প্রবন্ধ ১

আসল কথা হল, রেজিমেন্টেড পার্টির দিন শেষ

রেজিমেন্টেড পার্টি দিয়ে কিছু সাময়িক সাফল্য আসতে পারে, কিন্তু অচিরেই তা মুখ থুবড়ে পড়বে। গণতন্ত্র ও বামপন্থার মিলন ছাড়া বামপন্থা টিকবে না, সমাজতন্ত্র টিকবে না। আমাদের বামপন্থী নেতা-কর্মীরা যত তাড়াতাড়ি এই সত্য বোঝেন, ততই মঙ্গল।একদা প্রবলপরাক্রান্ত সিপিআইএম দলটি যে ক্রমাগত রক্তক্ষরণে হীনবল ও হতমান হয়েছে, তা বোঝার জন্য পণ্ডিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। গ্রামবাংলায় জনবিচ্ছিন্নতা ও শক্তিহীনতা কোন পর্যায়ে গেলে কমরেড ধীরেন লেটের মতো সত্তরোর্ধ্ব প্রাক্তন বিধায়ককে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়ে ‘মান রক্ষার জন্য’ জনসমক্ষে কান ধরে ক্ষমাপ্রার্থী হতে হয়, তা বোঝা কঠিন নয়।

Advertisement

অসীম চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০১৫ ০০:২৭
Share:

যথেষ্ট নয়। জনসভায় সূর্যকান্ত মিশ্র। বীরভূম, ২৩ নভেম্বর। ছবি: সোমনাথ মুস্তাফি।

একদা প্রবলপরাক্রান্ত সিপিআইএম দলটি যে ক্রমাগত রক্তক্ষরণে হীনবল ও হতমান হয়েছে, তা বোঝার জন্য পণ্ডিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। গ্রামবাংলায় জনবিচ্ছিন্নতা ও শক্তিহীনতা কোন পর্যায়ে গেলে কমরেড ধীরেন লেটের মতো সত্তরোর্ধ্ব প্রাক্তন বিধায়ককে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়ে ‘মান রক্ষার জন্য’ জনসমক্ষে কান ধরে ক্ষমাপ্রার্থী হতে হয়, তা বোঝা কঠিন নয়। ২০১১ সালে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই দলের রক্তক্ষরণ শুরু হয়, নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ে শাসনক্ষমতা হারানোর পরেও তা অব্যাহত থাকে। যত দিন গেছে, ততই দল হীনবল হয়েছে। একের পর এক নির্বাচনে শাসকের আক্রমণের মুখে প্রতিরোধহীন আত্মসমর্পণে এই সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, একদা প্রবাদপ্রতিম দলীয় সাংগঠনিক ক্ষমতা ও ‘নির্বাচনী মেশিনারি’র গর্ব এখন রূপকথার প্রায়। অধুনা বামপন্থীদের ঘুরে দাঁড়ানোর একাধিক প্রয়াস সত্ত্বেও এই ছবি খুব একটা বদলায়নি। মাত্‌স্যন্যায়ে লবেজান মানুষ এখন পরিত্রাণের পথ সন্ধানে রত, কিন্তু বামপন্থীরা তাঁদের ভরসা দেওয়া দূরে থাক, নিজেরাই ভরসা পাচ্ছেন না।

