Sudip Bandopadhyay

‘মোদীর সঙ্গে থাকব বলেই এনডিএ-তে যোগ দিয়েছি এখনই বলব না’! বিদ্রোহী সুদীপের গলাতেও আইপ্যাক-অসন্তোষ

সুদীপ তৃণমূল ছাড়লেন। প্রশ্ন উঠছে, এ বার তাঁর স্ত্রী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিদ্রোহী পরিষদীয় দলে নাম লেখাবেন? সেই প্রসঙ্গে সুদীপ বলেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে তৃণমূল করেছে। নয়না সেখানেই থাকবে।’’

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬ ২০:৪১
What did rebel MP Sudip Bandyopadhyay say about leaving

বিদ্রোহী সাংসদের নিয়ে তৃণমূল ছাড়া প্রসঙ্গে মুখ খুললেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

তৃণমূলের ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদের চিঠিতে শেষ সইটা করেছেন তিনিই। তৃণমূলের ছ’বারের সাংসদ তথা দলের লোকসভার নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি-সহ তৃণমূলের বিদ্রোহী ব্লকের ২০ জন সাংসদ রবিবার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে জমা দেওয়া চিঠিতে জানিয়ে দেন, তাঁরা নতুন দলের সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছেন। সংসদে সমর্থন করবে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-কে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে থাকবেন বলেই কি তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ছাড়লেন সুদীপ? আপাতত তেমন কোনও ভাবনা নেই বলেই জানালেন উত্তর কলকাতার সাংসদের। এবিপি আনন্দ-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘‘মোদীর সঙ্গে থাকব বলেই এখানে যোগ দিয়েছি এখনই তা বলব না।’’ একই সঙ্গে তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর দূরত্বের কারণও স্পষ্ট করলেন সুদীপ।

Advertisement

সরাসরি মমতার বিরুদ্ধে কোনও ক্ষোভ শোনা যায়নি সুদীপের গলায়। তবে তিনি ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের উদাহরণ টেনেছেন। তাঁর অনুযোগ, সাংসদ থাকা সত্ত্বেও ২০০৪ সালে তাঁকে টিকিট দেওয়া হয়নি। তাঁর বদলে প্রার্থী করা হয় সুব্রত মুখোপাধ্যায়কে। সেই বছর নির্দল হয়ে লড়েছিলেন সুদীপ। প্রায় ৮২ হাজার ভোট পেয়েছিলেন তিনি। সুদীপের কথায়, ‘‘প্রার্থী বদল না-করলে সে বছর উত্তর কলকাতা থেকে তৃণমূল জিততে পারত। মাঝখান থেকে সিপিএম জিতে যায়।’’

সুদীপ জানান, দলের নেতানেত্রীদের নিয়ে কোনও অভিযোগ থাকলেও তিনি প্রকাশ্যে কখনও মুখ খোলেননি। তাঁর কথায়, ‘‘আমি কখনই দলের কথা বাইরে বিবৃতি দিয়ে জানাইনি। দলে কেউ কোনও আক্রমণ করলে আমি অভিযোগ জানিয়েছি। কিন্তু বাইরে কিছু বলিনি।’’ মমতাকে তৃণমূলনেত্রী হিসাবেই দেখে এসেছেন বলেও জানান সুদীপ। সাংসদের কথায়, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরের দিন থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমি নাম ধরে ডাকিনি। নেত্রী বলে ডেকেছি। গত ১৫ বছরে দলীয় কাজের বিষয়ে এক হাজারের বেশি চিঠি আদানপ্রদান হলেও সেখানে প্রিয় নেত্রী বলে উল্লেখ করেছি।’’

কেন তৃণমূল ছাড়লেন? কেন এনডিএ-তে যোগ দেওয়া সিদ্ধান্ত? কেন ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’-র সঙ্গে জুড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে সায় দিলেন? সুদীপের মতে, ‘‘আমার সম্পর্কে কুৎসা, অপপ্রচার করতে দলের মধ্যে অনেকের মুখ বন্ধ হচ্ছে না। দলের মধ্যেকার অধিকাংশ মানুষ যখন বলতে শুরু করেন, তাঁদের কথা দলের একটা জায়গার পৌঁছোতে পারছে না। দলের বিষয়ে অভিষেকের (বন্দ্যোপাধ্যায়) কাছে পৌঁছোতে গেলে তাঁর ব্যক্তিগত সচিবের মাধ্যমে পৌঁছোতে হচ্ছে। তৃণমূলের কথার সঙ্গে বাস্তব মিলছিল না। কোথাও গিয়ে আমার মনে হয়েছে, এই দলের পরিবর্তন হওয়া দরকার।’’

অন্য বিদ্রোহীদের মতো সুদীপের নিশানাতেও আইপ্যাক। তাঁর অভিযোগ, ‘‘বসের মতো ছড়ি ঘোরাচ্ছিল তারা।’’ মমতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও অনেকের প্রশ্ন তুলছেন। সে প্রসঙ্গে সুদীপ মনে করেন, মমতা যদি সঠিক পথে এই দলকে পরিচালনার চেষ্টা করেন তবে আবার ফিরে আসবে। সেই দক্ষতা রয়েছে মমতার। তৃণমূলে বিদ্রোহের নেপথ্যে কি বিজেপি? সুদীপের স্পষ্ট জবাব, ‘‘আমার সঙ্গে বিজেপির কেউ যোগাযোগ করেননি।’’ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার বার্তাও দিয়ে রাখেন সুদীপ। বর্ষীয়ান ওই নেতার কথায়, ‘‘শুভেন্দুর সঙ্গে একজোট হিসাবে কাজ করতে আমার কোনও আপত্তি নেই। যদি সহযোগিতা চান, অবশ্যই দাদা হিসাবে পরামর্শ দেব।’’ নতুন দলের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে এখনই মুখ খুলতে রাজি নন সুদীপ।

সুদীপ তৃণমূল ছাড়লেন। প্রশ্ন উঠছে, এ বার তাঁর স্ত্রী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিদ্রোহী পরিষদীয় দলে নাম লেখাবেন? সেই প্রসঙ্গে সুদীপ বলেন, ‘‘নয়না কখনও কংগ্রেস করেনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে তৃণমূল করেছে। নয়না সেখানেই থাকবে। আমি আপত্তি করিনি। আমি আমার মতো থাকতে চেয়েছি।’’

অনেকের মতে, দুই দশক আগে সুদীপকে দিয়ে যা করাতে চেয়েছিল বিজেপি, এখন সেই পথেই হাঁটলেন বর্ষীয়ান নেতা। অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলে সুদীপকে দলে চেয়েছিল বিজেপি। কারণটা ছিল খুবই সহজ। সুদীপ ছিলেন অন্যতম শক্তিশালী সাংসদ। ১৯৯৯ সালে লোকসভায় তৃণমূলের মুখ্যসচেতক ছিলেন। সংসদীয় রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর ধারণা ছিল অত্যন্ত গভীর। সংসদকে বুঝতেন হাতের তালুর মতো। সেই সময় বাজপেয়ী এবং লালকৃষ্ণ আডবাণীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি হিন্দি বলয়ের বাইরে নিজেদের বিস্তার করতে চেয়েছিল। তারা বিশ্বাস করতেন, সুদীপ কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গের বাকি অংশে তৃণমূলের প্রভাব খর্ব করতে তাঁদের সাহায্য করতে পারবেন। কিন্তু সেই সময় সুদীপ বিজেপির থেকে দূরত্ব রেখেছিলেন।

তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল বেশ আকর্ষণীয়। ওড়িশার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েক এবং তাঁর দল বিজু জনতা দল (বিজেডি) এনডিএ-কে সমর্থন করত। পরবর্তীকালে বিজেডির মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভাজন দেখা যায়। নবীন বিরোধী গোষ্ঠী তৈরি হয়। আডবাণীরা চেয়েছিলেন, তৃণমূলেও একই পরিস্থিতি তৈরি করতে। সেই সময় মমতার কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ ছিল তৃণমূলের অন্দরে। বিজেপি ভেবেছিল, তৃণমূলের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে সেই সময় সুদীপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারতেন। তবে শেষপর্যন্ত তৃণমূলের হাত ছাড়েননি সুদীপ। দুই দশকের বেশি সময় পর সেই সুদীপই এখন তৃণমূল-ছাড়া।

Advertisement
আরও পড়ুন