বাংলাদেশ র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন। ছবি: সংগৃহীত।
মানবাধিকার লঙ্ঘন থেকে রাজনৈতিক খুন, শেখ হাসিনার দেড় দশকের প্রধানমন্ত্রিত্বে বারে বারেই বিতর্কে জড়িয়েছে বাংলাদেশের সন্ত্রাসদমন বাহিনী র্যাব (র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন)। জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই সনদ নিয়ে ভোটের ঠিক আগে সেই বাহিনীকে কার্যত বিলুপ্ত করার ঘোষণা করল মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) জাহাঙ্গির আলম চৌধুরী মঙ্গলবার জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা সংক্রান্ত কোর কমিটির সুপারিশ মেনে নাম বদলাচ্ছে র্যাব। তিনি বলেন, ‘‘র্যাবের নতুন নাম হবে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ বা এসআইএফ।’’ ইউনূস সরকার শীঘ্রই এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী নির্বাহী আদেশনামা জারি করবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সন্ত্রাসদমন বাহিনী হিসাবে র্যাবের প্রতিষ্ঠা ২০০৪ সালে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে তখন ছিলেন প্রয়াত বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া। সে সময় থেকেই রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগ উঠতে শুরু করেছিল ওই বাহিনীর বিরুদ্ধে। তা চরমে পৌঁছোয় ২০০৮-এ হাসিনা দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতা দখল করার কয়েক বছর পর থেকে। আওয়ামী লীগের বিরোধীদের অনেকে এই বাহিনীকে ‘মুজিবুর রহমানের জমানার রক্ষীবাহিনীর নতুন সংস্করণ’ বলে চিহ্নিত করতেন! সন্ত্রাসদমন, মাদক চোরাচালান রোধ, আপৎকালীন পরিস্থিতিতে অভিযানের জন্য গড়া এই বাহিনীকে শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিরোধীদের দমনপীড়ন, অবৈধ ভাবে আটক করে রাখা, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো, এমনকি গুপ্তহত্যার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে বারে বারেই!
শুধু বাংলাদেশের অন্দরে নয়, হাসিনার জমানায় মানবাধিকার লঙ্ঘন আর গুপ্তহত্যার জন্য আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচিত হয়েছে র্যাবের নাম। ২০২০ সালে র্যাবের সিনিয়র কর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়েছিল আমেরিকার কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সেনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটি। সে সময় তাদের রিপোর্টে বলা হয়েছিল, হাসিনা জমানায় ২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশে ৪০০-র বেশি মানুষের বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে র্যাব ‘প্রত্যক্ষ ভাবে’ জড়িত! প্রসঙ্গত, হাসিনার পিতা বঙ্গবন্ধু মুজিব ক্ষমতায় থাকার সময়ও তাঁর হাতে গড়া জাতীয় রক্ষীবাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুমখুনের অভিযোগ উঠেছিল ভূরি ভূরি। প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধা এবং মুজিব বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে গড়া ওই বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের নির্মূল করতে ব্যবহার করা হত বলে সত্তরের দশকে অভিযোগ তুলেছিল ওয়াশিংটন।
১৯৭৫ সালের ১৫ অগস্ট সেনার একাংশের অভ্যুত্থানে মুজিব সপরিবারে নিহত হওয়ার পরে ভেঙে দেওয়া হয় রক্ষীবাহিনীকে। অধিকাংশ অফিসার এবং জওয়ানকে পুনর্বাসিত করা হয় বাংলাদেশ সেনায়। বাংলাদেশ সেনা, বিডিআর (বর্তমানে নাম বদলে বিজিবি), ব্যাটেলিয়ন আনসার এবং বাছাই করা সদস্যদের নিয়ে গড়া র্যাব অবশ্য সন্ত্রাস দমনে অনেকবারই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। ২০০৬ সালে তদারকি সরকারের জমানায় সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী জাগ্রত মুসলিম জনতার কুখ্যাত নেতা বাংলা ভাই ওরফে সিদ্দিকুল ইসলামকে গ্রেফতার করেছিল তারা। জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বহু সফল অভিযানেরও নজির রয়েছে এই বাহিনীর। প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পিলখানা বিদ্রোহ এবং গণহত্যাকাণ্ডের পরে বাংলাদেশ রাইফেল্স (বিডিআর) বাহিনীর নাম বদলে বাংলাদেশে বর্ডার গার্ড (বিজিবি) করা হয়েছিল। এ বার আর এক ফেব্রুয়ারিতে নাম বদল হল র্যাবের।