ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর উঠে আসছে নির্বাসিত ‘যুবরাজ’ রেজ়া পহলভির নাম। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
ইজ়রায়েল এবং আমেরিকার যৌথ হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। ৩৭ বছরের সাম্রাজ্যের পতন ঘটল। তাঁর উত্তরসূরি হিসাবে কে ইরানের দায়িত্ব নেবেন, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এই ইসলামিক রিপাবলিক সরকার গড়ে উঠেছিল ইরানি বিপ্লব বা ইসলামিক বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে। আর সেই সরকারের মাথায় ছিলেন আয়াতোল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনি। ইরানে সেই শুরু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসন।
১৯৭৯ সালে রাজতন্ত্র-বিরোধী বিপ্লবের সাক্ষী হন ইরানের মানুষ। পহলভি রাজবংশের শাসক শাহ মহম্মদ রেজ়া পহলভিকে সরিয়ে খোমেইনির নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে ইসলামিক রিপাবলিক সরকার। তবে এই বিপ্লবের বীজ বোনা হয়েছিল অনেক দিন আগে থেকেই। ইরানের রাজবংশের প্রতি সাধারণ মানুষের অসন্তোষ থেকে জন্ম নেয় বিপ্লব।
ইরান থেকে রাজপরিবারকে উৎখাত করার এই বিপ্লবকে সমর্থন জুগিয়েছিল বিভিন্ন বামপন্থী এবং ইসলামপন্থী সংগঠনও। ইতিহাসের পাতায় এই ঘটনা ইরানি বিপ্লব বা ইসলামিক বিপ্লব নামেও পরিচিত। রেজ়া পহলভির সময়কালে তাঁর বিভিন্ন নীতি, দমনমূলক মানসিকতা জনমানসে ক্ষোভের জন্ম দেয়। ঠিক যেমন সাম্প্রতিক সময়ে খামেনেই-বিরোধী আন্দোলন উত্তাল হয়ে উঠেছিল ইরান। মূল যুব সমাজ পথে নেমে খামেনেই-বিরোধী আন্দোলনে শামিল হয়েছিল। সত্তরের দশকের শেষের দিকে ইরানের মাটিতে সেই ছবিই দেখা গিয়েছিল। আন্দোলনের নিশানায় ছিল ইরানের তৎকালীন পহলভি রাজবংশ।
ইরানি বিপ্লবের সূচনার নেপথ্যের কারণ ছিল আরও অনেক। শাহ মহম্মদ রেজ়া পহলভির বাবা রেজ়া শাহের হাত ধরে ইরানে ক্ষমতায় আসে পহলভি রাজবংশ। সেই সময় ব্রিটিশেরা তাঁকে প্রচুর সাহায্য করেছিল। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ছবিটা পাল্টে যায়। ‘মিত্র’ ব্রিটেনই ইরানে আক্রমণ করে। ইরানের উপর জার্মানির প্রভাব বিস্তার মেনে নিতে পারেনি ইংল্যান্ড। রেজ়া শাহ ইরানের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়িত করতে জার্মানির দিকে ঝুকেছিলেন। আর তাঁর এই সিদ্ধান্তের কারণেই সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ব্রিটেনের রক্তচক্ষু হয়ে ওঠেন রেজ়া শাহ। ইতিহাসবিদদের মতে, জার্মানি-প্রীতি ভাল ভাবে নেয়নি ব্রিটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। তাদের আশঙ্কা ছিল, ইরানকে ঘাঁটি করে হামলার পরিকল্পনা করছে জার্মানি। আর সেই কারণেই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ব্রিটেন।
১৯৪১ সালে ক্ষমতাচ্যুত হন রেজ়া শাহ। আবার ইরানের ক্ষমতা যায় ব্রিটেনের হাতে। কিন্তু ইরানের শাসনভার কার হাতে দেওয়া যায়, তা নিয়ে সেই সময় মিত্রবাহিনীর মধ্যেই টানাপড়েন ছিল। শেষপর্যন্ত রেজ়া শাহের পুত্র রেজ়া পহলভিকে সিংহাসনে বসানো হয়। দেশছাড়া হতে হয় রেজ়া শাহকে।
রেজ়া পহলভি যখন সিংহাসনে বসেন তখন তাঁর বয়স ২২। ইরানে তখন সমান্তরাল দুই শক্তির শাসন চলত। রাজবংশ থাকলেও নির্বাচিত সরকারের কাঁধেই ইরানের শাসনভারের দায়িত্ব ছিল। রেজ়া পহলভি প্রথম থেকেই ব্রিটেনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে গিয়েছেন। তবে প্রায়ই নির্বাচিত সরকারের কাজে হস্তক্ষেপ করতেন তিনি। তাঁর এই কর্মকাণ্ড ইরানের মধ্যে এক অসন্তোষের জন্ম দেয়।
পঞ্চাশের গোড়ার দিকে মহম্মদ মোসাদ্দেক নামে এক জাতীয়তাবাদী নেতার উত্থান রেজ়া পহলভির সাম্রাজ্যের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে মোসাদ্দেকের জনপ্রিয়তার কারণে পহলভি চুপ ছিলেন। এমনকি ইরানের প্রধানমন্ত্রীও করা হয় মোসাদ্দেককে। তবে সেই সময় কয়েক বছর ইরানের সরকারের সঙ্গে রাজবংশের সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে। দেশ ছাড়তে বাধ্য হন রেজ়া পহলভি। যদিও কয়েক দিন পরে আবার ফিরে আসেন ইরানে।
শুধু ব্রিটেন নয়, আমেরিকার ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন রেজ়া পহলভি, যা ইরানে তাঁর সাম্রাজ্য মজবুত করতে সহায়তা করে। ইরানে তাঁর ক্ষমতার বুনিয়াদ আরও শক্ত হয়। কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় তাঁর ‘একনায়কতন্ত্র’ মনোভাব। তাঁর নীতির বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললে কণ্ঠরোধ করতে শুরু করেন তিনি। তাঁর সময়কালেই নারীস্বাধীনতা, উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, নিরক্ষরতা কমানো— ইত্যাদি নানা উদ্যোগ ইরানের কল্যাণে ‘জনপ্রিয়’ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তা ইরানের অন্দরেই ক্ষোভের সৃষ্টি করে। কিছু ইসলামি নেতা রেজ়া পহলভির বিরুদ্ধে সরব হন। তাঁদের মধ্যে সামনের সারিতে ছিলেন খোমেইনি। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা শক্তির একমাত্র উদ্দেশ্যই ছিল ইরানে রাজবংশের পতন এবং ইসলামি সরকারের অভ্যুত্থান।
খোমেইনি এবং রেজ়া পহলভির বিরোধ ইরানে ইসলামিক বিপ্লবের মূল কারণ। ১৯৭৮ সাল জুড়ে ইরানে নানা দিকে বিক্ষোভ, অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি তৈরি হয়। ইরান থেকে রাজপরিবারকে উৎখাত করার এই বিপ্লবকে সমর্থন জুগিয়েছিল বিভিন্ন বামপন্থী এবং ইসলামপন্থী সংগঠনও। রক্তে ভাসে তেহরান-সহ ইরানের বিভিন্ন প্রান্ত। আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণে জেরবার ইরানবাসী হাঁপ ছেড়ে বাঁচার অবকাশ পেতেন না। ইরানে না-থাকলেও নেপথ্যে থেকে বিপ্লবের নীল নকশা তৈরি করে দিতেন খোমেইনি। রেজ়া পহলভি একসময় চেয়েছিলেন বিরোধীদের সঙ্গে মধ্যস্থতা করে সমস্যা মেটাতে। কিন্তু বিপ্লবের আগুন এতটাই বিস্তার করেছিল, তা সম্ভব হয়নি। ’৭৮-এর শেষের দিকে ‘চিকিৎসার কারণে’ ইরান ছাড়েন রেজ়া পহলভি। তার পরেই ইরানে ফিরে আসেন খোমেইনি। পতন ঘটে পহলভি বংশের শাসন।
