকে, মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তদের মধ্যে বিজেপির প্রভাব বেশি। তৃণমূলের প্রতি আস্থাশীল সেই গরিব অংশের মানুষ এসআইআরে নথি জমা দেওয়ার কাজ কতটা করে উঠতে পেরেছেন, তা নিয়ে বেশ কিছু জায়গায় সংশয় তৈরি হয়েছে। সেই নিরিখেই শাসকদলের অনেকের আশঙ্কা, শহরাঞ্চলে ভোটের সময় কী সমীকরণ হবে তা এখনই বলা মুশকিল। শহরাঞ্চলে এসআইআরের প্রভাব কতটা পড়বে, তা নিয়ে হিসাবনিকাশও শুরু হয়েছে। তবে এক প্রবীণ নেতার কথায়, ‘‘এটা ঠিকই যে, সাধারণ ভাবে শহরাঞ্চলের মানুষ স্থিতাবস্থার বিরোধী হন। কিন্তু এসআইআরের ফলে তো মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ মধ্যবিত্তদেরও হয়রানি পোহাতে হয়েছে। সেটার কথা নিশ্চয়ই তাঁরা মনে রাখবেন!’’

Advertisement
আরও পড়ুন