Advertisement

কেন এমন হল? বামপন্থীদের শক্তিক্ষয়ের উত্‌স সন্ধানে অনেকেই ভারত-মার্কিন পরমাণু চুক্তির বিরোধিতায় ইউপিএ সরকার থেকে বামপন্থীদের সমর্থন প্রত্যাহারের অবিমৃশ্যকারিতাকেই দায়ী করেন। স্মরণীয়, এ প্রশ্নে জ্যোতিবাবুর অবস্থান ছিল: চুক্তির বিরোধিতা, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ আন্দোলন হোক, কিন্তু সমর্থন প্রত্যাহার আত্মঘাতী হবে। কিন্তু দিল্লির পণ্ডিতম্মন্য নেতারা তাতে কর্ণপাত না করে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস ও টিএমসি’র জোটের পথ সুগম করে দেন, ঠিক যেমন এখন সর্বশক্তি দিয়ে বিজেপিকে প্রতিহত করার ডাক দিয়েও বিহার নির্বাচনে সকল আসনে বাম প্রার্থী দেওয়ার পরিণামে নীতীশ-লালুর মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দাপিয়ে বেড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। নীতীশজির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বিমর্ষতম মানুষটি ছিলেন সীতারাম ইয়েচুরি, যিনি মর্মে মর্মে সচেতন যে, দলীয় অবস্থানের কারণে ওই মঞ্চে শামিল হওয়ার নৈতিক অধিকার তিনি হারিয়েছেন। কিন্তু ঘটনা হল, ইউপিএ সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের কারণে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে বামপন্থীদের প্রাসঙ্গিকতা ধাক্কা খায় ঠিকই, কিন্তু এই ঘটনাকে তাঁদের শক্তিক্ষয়ের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না, কারণ তাঁদের অর্জিত শক্তিসম্বল বরাবর কংগ্রেস-বিরোধিতার পথেই অর্জিত হয়েছে।

বামপন্থীদের শক্তিক্ষয়ের উত্‌স সন্ধানে বেশ কয়েকটি তত্ত্ব সামনে এসেছে, বেশ কিছু রোগ নিরূপিত হয়েছে, তার নিদানও হাঁকা হয়েছে। এক, বাম আমলে ক্ষমতার দৌলতে নানা স্তরে দুর্নীতির বিষয়টি চিহ্নিত হয়েছে এবং তার নিদান হিসেবে ঘোষিত হয়েছে দলীয় ‘শুদ্ধিকরণ’ কর্মসূচি। কিন্তু বাগাড়ম্বর ছাড়া এই দিশায় কোনও কার্যকর পদক্ষেপ করা যায়নি, কিছু খুচরো নেতার বিতাড়নেই সীমিত থেকে এই কর্মসূচি পরিত্যক্ত হয়েছে। দলের স্থানীয় মাতব্বরদের বৃহত্‌ অংশ ‘জার্সি বদল’ করায় এবং শাসক দলের লুম্পেনবাহিনীর দাপটে নতুন সরকার সম্পর্কে দ্রুত মোহমুক্তি ঘটায় এই কর্মসূচি অপ্রয়োজনীয় তকমা পেয়েছে।

Advertisement

দুই, কমরেড গৌতম দেবের ‘ভোকাল টনিক’ দিয়ে ও একের পর এক সমাবেশের মাধ্যমে সাংগঠনিক জড়তা কাটানোর কর্মসূচি তেমন ফলপ্রসূ হয়নি।

তিন, কমরেড বিমান বসুর মতো কেউ কেউ আবার বৃহত্‌ বামজোট গঠনের মাধ্যমে বামপন্থীদের শক্তি ও প্রাসঙ্গিকতা ফিরিয়ে আনতে প্রয়াসী হয়েছেন। কিন্তু এই প্রয়াস তৃণমূলে ছাপ ফেলেনি, এবং মমতাদেবীর সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাতে কোনও কোনও শরিকের অনীহা এই জোটবদ্ধতাকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী কর্মসূচিতে সীমিত রেখেছে। এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে, এই কর্মসূচিগুলি গুরুত্বহীন, কিন্তু রাজ্যের লাঞ্ছিত মানুষের দুর্দশা প্রতিরোধ অনেক বেশি জরুরি। লক্ষণীয়, চিটফান্ড প্রতারণার মতো বিষয়, যাতে রাজ্যের প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষের ভাগ্য জড়িয়ে আছে এবং যা শাসকদের মৃত্যুবাণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, তা নিয়ে কর্মসূচি শিকেয় তুলে রেখে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী কর্মসূচিতে হাওয়ায় তরোয়াল ঘোরানোর মতোই নিষ্ফল থেকেছে।

চার, কমরেড সূর্যকান্ত মিশ্রের উদ্যোগে নবান্ন অভিযান, জাঠা ইত্যাদি রাস্তায় নেমে সংগ্রামের কর্মসূচিকে শক্তিক্ষয় রোধের বা নতুন শক্তি অর্জনের উপায় ভাবা হয়েছে। এতে নিশ্চয়ই দলের একাংশ সক্রিয় হয়েছেন, সাহসের সঙ্গে লড়েছেন, শাসক দলের নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। কিন্তু জনসাধারণের অংশগ্রহণের অভাবে এটা দলীয় কর্মসূচিই থেকে গেছে। এতে আসল রোগ নিরাময়ের লক্ষণ নেই। কারণ বিপ্লবী সংগ্রাম আসলে জনসাধারণের সংগ্রাম।