খোমেইনি এবং তাঁর বন্ধুরা মিলে ইরানের শাসনভার হাতে নেন। সালটা ১৯৭৯। ধীরে ধীরে ইরানের ‘সর্বোচ্চ নেতা’ হয়ে ওঠেন খোমেইনি। খোমেইনি অনুমোদিত নতুন দল ‘ইসলামিক রিপাবলিকান পার্টি’ (আইআরপি) ১৯৭৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার গঠনের পরে রাতারাতি ইরানের রাষ্ট্রীয় চরিত্র বদলে গিয়েছিল। আমেরিকা, ইউরোপ, ইজ়রায়েল এমনকি, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো সুন্নি রাষ্ট্রের সঙ্গে শত্রুতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। ঘটনাচক্রে, সে সময়েই পরমাণু কার্যকলাপও শুরু হয়েছিল ইরানে। শুরু হয়েছিল ইজ়রায়েলের তরফে প্রত্যাঘাতপর্বও।
১০ বছর ইরানে শাসন চালানোর পর মৃত্যু হয় খোমেইনিইর। দায়িত্ব পান তাঁর পুত্র খামেনেই। সেই থেকে ইরানের ‘একচ্ছত্র নায়ক’ ছিলেন তিনিই। অনেকের মতে, ইরানের নির্বাচিত সরকার ছিল তাঁর ‘হাতের পুতুল’। তিনিই ইরানের শেষ কথা। আর সেই নীতিই খামেনেই-বিরোধী আন্দোলনের মূল কারণ। ২০০০ সালের পর থেকে দফায় দফায় ইরানে বিচ্ছিন্ন আন্দোলন হয়েছে। খামেনেইয়ের শাসনে ইরানে রাজনৈতিক স্বাধীনতা প্রবল ভাবে ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে বারে বারেই। যেমন অভিযোগ, গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবি বা নারীস্বাধীনতার পক্ষে আন্দোলনকে দমন করা হয়েছে নির্মম ভাবে।
২০২২ সালের ১৬ অক্টোবর ঠিকমতো হিজাব না পরার ‘অপরাধে’ মাহসা আমিনি নামে ২২ বছরের এক তরুণীকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল ইরানের নীতিপুলিশ। ২৪ ঘণ্টা যেতে না যেতেই পুলিশি হেফাজতে রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। মাহসার উপরে অত্যাচারের অভিযোগ উঠেছিল পুলিশের বিরুদ্ধে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হিজাব-বিরোধী আন্দোলন শুরু হয় ইরানের নানা প্রান্তে। খামেনেইয়ের হিজাব-ফতেয়ার বিরুদ্ধে গিয়ে নানা সময়ে ইরানের মহিলারা পথে নেমেছেন।
গত বছর ২৮ ডিসেম্বর নতুন করে ইরানে আন্দোলন শুরু হয়। ইরানি মুদ্রার দাম ব্যাপক ভাবে কমে যাওয়া, মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাজধানী তেহরানে বিক্ষোভ দেখানো শুরু করেন সাধারণ মানুষ। স্লোগান ওঠে বেকারত্ব ও জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে। ক্রমে বিক্ষোভের আঁচ ছড়িয়ে পড়ে সে দেশের অন্যান্য প্রান্তেও। তাতে রাজনীতির রংও লাগে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, শাসনক্ষমতায় পরিবর্তন। তাঁদের দাবি, ইসলামিক রিপাবলিক ব্যবস্থার অবসান।
ইরানের এই আন্দোলন কঠোর হাতে দমন করতে শুরু করে খামেনেই প্রশাসন। ক্ষমতাচ্যুত রেজা শাহ পাহলভির পুত্র ‘যুবরাজ’ রেজা শাহ আমেরিকা থেকেই আন্দোলনে মদত দেওয়া শুরু করেন। ইরান সরকারের বিরুদ্ধে সুর চড়াতে শুরু করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। ইজ়রায়েলকে সামনে রেখে ইরানকে চাপে রাখার কৌশল নেয় আমেরিকা। ট্রাম্প প্রশাসন চায়, ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করুক। যদিও খামেনেই প্রশাসন জানায়, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। আমেরিকার সঙ্গে পরমাণুচুক্তি নিয়েও টালবাহানা চলছিল। তার মধ্যেই শনিবার থেকে ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে ইজ়রায়েল এবং আমেরিকা। পাল্টা আক্রমণের পথে হাঁটে ইরানও। সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় খামেনেইকে। তবে শেষরক্ষা হয়নি।