ওবিসি সংরক্ষণে বিধানসভায় জোড়া বিল পাশ হল সোমবার। —প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
ওবিসি বা অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায়ের সংরক্ষণ নিয়ে বিধানসভায় জোড়া সংশোধনী বিল পাশ হল বিধানসভায়। সোমবার বিধানসভায় বিল পেশ করেন রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণিকল্যাণমন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ। প্রথমে মনে করা হয়েছিল বিলটি নিয়ে ধ্বনিভোট হবে। তবে সংশোধনী বিলের বিরোধিতা করে এটি নিয়ে ভোটাভুটি বা ডিভিশন চান আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি। তাঁর আবেদনে সম্মতি দেন বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসু। কালীঘাট তৃণমূল ভোটাভুটিতে অংশ নিলেও কক্ষত্যাগ (ওয়াকআউট) করেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল বিধায়কেরা। বিলের পক্ষে ভোট পড়ে ১৮৬টি, বিপক্ষে ১৭টি। ভোটদান থেকে বিরত থাকেন ছ’জন।
ভোটাভুটির আগে ঋতব্রত শিবিরের অধিকাংশ বিধায়ক বেরিয়ে গেলেও অনেকে বেরোতে পারেননি। পরে স্পিকারের অনুমতি নিয়ে তাদের বেরোতে দেওয়া হয়। যথাসময়ে না-বেরোনোর জন্য ওই বিধায়কদের ভর্ৎসনা করেন স্পিকার। তার পরেও অবশ্য ঋতব্রত শিবিরের ছয় বিধায়ক কক্ষত্যাগ করেননি। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বাইরন বিশ্বাস, মোশারফ হোসেন, কাজল শেখ এবং তৌফিকুর রহমান। এই বিধায়কেরা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে নিজেদের আসনে গিয়ে বসেন। বিল পাশের পর ‘বিদ্রোহী’ বিধায়কদের প্রত্যেকেই ফের অধিবেশনকক্ষে ফেরেন।
বিলের পক্ষে প্রথমে বলতে ওঠেন দমদমের বিজেপি বিধায়ক অরিজিৎ বক্সী। তাঁর দাবি, তোষণ এবং ভোটব্যাঙ্কের স্বার্থে আগের তৃণমূল সরকার ওবিসি তালিকা তৈরি করেছিল। বিলের বিপক্ষে বক্তৃতা করেন ঋতব্রত-তৃণমূলের বিধায়ক, জয়নগরের বিশ্বনাথ দাস। বিলের বিপক্ষে বলেন নওশাদও।
তৃণমূল জমানার ২০১২ সালের ওবিসি সংরক্ষণ সংক্রান্ত আইন সংশোধনের লক্ষ্যে সোমবার বিধানসভায় পেশ করা হয়েছিল দুই সংশোধনী বিল। সেগুলি হল, ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস (আদার দ্যান শিডিউল কাস্ট অ্যান্ড শিডিউল ট্রাইব) রিজ়ার্ভেশন অফ ভ্যাকান্সিস ইন সার্ভিসেস অ্যান্ড পোস্ট অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’ এবং ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল কমিশন ফর ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’।
ওবিসি সংরক্ষণের জন্য ক্যাটেগরি ‘এ’-র আওতায় মোট ৬৫টি জনগোষ্ঠী রয়েছে। তৃণমূল জমানায় তৈরি আইনে ক্যাটেগরি ‘বি’-তে রয়েছে ৭৮টি জনগোষ্ঠী। সেই তালিকা সম্বলিত তফশিল বা ‘সিডিউল ওয়ান’ বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে নতুন বিলে। পাশাপাশি অনগ্রসর কমিশনে কোনও গোষ্ঠীর নাম অন্তর্ভুক্তি বা বাদ দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ওবিসি-র আওতায় হিন্দুদের নানা গোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে মুসলিমদের কেন ‘বাড়তি সুবিধা’ দেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্ন আগেই তুলেছিল বিজেপি। এ বার ওই তালিকার আইনি স্বীকৃতি বাতিলের পথে গেল তাদের সরকার।
রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশনের রিপোর্ট সামনে আসার পরে রাজ্যে ওবিসি সংরক্ষণ চালু করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। অনগ্রসরতার নিরিখে ‘ক্যাটেগরি এ’ এবং ‘ক্যাটেগরি বি’, এই দুই ভাগের জন্য যথাক্রমে ১০ শতাংশ এবং ৭ শতাংশ সংরক্ষণ ধার্য করা হয়েছিল। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মন্ত্রিসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী যোগেশচন্দ্র বর্মন ২০১০ সালে সেই মর্মে বিল পেশ করেছিলেন। রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরে তৃণমূলের সরকার ২০১২ সালে ওই আইন সংশোধন করেছিল। তখন তফসিল-১’এর মধ্যে ‘ক্যাটেগরি এ’ হিসেবে সংরক্ষণের জন্য ৬৫টি এবং ‘ক্যাটেগরি বি’-তে ৭৮টি জনগোষ্ঠীর তালিকা জুড়ে দেওয়া হয়। তফসিলি জাতি থেকে ধর্মান্তরিত খ্রিস্টানদেরও ‘ক্যাটেগরি বি’-র আওতায় রাখা হয়েছিল। বাম জমানার আইনে তফসিল-১’এ রাখা হয়েছিল সংরক্ষণের নীতির বাইরে কারা থাকবেন, তার তালিকা। আর তফসিল-২’এ ছিল বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ কী ভাবে কার্যকর হবে, তার নমুনা বোঝাতে ১০০টি শূন্য পদের ‘রস্টার’। তৃণমূল সরকার আইন সংশোধনের সময়ে বাম আমলের তফসিল-১ ও ২’কে যথাক্রমে তফসিল-২ ও ৩’এ নিয়ে গিয়েছিল। এ বার বিজেপি সরকারের বিলে বাম জমানার তফসিল-১ (অর্থাৎ তৃণমূল সরকারের আইনের তফসিল-২) ফের বহাল হল তফসিল-১ হিসেবেই। আর তৃণমূল সরকারের করে যাওয়া সর্বশেষ আইনের তফসিল-১ ও ৩ তুলে দেওয়া হল।
নতুন বিলে ২০১২ সালের আইন সংশোধন করতে চেয়ে বলা হয়েছে, অনগ্রসর কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ করে রাজ্য সরকার ওবিসি-র জন্য সংরক্ষিত পদের শতাংশ হার ঠিক করবে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর সংরক্ষণের অনুপাতে পদের শতাংশ বাড়ানো হতে পারে, তবে সার্বিক ভাবে ৫০ শতাংশের বেশি হবে না। কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করেই রাজ্য সরকার ওবিসি নাগরিকদের বিভিন্ন শ্রেণিতে (ক্যাটেগরি) ভাগ করতে পারবে তাদের অনগ্রসরতার নিরিখে। সেই মতো পদে সংরক্ষণ হবে এক একটা শ্রেণির জন্য।
অনগ্রসর শ্রেণি কমিশন সংক্রান্ত ১৯৯৩ সালের আইন সংশোধন করার বিলে বলা হয়েছে, ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য নাগরিকেরা আবেদন করতে পারবেন। কমিশন সুপারিশ করবে সরকারকে। কোনও অংশের অতি-অন্তর্ভুক্তি বা কম অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে অভিযোগ জানানো যাবে। এই ক্ষেত্রে কমিশনের সুপারিশই মানবে সরকার। কমিশনের সদস্যদের মেয়াদ তিন বছরই রাখা হচ্ছে। তবে সদস্য-সচিবের (যিনি রাজ্য সরকারে কর্মরত) মেয়াদ কত দিন থাকবে, সেই বিষয়ে রাজ্য সরকারই সিদ্ধান্ত নেবে।