এই সব রোগ নির্ণয় ও নিদানের প্রয়াস অপ্রাসঙ্গিক বা অপ্রয়োজনীয় নয়, কিন্তু এতে প্রতিফলিত হয়েছে আংশিক সত্য। সিপিআইএম তথা বামপন্থীদের শক্তিক্ষয়ের কারণ বুঝতে হলে একটু পিছন ফিরে দেখা জরুরি। ১৯৭৭ সালে বামপন্থীরা বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতাসীন হওয়ার সময় থেকেই দুটি প্রক্রিয়া একযোগে চলে। প্রথমটি হল কিছু ভাল কাজের প্রক্রিয়া, যেমন সকল রাজনৈতিক বন্দির নিঃশর্ত মুক্তি, ভূমিসংস্কার, অপারেশন বর্গা, পঞ্চায়েতি ব্যবস্থার পত্তন ইত্যাদি। পাশাপাশি চলে দ্বিতীয় প্রক্রিয়াটি, যার মূল অন্তর্বস্তু হল, সকল স্তরে দলীয় আধিপত্য কায়েম করার প্রয়াস। যত দিন গেছে, প্রথম প্রক্রিয়াটি দুর্বল হতে হতে ১৯৮৫ সাল নাগাদ পরিত্যক্ত হয়েছে, এর রেশ থেকে গেছে ১৯৮৭-৮৮ অবধি। আর দ্বিতীয়টি উত্তরোত্তর প্রবল হয়ে নব্বইয়ের দশক নাগাদ সর্বগ্রাসী হয়েছে। দলীয় আধিপত্যের পথ ধরেই অনিবার্য আবির্ভাব ঘটেছে দলীয় মাতব্বরদের। এঁরা দল বোঝেন, দলীয় আদর্শ বোঝেন না, দলীয় নির্দেশ বোঝেন, জনসাধারণের সঙ্গে নিরন্তর আলোচনার প্রয়োজন বোঝেন না। স্থানীয় স্তরে এঁরাই ছিলেন দলের মুখ, এঁরাই দলীয় নির্দেশ কার্যকর করতেন, এঁরাই ক্ষমতার প্রসাদ বিতরণ করতেন, নির্বাচনে ভোটের ম্যানেজার ছিলেন এঁরাই। এই মাতব্বরির বিরুদ্ধে ক্ষোভ ক্রমে দলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের রূপ নিয়েছে। জনসাধারণের মতামতের তোয়াক্কা না করে শিল্পায়নের নামে বলদর্পী জমি অধিগ্রহণ এই বিক্ষোভের বারুদস্তূপে আগুন লাগিয়েছে। পরিণাম হয়েছে এই যে, যে জমির প্রশ্ন বামপন্থীদের পায়ের নীচে মাটি দিয়েছিল, সেটাই তাঁদের পায়ের নীচ থেকে মাটি কেড়ে নিয়েছে।

নেতা আর মাতব্বর এক নন। নেতার কাজ হল পথ নির্দেশ করা, কর্মী তথা মানুষজনের চেতনার মান উন্নত করা, কাজের তদারকি ও মূল্যায়ন করা, কাজে এবং ব্যক্তিগত জীবনে কর্মীদের সমস্যার সমাধানে সাহায্য করা। মাতব্বররা এ সবের ধার ধারেন না, দলের নির্দেশ মাফিক কাজ সারেন। এঁরা দলীয় আদর্শের ফসল নন, ক্ষমতার ফসল। তাই পালাবদলের পরে মাতব্বরদের দলে দলে জার্সি বদলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। স্থানীয় স্তরে এরাই এখন তৃণমূল কংগ্রেসের স্তম্ভ। এরাই সবচেয়ে সক্রিয়, সবচেয়ে আক্রামক, সবচেয়ে হিংস্র। ধীরেন লেটকে কান ধরার নির্দেশ দিচ্ছিল যে কণ্ঠ, তা এমনই এক মাতব্বরের।

