Venezuela Crisis

তেল এবং গণতন্ত্রের লড়াই

দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, দুই ক্ষেত্রেই আমেরিকার অবস্থা বলার মতো নয়। বিশেষত, তার অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক কাঠামোয় যে ধস নেমেছে, ভেনেজ়ুয়েলার ঘটনায় তা স্পষ্ট।

শুভময় মৈত্র

শেষ আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:১৫
Share:

ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজ়ুয়েলার দখল নেওয়া দেখে কারও যদি সন্দেশখালি বা ভাটপাড়ার রাজনৈতিক নেতাদের কথা মনে পড়ে, তাতে অবাক হওয়ার আগে একটু ভেবে দেখা ভাল। শেষ পর্যন্ত গল্পটা তো এক— যে সম্পদের উপরে আইনত বা ন্যায্যত অধিকার থাকার কথা নয়, সেটাকেই দখল করতে চাওয়া। বর্তমানের শাহজাহান বা অর্জুনদের সামলানোর জন্য অন্তত খাতায়-কলমে পুলিশ-প্রশাসন রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পদের সামলাবে কে? আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চ স্বভাবতই এমন স্বার্থতাড়িত যে, সেখানে কেউই সহসা বিবেকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চায় না। তা হলে পড়ে থাকে দুটো বিকল্প— এক, দেশের অভ্যন্তরে এমন মজবুত গণতান্ত্রিক কাঠামো, যাকে অস্বীকার করে কোনও শাসকের পক্ষে এমন দখলদারি অভিযান চালানো অসম্ভব; এবং দুই, শান্তিকামী বিদেশনীতির ধারাবাহিকতা।

দুর্ভাগ্যজনক ভাবে, দুই ক্ষেত্রেই আমেরিকার অবস্থা বলার মতো নয়। বিশেষত, তার অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক কাঠামোয় যে ধস নেমেছে, ভেনেজ়ুয়েলার ঘটনায় তা স্পষ্ট। ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো এখন দক্ষিণ নিউ ইয়র্কের জেলখানায় বন্দি। আর নিউ ইয়র্কের সদ্য নির্বাচিত মেয়র জ়োহরান মামদানি গোটা ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ করছেন— গণমাধ্যমে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অতি সরব। আমেরিকায় তা হলে অভ্যন্তরীণ সমন্বয় এমন তলানিতে এসে ঠেকেছে, যেখানে প্রেসিডেন্ট নিজের ঘনিষ্ঠতম সাঙাতদের সঙ্গে আলোচনা করেই ভিন‌ রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে তুলে আনার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন?

ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় থেকেই বার বার আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী ভাবনা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে দেশের মধ্যেই। এক অর্থে, সরকারের বিদেশনীতির সমালোচনার এই খোলা পরিসর দেশের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের সুস্বাস্থ্যের পরিচায়ক ছিল— যদিও ট্রাম্প আমলে সেই পরিসরটির দ্রুত হারে ক্ষয় হয়েছে। তবে, অন্য একটা কথাও আছে— গণতন্ত্র যদি সত্যিই পোক্ত হত, সে ক্ষেত্রে দেশের মূল বিরোধী দল আগে থেকে জানতে পারত এমন সিদ্ধান্তের কথা। সে ক্ষেত্রে বার্নি স্যান্ডার্সের মতো নেতাকে সমাজমাধ্যমে ভিডিয়ো পোস্ট করতে হত না, তাঁর দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সঠিক সময়ে মত দেওয়ার অধিকার পেতেন।

এটা অনস্বীকার্য যে, আমেরিকার বিদেশনীতি চরিত্রগত ভাবে সাম্রাজ্যবাদী— বিশেষত, কোনও দেশে পেট্রলিয়াম থাকলে আমেরিকা সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আকুল হয়ে ওঠে। ভেনেজ়ুয়েলার অভ্যন্তরে মাদক সংক্রান্ত যে রাষ্ট্রীয় অপরাধ, কিংবা গণতন্ত্র হরণের যে অভিযোগ, তার থেকে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ তেল ব্যবসা। সেখানে ভেনেজ়ুয়েলার মাদক পাচারকারীদের সঙ্গে আমেরিকার বন্ধুত্বপূর্ণ পুঁজিবাদের সেয়ানে-সেয়ানে লড়াই। তবে শুধু আমেরিকাই নয়, এই দখলদারির প্রবণতা অন্যত্রও বর্তমান। একই ঘটনা ঘটতে পারে তাইওয়ানেও। চিন যখন-তখন দখল করে নিতে পারে পড়শি দেশকে। সেখানে তেল নয়, লোভনীয় সম্পদ হল প্রচুর সেমিকন্ডাক্টর সংক্রান্ত শিল্প, যা কম্পিউটার উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। আবার, রাশিয়া তো শস্যক্ষেত্র ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ চালাচ্ছে নির্দ্বিধায়।

এ ক্ষেত্রে ভারতের কথা উল্লেখ করতেই হবে। এমনকি নরেন্দ্র মোদীর আমলেও ভারতের সাম্রাজ্যবাদী প্রবণতা নেই। ঘটনা হল, পড়শি দেশের উৎপাত ভারত বহু বছর ধরে সহ্য করছে— যদিও পাকিস্তান বা বর্তমান বাংলাদেশ উল্টো কথা বলবে। যা-ই হোক, ভারতকে মাঝেমধ্যে ফোঁস করতেই হয়। মাথায় রাখতে হবে যে, বাংলাদেশকে স্বাধীন করার সময়ও ভারতের সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব ছিল না, আজকের দিনে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও নেই। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির ভারতের উপরে নানান কারণে রাগ— কিন্তু, সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব থাকলে ভারতের দাদাগিরি একেবারে অন্য রকম হতে পারত। প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী নিহত হয়েছিলেন প্রত্যক্ষ ভাবে শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক ডামাডোলের কারণে। কিন্তু ভারত তার প্রতিক্রিয়ায় যথেষ্ট সংযত থেকেছে। দেশের অভ্যন্তরে দেশদ্রোহী খুঁজতে মশা মারতে কামান দাগা হয়েই থাকে, কিন্তু কূটনীতি সাধারণ ভাবে সংযমের পথেই এগোয়।

আজ আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ করার হুঙ্কার দিচ্ছে উত্তর কোরিয়া। উল্টো দিকে আবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন যে, এই আমেরিকান আগ্রাসনের সঙ্গী নয় তাঁর দেশ। কানাডাও আমেরিকার এই আগ্রাসনের নিন্দা করেছে। চিনের প্রতিক্রিয়াও প্রত্যাশিত ভাবেই আমেরিকা-বিরোধী। এ ক্ষেত্রে ভারতের প্রতিক্রিয়া সংযত। নিজস্ব বিদেশনীতির ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান যতখানি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, আমেরিকার আগ্রাসনের ক্ষেত্রে ভারত সে জায়গা থেকে প্রতিক্রিয়া জানায়নি। না-জানানোই স্বাভাবিক, কারণ এ ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্যের কথা মাথায় রাখাই বিধেয়। তবে, ভারত যে ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ’-এর সামনে নতিস্বীকার করতে প্রস্তুত নয়, সে কথাও কিন্তু একই রকম স্পষ্ট। ডোনাল্ড ট্রাম্পের যাবতীয় হুমকির মুখেও রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধ করতে রাজি হয়নি ভারত। অর্থাৎ কার থেকে তেল নেব, আর কাকে তেল দেব, এই প্রশ্নটির উত্তর নিজের মতো করে খুঁজে নিতে পারা গুরুত্বপূর্ণ।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন