চিনে নিন আসল দশ
দশ টাকার কয়েন যে সম্পূর্ণ বৈধ, তা মানতে চাইছেন না বহু মানুষ। আর এই সন্দেহের মূলে রয়েছে ওই মুদ্রা ব্যবহার করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে তাঁদের ভোগান্তি।
আসলে বাজারে জাল ১০ টাকার কয়েন চলে আসার গুজবে অনেকেই মনে করছেন ওই মুদ্রা অচল হয়ে গিয়েছে। একই সঙ্গে রটেছে যে, সেগুলিও ৫০০ ও ১,০০০ টাকার নোটের মতোই বাজার থেকে তুলে নেওয়া হবে। এর জেরেই তীব্র বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে সব পক্ষের মধ্যেই। কিন্তু শীর্ষ ব্যাঙ্ক খুব স্পষ্ট ভাবেই জানিয়ে দিয়েছে, ওই মুদ্রা বাতিলের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এটা স্রেফ গুজবই।
তবে এই গুজবের কারণেই দোকান-বাজারের বহু বিক্রেতা, মেট্রোর টিকিট কাউন্টারের কিছু কর্মী, বাস কনডাক্টরদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, ওই কয়েন দিলে অনেক সময়েই তা ফেরানো হচ্ছে। আবার অন্য দিকে সন্দেহের জেরেই চূড়ান্ত নাস্তানাবুদ হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বিশেষত সরকারি বাসের কনডাক্টররা। অথচ ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (আরবিআই) আমজনতাকে বারবারই আশ্বাস দিয়ে জানাচ্ছে, অচল মুদ্রা ছড়ানোয় শীর্ষ ব্যাঙ্ক তা তুলে নিচ্ছে বলে যে-কথাটা দাবানলের মতো ছড়িয়েছে চারদিকে, সেটা গুজব ছাড়া আর কিছু নয়।
রাজ্য সরকারি পরিবহণ দফতরের অভিযোগ, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বৈধ বলে জানিয়ে দিলেও বাসযাত্রীরা কিন্তু কোনও যুক্তিই মানতে চাইছেন না। বেশির ভাগ সময়েই সটান তা ফিরিয়ে দিচ্ছেন তাঁরা। তাদের দাবি, এর জেরে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হচ্ছে সরকারি বাস কনডাক্টরদের।
নিয়ম অনুযায়ী, রাজ্যের সমস্ত সরকারি বাসের ডিপোকে প্রতি সপ্তাহে আরবিআইয়ের কাছ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণে মুদ্রা নিতে হয়। সে ক্ষেত্রে নির্ধারিত কোটা মেনে ১, ২, ৫ টাকার সঙ্গে বাধ্যতামূলক ভাবে তুলতে হয় ১০ টাকার কয়েনও।
সমস্যার সূত্রপাত এখানেই। শীর্ষ ব্যাঙ্ক ১০ টাকার কয়েন রুটিন মাফিক তাদের দিয়ে গেলেও, বেশির ভাগ সময়েই যাত্রীদের তা দেওয়া যাচ্ছে না। দিতে গেলে গালমন্দ জুটছে সরকারি বাস কনডাক্টরদের।
এমনিতে ওই কয়েন পারতপক্ষে নিচ্ছেন না বেসরকারি বাসের কনডাক্টর বা অটোচালকরা। যাত্রীরা নিতে না-চাওয়ায় তা দিচ্ছেনও না। দোকান-বাজারের লেনদেনেও একই কারণে কম হচ্ছে তার ব্যবহার। কিন্তু কয়েন তোলার নিয়মের হাত ধরে না-চাইতেও সরকারি বাস কনডাক্টরদের ব্যাগ ভর্তি খুচরো পয়সার মধ্যে জমে উঠছে এক গাদা ১০ টাকা। যা নিয়ে প্রায় রোজই মারমুখী যাত্রীদের মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের। সরকারি সূত্রে খবর, প্রত্যেক বাস কনডাক্টর যাত্রা শুরুর আগে ন্যূনতম ১২০ টাকার খুচরো পয়সা নিয়ে বেরোন। যার মধ্যে মিলিয়ে-মিশিয়ে রাখতে হয় সব মূল্যের কয়েন।
দৈনন্দিন এই সমস্যায় শুধু কর্মীরাই জেরবার নন। দুশ্চিন্তায় রাজ্য সরকারি পরিবহণ দফতরও। তাদের মতে, যেহেতু ওই কয়েন রিজার্ভ ব্যাঙ্কই দিচ্ছে, তাই সমস্যার সমাধানসূত্রও একমাত্র তারাই বাতলাতে পারে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি দূর করার জন্য ইতিমধ্যেই যেহেতু ময়দানে নেমে পড়েছে শীর্ষ ব্যাঙ্ক। এ নিয়ে প্রায় রোজ তাদের সঙ্গে আলোচনাও চালাচ্ছে পরিবহণ দফতর।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সঙ্গে কথাবার্তার পাশাপাশি ওই দফতর অবশ্য সমস্যা থেকে দ্রুত বেরোনোর লক্ষ্যে এর মধ্যে বিকল্প একটি রাস্তাও খতিয়ে দেখতে শুরু করে দিয়েছে। রাজ্য পরিবহণ নিগমের ম্যানেজিং ডিরেক্টর নারায়ণ স্বরূপ নিগম জানান, এই ধরনের সমস্যা মিটিয়ে ফেলতেই এ বার স্মার্ট কার্ড চালু করতে চান তাঁরা। তাঁর দাবি, ‘‘মেট্রো রেলের ধাঁচে তৈরি হবে এই কার্ড। প্রথম দফায় সিএসটিসি বাসেই তা চালু করা হবে।’’
উল্লেখ্য, দেশের নানা প্রান্তের মতো পশ্চিমবঙ্গেও মাস খানেক ধরেই বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে ১০ টাকার কয়েন নিয়ে।
রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সূত্রও এর আগেই জানিয়েছে, এমন কোনও নির্দেশ ব্যাঙ্ক দেয়নি। স্বীকৃত ১০ টাকার মুদ্রা লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে সম্পূর্ণ বৈধ। তাই তা প্রত্যাহারের প্রশ্নই নেই। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলিও ওই কয়েন বাজার থেকে তুলে নেওয়ার কোনও নির্দেশ না-পাওয়ার কথাই বলেছে।
রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সূত্রে খবর, গত ২০০৭ সালে প্রথম এই ১০ টাকার মুদ্রা বাজারে আসে। তার মাপ, ধাতুর ভাগ, নকশা— সবই নির্দিষ্ট করে দেয় শীর্ষ ব্যাঙ্ক। সেই মতো বিভিন্ন টাকশালে সেগুলির তৈরি শুরু হয়।
আর ২০১১ সালে এক দিকে অশোকস্তম্ভ ও উল্টো পিঠে টাকার নতুন প্রতীকচিহ্ন দিয়ে ১০ টাকার কয়েন আনা হয়। আরবিআই জানিয়ে দিয়েছে, এই দু’ধরনের মুদ্রাই লেনদেনের ক্ষেত্রে বৈধ।
বিকল্প চায় সরকারি বাস
• স্মার্ট কার্ড আনার উদ্যোগ
• মেট্রো রেলের ধাঁচে চালু হতে পারে সিএসটিসি বাসে
• নিয়মিত বৈঠক আরবিআইয়ের সঙ্গে