বোঝা দরকার, রেজিমেন্টেড দলে মাতব্বরদের উত্থান অনিবার্য। এমন দলে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নামে আসলে কেন্দ্রিকতার অনুশীলন হয়, দলীয় নির্দেশই চরম-পরম নির্ণায়ক হয়ে ওঠে। এই রন্ধ্রপথেই ঢুকে পড়ে মাতব্বরির কালসাপ। এটা আসলে মতাদর্শের, দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্ন। বামপন্থীদের চিন্তায় এখানে স্ববিরোধিতা আছে। সমাজ পরিবর্তনের প্রশ্নে তাঁরা বলেন, জনগণই ইতিহাসের প্রকৃত রচয়িতা, আবার একই নিশ্বাসে বলেন যে দলই সব কিছু নির্ধারণ করে। কার্যক্ষেত্রে জনগণের ভূমিকার কথাটা আপ্তবাক্য হয়ে থাকে, দলীয় নির্দেশই চরম-পরম হয়ে ওঠে।

বামপন্থীদের ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনাতেই শুদ্ধিকরণের সকল সম্ভাবনা পিছনের আসনে চলে গেছে। কিন্তু বামপন্থীরা ক্ষমতা ফিরে পেলেই কি মাতব্বরির সমস্যা মিটে যাবে? এ কথা ঠিক যে রাজ্যে যে মানুষজন একদা পরিবর্তন চেয়েছিলেন, তাঁরা অনেকেই এখন এই লুম্পেন রাজত্ব থেকে পরিত্রাণ চাইছেন। চিটফান্ড প্রতারণার তদন্ত ঠিক পথে এগোলে, উপযুক্ত বিরোধী জোট গঠিত হলে আগামী বছরের বিধানসভা নির্বাচনে শাসক দলের পরাজয় অসম্ভব নয়। কিন্তু মাতব্বরির সমস্যা তাতে মিটবে না, পুনরাবৃত্ত হবে।

তা হলে সমাধানের পথ কী? মাও ত্‌সে তুং বলেছিলেন, ‘বিপ্লবী যুদ্ধ হল জনসাধারণের যুদ্ধ।’ শুধু পার্টির যুদ্ধ নয়। তাই, জনসাধারণের সক্রিয়তা, উদ্যোগ ও সৃষ্টিশীলতা উন্মোচনের কোনও বিকল্প নেই। তার জন্য আবশ্যক মানুষজনের সঙ্গে নিরন্তর আলোচনা, তাঁদের মতামত, আশা-আকাঙ্ক্ষাকে নির্ণায়ক গুরুত্ব দেওয়া। তার অর্থ এই নয় যে, দলীয় মতাদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়ে পপুলিজম বা জনবাদিতাকে আশ্রয় করতে হবে। আসলে দলীয় অবস্থানকে জনগ্রাহ্য করার জন্য উপযুক্ত উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু কমান্ড ব্যবস্থার নির্দেশ দিয়ে সে কাজ করা যায় না। গণতন্ত্রই হল এই লক্ষ্য সাধনের পথ।

এ জন্যই গণতন্ত্র ও বামপন্থার মিলন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে দুনিয়ার ঘটনাবলিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই সত্য যে, রেজিমেন্টেড পার্টির দিন শেষ। সেই পার্টি কিছু সাময়িক সাফল্য আনতে পারে, কিন্তু অচিরেই তা মুখ থুবড়ে পড়বে। বামপন্থার দাবি গণতান্ত্রিক বিকল্প। গণতান্ত্রিক কমিউনিস্ট পার্টি গঠন এখন সময়ের প্রশ্ন। গণতন্ত্র ও বামপন্থার মিলন ছাড়া বামপন্থা টিকবে না, টিকবে না সমাজতন্ত্র। তাই ‘শুদ্ধিকরণ’ মানে কেবল কিছু খুচরো নেতার বিতাড়ন নয়, দৃষ্টিভঙ্গির ‘শুদ্ধিকরণ’। আমাদের বামপন্থী নেতা-কর্মীরা যত তাড়াতাড়ি এই সত্য বোঝেন, ততই মঙ্গল।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement