(বাঁ দিকে) কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী গিরিরাজ সিংহ, তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (ডান দিকে)। ছবি: সংগৃহীত।
রাজ্যের পাটশিল্পে নতুন করে সঙ্কটের ছায়া! নতুন বছরের প্রথম দিনই রাজ্যের পাটশিল্পের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী গিরিরাজ সিংহকে চিঠি লিখলেন রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদ তথা আইএনটিটিইউসি-র রাজ্য সভাপতি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। দু’পাতার চিঠিতে গিরিরাজকে সমস্যার পাশাপাশি সমাধানের উপায়ের বিষয়েও এক-দুই-তিন করে পরামর্শ দিয়েছেন তৃণমূল সাংসদ।
কেন্দ্রীয় সরকারের বরাত কমে যাওয়ার ফলেই উৎপাদনের গতি ক্রমশ শ্লথ করছে পাটকলগুলি। ফলস্বরূপ গঙ্গার দু’পারে হাওড়া, হুগলি, ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের পাটকলগুলিতে কোথাও কাজ বন্ধের নোটিস ঝুলছে। কোথাও আবার কর্মদিবস কমিয়ে সপ্তাহে ছয় বা পাঁচ দিন করা হচ্ছে। হাওড়ার বালি জুটমিল-সহ হুগলির একাধিক কারখানায় কর্মদিবস কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। চাঁপদানির নর্থব্রুক জুটমিল বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। স্থানীয় তৃণমূল বিধায়ক অরিন্দম গুঁইনের হস্তক্ষেপে আগামী সোমবার থেকে ফের তা খুলতে চলেছে। তবে সপ্তাহে কত দিন কাজ হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার যখন গিরিরাজের মন্ত্রকে ঋতব্রতের চিঠি পৌঁছেছে, তখনই ভদ্রেশ্বরের অ্যাঙ্গাস জুটমিলে বৈঠক চলছে কর্মদিবস সঙ্কোচনের বিষয়ে।
কেন এই পরিস্থিতি?
এখন বেশিরভাগ পাটকলই কেন্দ্রীয় সরকার ও বিভিন্ন রাজ্য সরকারের বরাতের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু সেই বরাত দেওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এর নেপথ্যে ‘সিন্থেটিক লবির চাপ’ রয়েছে বলে অভিমত তৃণমূলের অনেকের। যে ‘সিন্থেটিক লবি’ নিয়ন্ত্রিত হয় গুজরাত এবং মহারাষ্ট্র থেকে। ঘটনাচক্রে, ওই দুই রাজ্যই বিজেপি-শাসিত। বরাত কমার ফলে উৎপাদনও ধাক্কা খাচ্ছে। আপাতত যে পরিমাণ পাটের বস্তা উৎপাদন হচ্ছে, তা মজুত করে রাখার জন্য। কিন্তু তারও একটা সীমা রয়েছে। তৃণমূলের আশঙ্কা, এই জিনিস চলতে থাকলে খুব তাড়াতাড়ি লাইন দিয়ে পাটকলগুলি বন্ধ হতে শুরু করবে। তেমন হলে ভোটের আগে আইনশৃঙ্খলার সমস্যাও তৈরি হতে পারে। পাটশিল্পের মতো সঙ্কট তৈরি হচ্ছে পাটচাষিদের ক্ষেত্রেও।
জুটমিল মহল্লাগুলিতে বেশিরভাগই হিন্দিভাষী মানুষের বাস। শ্রমিকদের মধ্যে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ই রয়েছে। এবং মিলের অর্থনীতিভিত্তিক এলাকাগুলিতে মেরুকরণের আবহও রয়েছে। ফলে শাসকদলের নেতারা একান্ত আলোচনায় মানছেন, নানা কারণেই পরিস্থিতি ‘স্পর্শকাতর এবং গুরুতর’। গিরিরাজকে লেখা চিঠিতেও ঋতব্রত ‘অর্থনৈতিক এবং সামাজিক জরুরি অবস্থা’র প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। যদিও উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকারের শ্রম দফতরের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে তৃণমূলের অন্দরেও।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরেই রাজ্যের পাটশিল্প ধুঁকছে। বহু কারখানা বন্ধ হয়েছে। বেশিরভাগ পাটকলেই মূল শ্রমশক্তি এখন ঠিকাদারি প্রথায় চলে। স্থায়ী কাজ সে অর্থে নেই। সেই ‘গোদের’ উপরেই ‘বিষফোড়া’ হয়ে আবির্ভূত হয়েছে বর্তমান পরিস্থিতি।
রাজ্য বিজেপি-তে পাটকলের সামগ্রিক বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা রয়েছে ব্যারাকপুরের প্রাক্তন সাংসদ অর্জুন সিংহের। তিনি নিজে মিল মহল্লার নাগরিক। মিলের রাজনীতির মাধ্যমেই ভাটপাড়া, জগদ্দলে তাঁর উত্থান। ২০১৯ সালে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে গিয়ে সাংসদ হলেও তিন বছরের মধ্যে তা ছেড়ে দিয়ে তৃণমূলে ফিরে গিয়েছিলেন অর্জুন। সেই পর্বে পাটশিল্প নিয়ে নরেন্দ্র মোদী সরকারের ‘অনীহা’ নিয়ে প্রকাশ্যে সরব হয়েছিলেন তিনি। সেই তিনি আবার বিজেপি-তে চলে গিয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিনি অবশ্য কেন্দ্রীয় সরকারকে আর দায়ী করতে চান না। তাঁর দাবি, ‘‘এক মাস আগে আমিই প্রথম পাটশিল্পের সঙ্কট নিয়ে দিল্লিতে এবং রাজ্য সরকারকে চিঠি লিখেছিলাম। এখন রাজ্য সরকার দামবৃদ্ধির জন্য মজুতের পথে হাঁটছে। সঙ্কট সে কারণেই।’’